প্রান্তিক ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল নিজের অজান্তে সেলিনার সহজ সারল্য আর স্পষ্টতায়। হয়তো প্রান্তিক মানতে চাইবেনা, তবু এটা সত্য অশ্রু একটা সময় সকলের অগোচরে রেহানার জায়গায় সেলিনা ওর মনের মধ্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
এরপর প্রতীমবাবু বললেন, আমার আর কিছু বলার নেই অশ্রু, তোমার যদি কিছু বলার থাকে তুমি বলতে পারো।
এবার অশ্রুকণা আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, বিশ্বাস কর প্রান্তিক আমার ভিতর থেকে কান্ন উঠে আসছিল যেন। মনে হচ্ছিল এত অবিশ্বাস। যে কথা তুমি প্রতীমবাবুকে বলতে পারলে, তা তুমি আমাকে বলতে পারলে না? এইটুকু করুণা আমার উপর করা যেত না? তারপর মনে হল, বলবে কেন? সে অধিকার তো আমার নেই। আমিতো রেহানার মতো নিবেদিত প্রাণ নই। নই সেলিনার মত তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র যে প্রয়োজনে শান্ত হতে জানে। আমি তো শান্ত সোর। ঢেউটুকুও যেন ওঠেনা। প্রত্নীমবাবুকে বললাম, না আমার কিছু বলার নেই। উনি বললেন এ তোমার অভিমানের কথা মা। আমি জানি, তোমারও আছে অনেক কথা বলার। তবুও আমার অনুরোধ পড়ি টানাটানি করে একটা অমূল্য জীবন নষ্ট করে দিও না। একটু ক্ষোভের সঙ্গে বললাম, এনিকের জীবনটাই আপনার কাছে বড়, তার মান-অভিমান, দুঃখ-ভালবাসা এ সবের জন্য আপনার ভাবনা হয়, আর আমি মেয়ে বলেই কি আমার দুঃখ কষ্ট, ব্যথা-বেদনাকে ভাবতে নেই।
উনি হাসলেন। কি মধুর সেই হাসি, তোমাকে বোঝাতে পারবো না। সমস্ত প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। বললেন কে বলেছে তোমার কথা আমি ভাবিনি মা। আমিতো প্রান্তিককে ত্যাগ করতে বলি নি, ভালবেসে দূরে সরে যেতেও বলিনি। তোমার ভিতরের আলোকে তোমার বাইরেটাকেও আলোকিত করতে বলেছি মাত্র, যে ত্যাগ তুমি রেহানার জন্য করেছিলে সেই ত্যাগটুকু তুমি শুধু সেলিনার জন্য কর।
বলেছিলাম যদি না পারি। এও তোমার অভিমান। তোমাকে যতটুকু বুঝেছি তাতে পারার কিছু নেই মা। জীবনে জ্বালাটাই কি সব? তার স্থির শান্ত ও মাধুর্যময় রূপটাকে তোমার দেখতে ইচ্ছে করে না? করে কিন্তু এটাও করে আমি যে জ্বালায় জ্বলছি সেই একই জ্বালায় যেন অন্যেও জ্বলে প্রতীমবাবু বললেন, এইখানে তুমি প্রায় সেলিনার সমকক্ষ হয়ে গেছে। তুমি নিজে জ্বলতে জ্বলতে হয়তো চাইতে পারো সেও যেন তোমারি মত জ্বলে। কিন্তু সেলিনা শুধু কামনায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখবেনা সে যে কোন ভাবে তার বুকেও আগুন জ্বেলে দেবে। তার মানবী রূপটাই তার কাছে আসল সত্য।
আমি বলেছিলাম, তাহলে আমাকে কি করতে হবে, উনি বললেন, কোন দিক নির্দেশের জন্য তোমাকে এত কথা বলিনি। আর আমার এসব কথা শুনে মনে হতে পারে প্রান্তিক বুঝি আমাকে এসব বলেছে। কিন্তু না, মা, ও আমাকে কিছুই বলেনি।
