ভীষণ ইচ্ছে করছিল, সেলিনাকে সজোরে বুকের পরে টেনে নিয়ে আদরে আদরে তার উপপসি তৃষ্ণাকেভরে দিই। হায় ভীরু মন, যা তুমি চাও তা তোমার পাওয়ার যোগ্যতা কত বিচার করেও দেখনা। ও আমার পাশ কাটিয়ে চলে গেল। আমি নেমে এলাম বাগানে। জোছনা ভরা রাতের আকাশ। বাগানে ফুটেছে অজস্র ফুল। কি যে মনোরম পরিবেশ। স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে হয় দূর তেপান্তরে। ভাবতে অবাক লাগছে, সেলিনা কি ভাবে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। মুহূর্তের দুর্বলতায় কখনো কখনো যে মনে হয়নি, ওকে আমার ভীষণ প্রয়োজন, তবে তা আজকের মত নয়। সেলিনা হীন এমন শূণ্যতার অনুভূতি আগে তো কখনো হয় নি। তবে কি তার সম্পূর্ণ আত্ম নিবেদনই আমি চেয়েছিলাম।
জানিনা, কি চেয়েছিলাম, অশ্রুকণা আমাকে একা দেখে আমার দিকে এগিয়ে এল। সেলিনা এলোনা? না, ওকে বলে এখানে আমি আসিনি। ও কৌতুক দৃষ্টি হেনে বলল আবারতো একটা ঝামেলা করবে? কিআর অবক। ও বলল, বাইরে বেশ ম, তোমার বেরোনো ঠিক হয় নি। তাহলে তুমি বেরুলে কেন? তোমার ঠান্ডা লাগবেনা? আমি শাড়ীর আঁচলে ঠান্ডাটাকে খানিকটা চাপা দিতে পারব, কিন্তু তুমি? আমি না হয় সেই আঁচলে নিজেকে লুকোবার চেষ্টা করব। ও বলল আঘাত পাব জেনেও এই কৌতুক তুমি ছাড়তে চাওনা, কেন বলত? ভালে লাগে তাই। যাকগে সে সব কথা। বড় দিদির সঙ্গে দেখা হল? হ্যাঁ। ভদ্রমহিলা খুব ভাল জান? কি বললেন? আমার জয়েনিং রিপোট নিলেন, আর এখানকার সব কিছু সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা দিলেন। সত্যভূষণবাবু ছিলেন? হ্যাঁ ছিলেন, উনি কি বললেন? না উনি কিছু বলেননি। বড় দিদির ওখানে কাজ শেষ হয়ে গেলে, উনি বললেন চলুন আমি যেখানে থাকি। আমি ওর দিকে তাকাতে উনি বললেন ওষুধটাতো নিয়ে যেতে হবে অশ্রুদেবী। আমি বললাম ও হ্যাঁ, চলুন।
এই প্রতিষ্ঠানের যে বিরাট পাঁচিল, তার গা ঘেঁষে আরেকটা ছোট পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ আলাদা কোয়ার্টার। উনি আমাকে নিয়ে বারান্দা পেরিয়ে একটা ঘরে নিয়ে বসালেন। বেশ বড় হল ঘরের মত। সারা ঘর ভৰ্ত্তি অনেক বই। একটা বেশ বড় টেবিল, আর বসার চেয়ার আর সামনে মাত্র ২টো চেয়ার। আমি ওকে জিজ্ঞাস করলাম এটা আপনার অফিস? উত্তরে বললেন না ঠিক অফিস নয়, আবার অফিসও বলতে পারেন। হেঁয়ালিটা বুঝলাম না। হ্যাঁ অশ্রুদেবী হেঁয়ালিই, তবে ধীরে ধীরে হয়তো বুঝবেন। এখানে যখন এসেছেন সবই জানতে পারবেন। এখানে আপনি একা থাকেন? ঠিক একা নই, আরো দু জন থাকেন, একজন আমার দেখাশুনা করেন, আরেকজন এই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী। আপনার স্ত্রী? না নেই। মানে? নেই মানে নেই, মানে এখনো সেই ভাবে ভাবিনি। তারপর নিজেই হেসে বললেন, একদিনেই সবকিছু জানতে চাইলে চলবে কেন অশ্রুদেবী। তারপর আমার হাতে একটা প্যাকেট দিয়ে বললেন প্রান্তিকবাবুর ওষুধ। আমি ওটা হাত পেতে নিলে উনি বললেন, না অশ্রুদেবী চা বা কফি কিছু খাওয়াতে পারবো না। কারণ ঐ অ্যারেঞ্জমেন্ট এখানে নেই। ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
