অশ্রুকণা এলে সত্যভূষণ বাবু বললেন, আপনি যদি একবার তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নেন, তা হলে ভাল হয় অশ্রুদেবী। একবার প্রধান শিক্ষিকার কাছে যেতে হবে। অশ্রুকণা বলল, আজ না গেলে নয়? কেন বলুন তো। কোন অসুবিধা আছে কি? অসুবিধা একটু আছে বৈকি। আমাকে বলা যায় না? আপনাকে তো বলতেই হবে। আপনি যদি এ সময় না আসতেন। তাহলে হয়তো আমাকেই আপনাকে খুঁজতে বেরোতে হতো। সত্যভূষণ বাবু শুধু একটু হাসলেন, তারপর বললেন বলে ফেলুন। অশ্রুকণা বলল, কাল প্রান্তিকের জ্বর এসেছে, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মনে হয় ১০৩/১০৪ ডিগ্রি জ্বর হবে। ডাক্তারের প্রয়োজন। জানিনা এখানে কোন ডাক্তার আছে কি না। না এখানে ধারে কাছে কোন ডাক্তার নেই অশ্রুদেবী। আমি ডাক্তার নই, তবুও এখানকার গরীব মানুষের চিকিৎসা আমাকেই করতে হয় বেআইনী জেনেও। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অবশ্য একজন ডাক্তার আছেন, তবে তিনি আজ নেই, বিশেষ কাজে বাইরে গেছেন। যদি বিশ্বাস রাখেন আমি একবার দেখতে পারি। অকণা বললেন আসুন।
সত্যভূষণ বাবু আমাকে দেখলেন। টেথিসকোপ ছাড়াই শুধু হাতে তিনি বুক পিঠ পরীক্ষা করলেন। চোখ এবং জিহ্বা দেখলেন। তারপর বললেন, না ভয় নেই অশ্রুদেবী। আমি কয়েকটা ট্যাবলেট পাঠিয়ে দিচ্ছি। প্রথমেই একটা খাইয়ে দেবেন, ঘন্টা চারেক পরে আরেকটা খাওয়াবেন। তারপরও যদি না কমে, তাহলে আরো চারঘন্টা পরে আরেকটা খাওয়াবেন। তবে তৃতীয়টা খাওয়াবার প্রয়োজন হবে না বলেই মনে হয়। অশ্রুকণা উদ্বিগ্নতার সঙ্গে বললেন আপনাকে কষ্ট দিচ্ছি। আরে না না, কষ্ট কেন দেবেন। আপনি বরং এক কাজ করুন অঞদেবী, আপনি চলুন আমার সঙ্গে বড় দিদির সঙ্গে দেখা হবে, আর ওষুধটাও নিয়ে আসতে পারবেন। আর সেই সঙ্গে আমি কোথায় থাকি সেটাও দেখা হয়ে যাবে। অশ্রুকণা বললেন ঠিক আছে আপনি বসুন আমি আসছি।
সত্যভূষণ বাবু আমার কাছে না বসে, বসার ঘরে গিয়ে বসলেন, সেলিনা কফি ও বিস্কুট নিয়ে এলে সত্যভূষণ বাবু বললেন, আমিতো চা বা কফি কিছুই খাইনে। শুধু শুধু কষ্ট করতে গেলেন। সেলিনা বলল, কষ্টটা বড় কথা নয় সত্যবাবু, অপমানটাই বড়। মানে? আপনি কি বলতে চাইছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। না বোঝার কথাতে নয় আপনার। অবাক হয়ে তাকালেন সত্যভূষণ বাবু সেলিনার দিকে, তারপর বললেন, হয়তো আপনি বলতে চাইছেন সকালে এসে কিছু না খাওয়াটা অপমানেরই নামান্তর, তা যদি বলেন, আমি বিস্কুট গুলো খেয়ে নিচ্ছি, কিন্তু বিশ্বাস করুন চা বা কফি সত্যিই আমি খাইনা। কারণ? কারণ এমনিতে কিছুই নেই। আসলে আমিতো এদের মাঝে বড় হয়েছি, এখানকার কেউই চা বা কফি খায় না। আর এখানে ওসব পাওয়াও যায় না, তাই অভ্যেসটা গড়ে ওঠেনি। সেলিনা বলল যে অভ্যেস গড়ে ওঠেনি, তার আবার স্থায়িত্ব কি? হ্যাঁ তা বলতে পারেন। তাহলে কফিটা খেয়ে নিন। বাঃ আপনিতো অপূর্ব ম্যানেজ করতে পারেন। প্রয়োজন হলে কি নামে ডাকব আপনাকে। হয়তো আমাকে আপনার প্রয়োজন হবে না। তবে একান্তই যদি দরকার হয়, তা হলে আমার নাম সেলিনা। সেলিনা রহমান। দাঁড়ান দাঁড়ান আপনার নাম যেন কোথায় দেখেছি। হেসে ফেলল সেলিনা। বলল, কোথাও দেখেননি, হঠাৎ আপনার মনে হয়েছে তাই আপনি বললেন। কিন্তু আপনি বোধ হয় জানেন না মিস রহমান আমার স্মৃতি শক্তি খুব একটা খারাপ নয়। আমি কি তা ভাবতে পারি কখনো। শুধু মাত্র গতকাল রাতে আমার পরিচয় পেয়েও আজ তা যখন ভুলে গেছেন তখন তার প্রশংসাতো করতেই হবে।
