অশ্রুকণা বলল, তোমাকে যে বুঝতে পারছি না তা নয় প্রান্তিক। আসলে আমি নিজেকে বোঝাতে পারছি না। যে চরম অভিমানে একদিন বাড়ী ত্যাগ করেছিলাম, আজ কেবলি মনে হচ্ছে সে আমার ভুল। ওকে বাধা দিয়ে বললাম, সত্যিইতো। না সত্যি নয় কি সত্যি নয়। এই যে তুমি বললে বাড়ী থেকে চলে আসা আমার ভুল, না ওটা অমার ভুল নয়। তাহলে কি তোমার ভুল। জানিনা, তুমি যাও প্রান্তিক। আমাকে আর দুর্বল করে দিওনা। সেলিনা কোথায়? বাথরুমে গেছে। ও তাই তুমি এসেছে আমার কাছে? ওর সামনে দিয়ে আমার কাছে আসার সাহস তোমার হয়নি তাইতো। আমি থাকতে না পেরে বললাম, এও তোমার ভুল কণা। আমি তো জানিই না তোমার ভিতরে বয়ে চলেছে এক প্রচণ্ড ঝড়। বললে আমি শাড়ীটা বদলে আসি। হ্যাঁ বলেছিলাম আর সত্যিই শাড়ীটা বদলে তোমার কাছে আসতামও। তাহলে না এসে একা একা কাদছিলে কেন? কেন তুমি হঠাই কোন সুযোগ না দিয়ে আমার মনে ঝড় তুলে দিলে? বলল অশ্রুকণা। আমি ঝড় তুলোম? কি ভাবে? ও বলল কেন তুমি এক সাধারণ সৌজন্যতাকে অসাধারণ ব্যঞ্জনাময় করে তুললে? যেমন? কেন তুমি বললে এলোইবা জ্বর কয়েকটা দিন তোমার শুশ্রূষা পাবতো! অথচ তুমি ভাল ভাবেই জান তোমাকে শুশ্রূষা করার জন্য, তোমার পাশে সব সময় থাকার জন্য, সেলিনা আছে, অথচ এই ঝড়টুকু তোমার না তুললে কি চলতো না?
আমি স্তম্ভিত। এই সামান্য ঠাট্টাটুকু কারো জীবনে যে এমন কঠিন ঝড় তুলে দিতে পারে তা আমার ভাবনারও অতীত। বললাম, সত্যি যদি জ্বর হয়, জ্বর কেন, যেকোন রকম শুশ্রূষার প্রয়োজন হয় জীবনে, থাকুক সেলিনা আমার পাশে পাশে, তোমার শুশ্রূষা যদি সত্যি আমার প্রয়োজন হয় পারবে দিতে? ও বলল, তুমি কি নিতে পারবে? বললাম দেখ কশা, সেলিনাকে আমি ঠিক অতটা বুঝিনা যতটা তোমরা বোঝ। একটা জিনিষ শুধু বুঝতে পারি কোন ভাবেই সেলিনা আমার অমঙ্গল চায় না। তার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়ে সে রূখে দাঁড়াতে জানে। আবার যদি সে বোঝে, তার থেকেও কোন কোন মুহূর্তে তোমাকেই আমার প্রয়োজন, হাসি মুখে সরে দাঁড়াবে, কোন রকম রাগ বা অভিমান না রেখেও, আমাকে তোমার হাতে সেই মুহূর্তের জন্য তুলে দিতে তার কোন ঈর্ষা থাকবে না, তাই বলে সে চিরদিনের জন্য তার দাবী ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াবে এতটা দুর্বল তাকে তুমি মনে করো না। আবার ও যাদের ভালোবাসে, এই ধর তুমি, তপতী, রেহানা, নীলাঞ্জনা পিসি, মিনতি সেন এই নামগুলো বললাম এই জন্য যে, কারণ, মেয়েদের ঈর্ষা মেয়েদের নিয়ে আবর্তিত হয়, তাদের যদি কারও সত্যি আমাকে প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই প্রয়োজনের জন্য আমাকে হাসিমুখে ছেড়ে দেবে। এই ধরনা, আজকের কথাই, আমিতো জামিয়া কিছুই, কিন্তু তোমার মনে যে ঝড় উঠেছে, তার জন্য ও আমাকেই দায়ী করল আর অবশ্যিই যেন তোমার কাছে আসি, তার দিব্যি দিয়ে বাথরুমে চলে গেল। সুতরাং সেলিনার অবর্তমানে তোমার কাছে এসেছি এটা ঠিক নয়।