আমি বললাম, অদ্ভুত মানুষ এই সত্যভুষণবাবু তাই না। হ্যাঁ তার সৌজন্য বোধের তুলনা হয় না। তবে যে কজনের সঙ্গে কথা হল, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তার কথা বললেন, তাতে আমার মনে হয়, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যে কোন অফিসিয়াল যোগাযোগ নেই, এটা বোধ হয় ঠিক নয়। আমারও তাই মনে হয় কণা। ও বলল এবার চল, দেখ সেলিনার আবার অভিমান কোথায় গিয়ে পৌঁছায়। আমি বললাম, ওর কথা থাক, তোমার কি কোন অস্বস্তি হচ্ছে আমার সঙ্গে বাগানে থাকতে? খানিকটা তো হচ্ছেই প্রান্তিক। দেখ সেলিনা আঘাত পেতে পারে এমন কিছু আমি করতে চাইনা, আর আমি আঘাত পেতে পারি এমন কিছু বুঝি করতে তোমার আপত্তি নেই? এই ভাবে বলছ কেন প্রান্তিক। তোমাকেও আঘাত দিতে চাইনা, পারলে আঘাতে শুধু প্রলেপ নয় জীবনটাও তোমার কানায় কানায় ভরে দিতে চাই। কিন্তু তা আজ আর সম্ভব নয়। কেন? সব কথার উত্তর দিতে পারব না প্রান্তিক। তা ঠিক, কাল কিন্তু বলেছিলে, আমাকে ছেড়ে তুমি থাকতে পারবে না।
কথা বলতে বলতে গোটা বাগানটা ঘুরে এসে আমরা বসার বেদীটার সামনে যখন এসেছি অশ্রুকণা বলল বসবে কিছুক্ষণ? হ্যাঁ বসা যাক, বলে বসে পড়লাম আমরা। ও বলল, বলেছিলাম, এখনো বলছি, সারাজীবন ওই একই কথা বলব, তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। তাহলে? তাহলে কি! তাহলে সেলিনা কি ভাববে এ নিয়ে ভাবছ কেন? ভাবছি এই জন্য যে ওকে ছেড়েও আমি থাকতে পারবো না! কশা? ও বলল, বল। এ ভাবে এত কষ্ট পাচ্ছ কেন? আমার তো কোন কষ্ট নেই। কোন কষ্ট নেই? না প্রান্তিক, কোন কষ্ট নেই। এতদিন আমার জন্য তোমার কোন অনুভূতি আছে কি না, তার জন্য কষ্ট হতো। প্রায়ই মনে হতো সত্যি কি আমার জন্য তুমি একটুও ভাব না। তাই কষ্ট হতো। এখন মনে হয়, আমার সে ধারণা ভুল। এখন, আমার যেটুকু প্রাপ্য, আমি জানি তোমার কাছ থেকে আমি তা পাবই, সুতবাং কষ্ট কেন হবে? কাল কিন্তু বলেছিলে আমার সঙ্গে তুমি চলেই যাবে। আমি যদি এখন বলি, আমি তোমাকে না নিয়ে যাব না কণা! কি করবে? চলে যাবো তোমার সাথে। তোমাব এই চাকরি, জীবনের এই নিবাপত্তা সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে। দেখ প্রান্তিক, কোন মেয়ে কিসে নিরাপত্তা পাবে তুমি কি তা জান? ঠিক বুঝতে পারলামনা। ও বলল, তুমিতো রেহানাকে সমস্ত নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলে, দাওনি? ঠিক জানিনা, নিরাপত্তা জিনিষটা কি তাও বুঝিনা, তবে ওকে আমি ভালবেসে ছিলাম। যদি সেই ভালবাসার মর্যাদা রাখতে একদিন ওকে নিয়ে পথে দাঁড়াতে হতে কি করতে তুমি! হয়তো রেহানা আমাকে বিশ্বাস করে পথেই নামতো! কেন? ভালবাসার আকর্ষণে। না প্রান্তিক সেটাই সব নয়, শুধু ভালবাসার টানে, মেয়েরা কোন প্রেমিকের হাত ধরে পথে নামে না, যদিনা সে বিশ্বাস করে, সেই পুরুষটি তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে। আমিও বিশ্বাস করি তুমি আমাকে ভালবাসতে না পারলেও নিরাপত্তা দিতে কুণ্ঠিত হবে না। আমি অবাক হয়ে বললাম, শুধু নিরাপত্তাই সব। হ্যাঁ সব প্রান্তিক। ইনটারভিউ শেষে প্রতীমবাবু বলেছিলেন, অশ্রু, তোমাকে তুমিই বলছি, একবার যাবে আমার বাসায়? আমি অবাক হয়ে বললাম এ ভাবে বলছেন কেন? আমিতো আপনার আশ্রয় প্রার্থী। উনি বললেন, ভুল তোমার মা, তুমি আমার আশ্রয় প্রার্থী নও। তোমার যোগ্যতা তোমাকে আশ্রয় দেবে। আমি সে জন্য তোমাকে যেতে বলছি না, তবে? তোমার কাছে কয়েকটা ব্যাপার জেনে নিতে চাই। আমি বলেছিলাম, ঠিক আছে যাবো, প্রান্তিক আসুক। উনি বললেন, ও এখন আসবেনা। তা হলে কখন আসবে? আসবে, আর