১৪. সত্যভূষণ বাবু
সত্যভূষণ বাবু ভীষন লজ্জায় পড়ে গেলেন। এর কি উত্তর দেবেন তিনি। অশ্রুকণা এসে বললেন চলুন সত্যবাবু। তারপর জানতে চাইল, কত দেরি হবে ওখানে? বেশী নয়, হয়তো ঘন্টা দেড়েক হতে পাবে। অশ্রুকণা বললনে, সেলিনা আমি ফিরেই রান্নাটা করব। ততক্ষণ প্রান্তিকের কাছে গিয়ে বোস। ওর কিছু দরকার হয় কিনা। ওরা বেরিয়ে গেলেন। আমি বুঝতে পারছি সেলিনা আমার ঘরেই আসছে। ভেজানো দরজা খুলতেই আমি বললাম এসো। ও একটা চেয়ারে বসল আমি বললাম ওখানে কেন আমার কাছে এসো। ও কাছে এল। বললাম সকালে ও ভাবে চলে গেলে কেন? তুমিতো আমাকে চাওনি? কে বলেছে? যদি চাইতে তাহলে আমাকে যেতে দিলে কেন? আর তা ছাড়া কাল বার বার বললাম স্নান করো না। তবু তাই করলে এবং জ্বর বাধালে আর এখন আমাকেই শাস্তি দিতে চাইছো? আমি কি ইচ্ছে করে জ্বর বাধিয়েছি? তাছাড়া কি? এ তোমার ভুল সেলিনা। স্নানতো দুরের কথা, হাতে মুখে পর্যন্ত ভালো করে জল দেওয়া হয়নি। আসলে বলতে গেলে জ্বর নিয়েই তোমাদের সঙ্গে এসেছি। ও স্তম্ভিত হয়ে বলল জ্বর নিয়ে? বলনি তো। বলার সময় কোথায় পেলাম। সেলিনা আর কথা না বাড়িয়ে বলল, বাথরুমে যাবে? যাওয়াতো দরকার, কিন্তু উঠতে যে পারছি না। উঠতে পারছে না অদিকে বলেছিলে? না, তাহলে আমাকে ধর। তোমাকে বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছি। ও নীচু হলে দুহাতে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে উঠে পড়লাম। আর আমার গায়ের উত্তাপ ওর শরীরের যেখানে যেখানে স্পর্শ করলো, সেখানে সেখানে। যেন, ফোস্কা পড়তে লাগল। ওর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হল উঃ তুমি কি নিষ্ঠুর।
সমানে মাথায় জল পট্টি দিয়ে চলেছে সেলিনা। ওর মত প্রাণ চঞ্চল সদা কৌতুকময়ী মেয়েরও যে কি হল কে জানে। গুম মেরে বসে আছে, কি যে করবে বুঝতে পারছেনা। কলকাতা হলে হয়তো এতক্ষণ ২/৩ জন ডাক্তারকে কল দিয়ে বসতো। কিন্তু এখানে তো! কাউকে ও চেনে না। খুব মায়া হতে লাগলো ওর জন্য। বললাম, সেলিনা কি এত ভাবছ? কিছু না আতিক ভাই। কিছু যদি নয় তা হলে এত চুপ চাপ আছো কেন? হাজার কথার ফুলঝুরি ছোটে যে মুখে তা এতো নিশ্ৰুপ কেন? ও আস্তে আস্তে বলল, নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না প্রান্তিক ভাই। কেন? কেবলি মনে হচ্ছে আমি যদি ওই ভাবে অসুখ জ্বর এই সব না বলতাম তাহলে হয়তো তোমার কিছুই হতো না। আমি হেসে ফেলে বললাম, তুমিতো এ যুগের শিক্ষিত মানুষ, সব কিছুকে বিচার করতে হয় যুক্তি দিয়ে। এই সব কুসংস্কারগুলো তোমার মাথায় আবার কবে থেকে শিকড় গেড়ে বসল। ও কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছে দেখে তাড়া লাগিয়ে বললাম, কি হলো বললে না কবে থেকে? ও একটা ছোট্ট সুই তুলে বলল, বিশ্বাস করবে তো। হঠাৎ বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেন? তারপর কি মনে হতে বললাম, সেলিনা, তোমাকে বিশ্বাস না করা যে আমার পাপ। ও বলল, যেদিন থেকে নিজেকে আর তোমার থেকে আলাদা করে ভাবতে পারিনি সেদিন। থেকে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম সেলিনা! ও বলল, আর কথা নয়, ওই বুঝি অশ্রুদি এল। আমি তবুও তাকে বললাম সেই দিনটা কবে বলনা সেলিনা। ও তবু উঠে যেতে চায় দেখে ওর আঁচলটা ধরতেই, ওটা কাঁধ থেকে সরে যেতেই আমি লজ্জায় ওকে ছেড়ে দিলাম। সেলিনাও বুঝি প্রচণ্ড লজ্জায় আর আমার দিকে না তাকিয়ে অশ্রুকণাদের দরজা খুলে দিতে এগিয়ে গেল।