সামান্য টুকরো টুকরো কথার মধ্য দিয়েই যা আমার মনে হয়েছে তাই শুধু বললাম। তোমার পথ, তোমার সিদ্ধান্ত সে সবই তোমার। আমার কিছু বলার নেই।
না উনি আর কিছু বলেননি, আজ বুঝতে পারছি প্রতীমবাবু ভালবাসার কোন জায়গায় পৌঁছে গিয়ে একথা বলতে পেরেছেন। তারপর নিজেই বলল যিনি ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তিনিই তো ত্যাগের মহত্ত্ব বোঝেন তাই না প্রান্তিক? তোমার কাছেই শুনেছি, সেই • কতবছর আগে পূর্ব পরিচিতি ছাড়া একটি বিয়ের সম্ভাবনা বিয়োগান্ত একটি ঘটনায় নষ্ট হয়ে যায়। প্রতীমবাবু তার জন্য নিজেকে দায়ী করে এই জীবন বয়ে নিয়ে চলেছেন। যে মেয়েটি তার মত মানুষকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছেন, তার হৃদয়টা কি নিষ্ঠুর তাই না প্রান্তিক? আমি কল্পনাও করতে পারিনি অশ্রুকণা বুঝতেও পারেনি যে সে মেয়েটি কে? আমি বললাম সত্যিই নিষ্ঠুর। নির্মম আর পাষাণ। কিন্তু তুমি যদি জানতে কলা, যে সেই হৃদয়হীন মেয়েটি হাজার প্রলোভনেও নতুন করে ঘর বাধতেই শুধু পারলো না তাই নয়, ভালোবাসার স্বপ্নটুকুও দেখতে পারলো না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় কি জান? প্রতীমবাবু বা তোমার ভাষায় সেই হৃদয় হীনা নারী উভয়ে উভয়ের অজান্তে বয়ে চলেছে এক দুর্বিষহ জীবন হাসি মুখে, কারো প্রতি কোন অভিমান না রেখে।
অবাক হয়ে অশ্রুকণা বলল তুমি জানলে কি করে? কাকতালীয় ভাবে। তারপরু বললাম তুমিতো প্রতীমবাবুকে দেখেছো, একবার দেখতে ইচ্ছে করে না সেই নারীকে, যিনি তার জেদে অবিচল থেকে প্রতীমবাবুকে এই কঠিন জীবনের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন?
অশ্রুকণা বলে, হ্যাঁ ভীষণ ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে তার কাছ থেকে, কেন আপনাবা জীবনকে এই ভাবে টেনে নিয়ে চলেছেন? এতে আপনারা কি লাভ করেছেন? আমি বললাম তারা হয়তো জীবনে পাননি কিছুই, কিন্তু তোমার আমার মত জীবনগুলোকে ভালবাসায় ভরে দিয়েছেন। জান কণা সেই হৃদয়হীনা মেয়েটি কে? প্রচণ্ড ঔৎসুক্য নিযে ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল কে? আমি বললাম মিনতি সেন! শোনামাত্র নির্বাক নিস্পন্দ ভাবহীন বেদনাময় অভিব্যক্তি যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল অশ্রুকণাকে। বললো মিনতি পিসি? হ্যাঁ আমার মা। প্রায় ২৫ বছর পরে আমি প্রতীমবাবুকে মিনতি সেনের কথা বললাম, সরাসরি যখন জানালাম, আমার মাই আপনাকে এই জীবনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, ইচ্ছে করে না আমার মায়ের শূন্যতাকে পূর্ণতায় ভরে দিতে? উনি প্রথম ভেবেছিলেন, মিনতি সেন হয়তো নতুন সংসাব পেতেছেন, আর আমিই তার উত্তরাধিকারী, তখন হয়তো চাপা
