অশ্রুকণা আর তার সঙ্গে একটা মেয়ে। জানতে চাইল প্রান্তিকের জ্বর কি একই রকম আছে? মনে হয় একটু কমেছে। অশ্রুকণা তারপর সঙ্গের মেয়েটাকে দেখিয়ে বলল, এর নাম সীতা, সত্যভুষণবাবু পাঠিয়েছেন। আচ্ছা, তুমি এই ওষুধটা আগে নাও। ওকে এখনি একটা খাইয়ে দাও। সেলিনা বলল, সে না হয় হবে অদি। এত ব্যস্ত হওয়ার তো কিছু নেই। কিছু নেই মানে? এখানে কিছু হলে কে দেখবে? কেন তুমি? আমি? তুমি ছাড়া আবার কে দেখবে? বাঃ বেশ মজার কথাতো আমি ছাড়া আবার কে দেখবে? তুমি দেখতে পারবেনা? পারবে। তবে তুমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে তখন। অবশ্য ততক্ষণে প্রান্তিক ভাই সুস্থই হয়ে যাবে।
সন্ধ্যার দিকে মনে হচ্ছে জ্বরটা আর নেই। কাল সারাটা দিন যে ভারি ভারি ভাবটা ছিল তাও আর নেই। বেশ হাল্কা লাগছে। অশ্রুশা বলল, এ বেলা ফুলের বাগানের মাঝখানে যে বেদীটা আছে ওখানে গিয়ে চা খাওয়া যাবে। সেলিনা বলল সেই ভাল, বিকেলের হিম লেগে জ্বরটা আবার এলে মন্দ হয় না! অবাক হয়ে অশ্রুকণা বলল সেলিনা তুমি যে মাঝে মাঝে কি ভাষায় কথা বল বুঝতে পারি না। তুমিও বুঝতে পারনা? অবাক করলে অশ্রুদি। আমার কথা একা প্রান্তিক ভাইই বোঝেনা এতদিন তো তাই জানতাম এখন দেখছি তুমিও বোঝ না? ঠিক আছে বোঝার দরকার নেই, চল চা ওখানেই খাওয়া যাবে।
আমি বললাম দরকার নেই কশা। আজ আর বাইরে গিয়ে বসব না, বরং আর যদি জ্বরটা না আসে তা হলে কাল গিয়ে বসা যাবে। সেলিনা বলল, দেখলে তো অদি, আমি যেটা বলব তাতেই প্রান্তিক ভাই বাদ সাধবে। যাতে আমি রেগে যাই তাই করবে। আবার ওনার মায়ের কাছে আমাকে লিখিত রিপোর্ট করতে হবে, ওর বিরুদ্ধে আমার কি কি অভিযোগ? একটা হাই ছেড়ে বলল, তাইতো তোমায় বলেছিলাম, আমিতো রেহানা নই, আমি সেলিনা। হতভাগী রেহানার বোন, আর তার অবর্তমানে আমি তো বোঝ। আমি অবাক হয়ে মনে মনে বললাম, সেলিনা তোমার এই দুর্বোধ্য ভাষা আমি সত্যি বুঝিনা, তবু যত পার কলকাতায় গিয়ে তোমার ভাষায় কথা বল, এবার অভত শান্ত হও। চেষ্টা করেও মুখে কিন্তু কোন কথাই বলতে পারলাম না।
অকশা বলল সেলিনা, প্রান্তিক না বুঝলেও তোমাকে আমি বুঝতে পারি। তোমার যন্ত্রণা তোমার আত্মপীড়ন, তোমার স্বপ্ন, তোমার অন্তরের কথা, প্রান্তিকের পুরুষ চোখ এড়িয়ে গেলেও, আমিতো তোমার মতো মেয়ে তাহলে এ আঘাত দিয়ে তুমি কি আনন্দ পাও। সেলিনা অভিমানের সঙ্গে বলে, আমি তোমাকে আঘাত দিয়েছি অশ্ৰুদি তুমি একথা বলতে পারছ? অশ্রুকণা বলল না সেলিনা, তুমি জেনে শুনে আমাকে আঘাত দিচ্ছ না। আসলে তোমার কথার ভুল মানে হয়ে অন্তরকে আঘাত করছে। তারপর পড়ে থাকা চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে অশ্রুকণা চলে গেল।
সেলিনাকে অনেক রকম কথা বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু পারিনা। সেলিনাই বলে, তোমারও কি তাই মত, যে আমার কথায় তোমরা আঘাত পাও। আমি বললাম, সেলিনা ওভাবে সরাসরি উত্তর দেওয়া যায় না। বেশ তাহলে, তুমি কদিন থেকে যাও অশ্ৰুদির কাছে। আমি কালই চলে যাবো। তুমি চলে যাবে মানে? মানে কিছু নয়। আমি থাকলে, আমাকে কথা বলতেই হবে, আর প্রতিটি কথারই তোমরা ভুল মনে করবে। আমি সেদিকে না গিয়ে বললাম, কিন্তু আমাকে এখানে রেখে যেতে পারবে? কেন পারবো না? তুমি আমার কে যে তোমার জন্যে আমাকে এই বনজঙ্গলে পড়ে থাকতে হবে? কেউ নই না? না কেউ নও। তারপর বলল, আমি কিন্তু কাল চলে যাবই প্রান্তিক ভাই, বাধা দেওয়ার চেষ্টা কবো না।