অশ্রুকশা বলল, আর আঘাত দিওনা প্রান্তিক। এবার চুপ কর, তুমি যা বলছ তা যে বুঝিনা তাতো নয়, মন বুঝতে না চাইলে কি করব। আমাকে তুমি ক্ষমা করো। আমি বললাম আমার সঙ্গে তোমার ক্ষমার সম্পর্ক নয় কণা। তোমার সব আচরণকে যদি মেনে নিতে না পারব, কিসের আমার ভালবাসার বড়াই। এবার ওঠ লক্ষ্মীটি, মনে হয় সেলিনার বেরোবার সময় হয়েছে। তোমার আচরণে ও হয়তো ভাবতে পারে সে বুঝি এসে অন্যায় করেছে। ও। ছলছল চোখে তাকালে আমার দিকে। বলল, আমাকে একটা কথা দেবে, আর হয়তো সময়। হবে না। বল। ও বলল তোমাকে যদি ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে তুমি আসবে আমার কাছে? আমি কণ্ঠে আবেগ ঝরিয়ে বললাম আসব। ও বলল, যদি সেলিনা বাধা দেয় তা হলেও, আমি বললাম জানিনা আমার কোন কাজে সেলিনার বাধা দেওয়ার কোন অধিকার আছে কি না, যদি থাকেও, তবু তোমাকে কথা দিচ্ছি কণা, তোমার একান্ত প্রয়োজনে সে আমাকে তোমার দেখার ইচ্ছে হোক বা অন্য যাই হোক, জানতে পারলে আমাকে পাবে তোমার পাশে। কিন্তু ওকে বাধা দিয়ে বললাম আর কিন্তু নয় কশা, ঐ বুঝি বেরোল সেলিনা, এবার তুমি যাও। আচ্ছা তাই হবে। তুমি যাবে না বাথরুমে যাব আগে তোমার হোক।
আমি ফিরে এলাম, যে ঘরে প্রথম এসে বসেছিলাম সে ঘরে। আসতেই দেখি ভিজে কাপড়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসছে সেলিনা। আমি ওর দিকে তাকাতেই একটু হেসে ও অন্য ঘরে ঢুকে গেল।
ভাবছি এই মান অভিমান আর দুর্বলতা নিয়ে কদিন কাটানো যাবে এখানে। সেলিনার চাওয়াটা এতটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তাতে কি ভাবে এর সমাধান হবে কে জানে। আর অশ্রুকণা, ওর চাওয়াটা বুঝি, স্পষ্টতা বুঝিনা। আজ যদি সত্যি সত্যি ও ওর দাবী নিয়ে এসে দাঁড়ায় আমার সামনে বুঝতে পারছি না কি ভাবে তার ইতি টানতে পারব।
কতক্ষণ এরকম ভাবছিলাম মনে নেই। একটা আটপৌরে শাড়ী পরে এসে দাঁড়ালো সেলিনা আমার সামনে। বলল তোমাকে আমার ভীষণ ভাল লাগছে প্রান্তিক ভাই। আমি হেসে বললাম, হঠাৎ? বাঃ জীবনের সব ঘটনাই তো হঠাৎ হঠাৎ হয়, এই যেমন অশ্ৰুদি হঠাৎ বলল, তার ভাল লাগছেনা সে এ চাকরি করবেই না, চলে যাবে আমাদের সঙ্গে। এও তো তার হঠাৎ ভাবনা তাইনা? হয়তো হবে। তাহলে কি তুমি বলতে চাইছো হঠাৎই আমাকে তোমার ভাল লেগে গেল? বলতে পার এই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, বাইরের আকাশে ওই ভরা জোছনা, চারিদিকে এত গাছ গাছালি তার মাঝে ওই সুন্দর ফুলের বাগান, ভাল না লেগে পারে খাওয়া দাওয়ার পবে চলনা আসার সময় দেখে এসেছি বাগানের এক প্রান্তে যে বসার বেদী ওখানে গিয়ে বসব কিছুক্ষণ শুধু তুমি আর আমি। চোখে ওর অদম্য কৌতূহল। আমি বললাম রাজী আছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে নাতো।