তোমাকে নিয়ে যাবে। আমি বললাম, চলুন। গেলাম ওনার বাড়ীতে। ফ্রীজ খুলে উনি আমাকে মিষ্টি খেতে দিলেন। তারপর বললেন, আমি তোমার পিতৃস্থানীয় অশ্রু। তাই যা জিজ্ঞাসা করব তার ঠিক ঠিক উত্তর দিও। আমি মাটির দিকে চোখ রেখে বললাম বলুন। উনি বললেন, মা–বাবাকে এতবড় আঘাত কেন দিয়ে জানি না অশ্রু, মনকে প্রস্তুত করতে পারলে ওদের মেনে নিও। ওরা তোমার মঙ্গলই চেয়েছিলেন। আমার ভিতর থেকে একটা প্রতিবাদ উঠে আসতে চাইছিল। উনি বললেন, আমি জানি তুমি কি বলতে চাইছে। প্রান্তিককে তুমি গভীর ভালবাস এইতো। তাই তার অপমান তুমি সইতে পারনি। কিন্তু ওকে আমি যতটুকু বুঝেছি, তাতে তোমার মন যেভাবে ওকে চেয়েছে সেই ভাবে হয়তো ও তোমাকে চাইতে পারেছে না, তার মানে কিন্তু এই নয় যে ও তোমাকে ভালবাসেনা। ওর জীবনে কিছু জটিলতা আছে বলে মনে হয়। ও একটি মেয়েকে ভীষণ ভালবাসতো তাই না? তার নাম বোধ হয় রেহানা। ওর বোধ হয় বিশ্বাস সেলিনার জন্য সে চলে গেছে। আসলে কিন্তু তা আমার মনে হয় না মা। যে মহান ভালবাসা ত্যাগের মধ্যে দিয়ে তার স্থায়ী আসন গড়ে নিতে চায় রেহানার ভালবাসা সেই গোত্রীয়। তাই আমার বিশ্বাস, রেহানা হয়তো চিরদিনই ওর আড়ালে থেকে যাবে। ওর কাছেই শুনেছি সেলিনা রেহানার বোন। কয়েকটি টুকরো ঘটনার মধ্যে ও সেলিনার কথা যা বলেছে তাতে সেলিনা ওর জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার নয়। পারবেনা মা, সেলিনাকে তার হাতে সপে দিয়ে রেহানার মত মহৎ প্রেমের দৃষ্টান্ত রাখতে। উজ্জ্বল দুটি চোখ মেলে উনি তাকিয়ে ছিলেন, আর আমিও অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম প্রতীমবাবুর দিকে। জিজ্ঞাস করেছিলাম, প্রান্তিক আপনাকে কি বলেছে জানিনা, কিন্তু এটা সত্যি যে দিন বাবা-মায়ের প্রতি অভিমান করে চলে এসেছিলাম, সেদিন কিন্তু প্রান্তিকের জীবনে আসতেই হবে এমন কোন স্বপ্ন ছিল না, তবে স্বপ্নগুলো কুঁড়ির মতো ফুটেছিল, রেহানার চলে যাওয়ার পরে। যদিও আমি বিশ্বাস করতাম, রেহানার থেকে সেলিনা আরো বেশী ভালবাসে প্রান্তিককে। রেহানার ভালবাসা ছিল চাপা। কাউকে বুঝতে দিতোনা। কিন্তু সেলিনা ছিল তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র যেন। সেখানে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া প্রান্তিকের যে আর কোন উপায় নেই, তা জানতাম। প্রতীমবাবু বাধা দিয়ে বলেছিলেন, অশ্রু, একটু বোধ হয় ভুল বললে, সেলিনা অবশ্যই তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ সমুদ্র কিন্তু সমুদ্রতো শান্ত হতে জানে অন্য দিকে হাজার চেষ্টাতেও শান্ত সরোবর কখনো তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ হতে পারে না। প্রান্তিকের একটা মন সব সময় স্পর্শ করে আছে সেলিনাকে, কারণ সেলিনাই এসেছে তার কাছে একেবারে বাস্তব হয়ে। রাগে-বিদ্বেষে, মানে-অভিমানে, দুঃখ ও ভালবাসায় একেবারে পূর্ণ হয়ে। যা রেহানার ছিল না। রেহানার ভালবাসা যেন পূজার অঞ্জলি। দেবতা নিলে নিজেকে ধন্য মনে করবে, কিন্তু না নিলেও তার কোন অভিযোগ নেই, সেখানে সেলিনা তার দাবী নিয়ে প্রান্তিকের সামনে দাঁড়িয়ে কৈফিয়ৎ চাইতে জানে। তার পূজার ফুল অবহেলা করে কেউ পার পেয়ে যাবে তা সে মেনে নেবে না কোন ভাবেই। এমন এক সাহসী প্রতিবাদ তার মধ্যে আছে বলেই সেলিনা তোমাদের সকলের থেকে আলাদা।