বেশ, আজতো আর যাচ্ছ না, কাল যখন যাবে তখন ভাবা যাবে। আজ বরং চল। ওই বাগান দিয়ে একটু ঘুরে আসি। তুমি যাও। আচ্ছা সেলিনা, অশ্রুকণা তোমায় এত ভালবাসে, আর তুমি কেন প্রতিমুহূর্তে ওকে আঘাত দাও। নির্বিকার সেলিনা বলে, আমিতো অদিকে আঘাত দেওয়ার জন্য কোন কথা বলিনা, উনি নিজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিয়ে আঘাত পেলে আমি কি করব? তাহলে তুমি কাকে আঘাত দিতে চাও? তোমাকে। আমাকে? কেন আমার প্রতি তোমার এত রাগ কেন? সে আমি জানি না প্রান্তিক ভাই, প্রায়ই ভাবি, না এ আমার ঠিক হচ্ছে না, তবু তোমাকে আঘাত দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠি। আমার কেবলি মনে হয় আঘাতের মধ্যে দিয়েই আমি তোমার কাছে পৌঁছে যেতে পারি। আমি ভীষণ অবাক হয়ে তাকাই ওর দিকে। বলি, অন্তরের মধ্যে যদি সত্যের সন্ধান না পাও আঘাত দিয়ে কি পাবে? না পাব না, জানি, তবু মনে হয় এতেই বুঝি আমি আমাকে মেলে ধরতে পারি। আমি বললাম, তোমাকে একটা কথা বলব সেলিনা? বল। আমাকে কি তুমি বুঝতে পায় না? তোমাকে তো বলেছি আমার থেকে তোমাকে কেউ বেশী বোঝে না। তাই যদি হয়, তাহলে এই পাগলামি গুলো ছাড় সেলিনা। তোমার অদিকে তার নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য কর। তারপর বললাম তুমি যেমন আমাকে বোঝ, মনে হয় অশ্রুকণাকেও বোঝ তার থেকে বেশী। যে কটা দিন এখানে থাক, কোন আঘাত নয়, লেন সংঘাত বা অভিমান নয়, একান্ত বন্ধুর মতো তার হৃদয়টাকে বুঝবার চেষ্টা করা। যে ভালবাসা তোমাকে সে দিতে চেয়েছে, তা গ্রহণ কর সেলিনা। এ আমার একান্ত অনুরোধ।
এমন করে বুঝি সেলিনাকে কোনদিন কিছু বলিনি। হয়তো এমনি কোন কথা সে শুনতে চেয়েছিল আমার মুখ দিয়ে। ও মুখ নীচু করেছিল। আমি বললাম, কি হল? তুমি তাকাবে না আমার দিকে? ও মুখ তুলে তাকালো। কিন্তু একি এমন নিঃশব্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে কেন ওর চোখ দিয়ে? আমি বললাম সেলিনা! ও বলল না এভাবে নয় প্রান্তিক ভাই, আঘাতের বিনিময়ে আরো বড় আঘাত দিয়ে ভেঙে দিতে পার না আমার দম্ভকে? আমার ঔদ্ধত্যকে এমন ভাবে সহ্য কর কেন? সে কি শুধু আমি রেহানার বোন বলে? ও উঠে যেতে চাইলে, আমি উঠে গিয়ে ওর পথ রোধ করে দাঁড়ালাম। একটু আগে দেখেছি সীতাকে নিয়ে অশ্রু বাগানের দিকে চলে গেছে। ও বলল পথ ছাড়, বললাম না ছাড়বনা। ও বলল, ছিঃ অশ্ৰুদি কি ভাববে? অশ্রণা নেই, ও অনেকক্ষণ হলো বাগানে গেছে। তবু তুমি সরে দাঁড়াও প্রান্তিক ভাই। তা হয় না সেলিনা, কোন ভাবেই আমি তোমাকে দুরে সরে যেতে দিতে পারি না। কি করবে আমাকে নিয়ে, পারবে আমাকে জায়গা দিতে রেহানাকে সরিয়ে? পারবে অশ্ৰুদির ভালবাসা ভুলে, শুধু আমাকেই ভালবাসতে, পারবে তপশীদির দীর্ঘ ছায়া চিরদিনের জন্য তোমার জীবন থেকে সরিয়ে দিতে? আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে বললাম পারবো। হ্যাঁ পারবো সেলিনা, যদি মুহূর্তের জন্যও তুমি রেহানার নাম উচ্চারণ না কর, যদি রেহানাকে তোমার জীবন থেকে চির নির্বাসিত কর, যদি কখনো অশ্রুকণার ছায়ায় নিজে দাঁড়াতে না চাও, যদি তপতীকে মুছে দিতে পার তোমার ভালবাসা থেকে। সেলিনা এগিয়ে এলো আমার কাছে, এই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বুকে, না এ শাস্তি তুমি আমাকে দিও না, তার চেয়ে তুমি আমায় যা বলবে, সেই ভাবে চলব। তোমাতে নিবেদিত প্রাণ আমার চলার পথের পাথেয় হোক প্রান্তিক ভাই। আর কোন দিন তোমার অবাধ্য হবো না। তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমার কোন আচরণে আজ থেকে আমি আর অদিকে আঘাত দেবনা।
