না এরপর তিনি আর দেরি করেননি। সেলিনা বলল, অশ্ৰুদি চাবিটা দাও তো দেখি তোমার নতুন ঘরে কি আছে? আগে চা বা কফিতে খাওয়া যাক। অশ্রুকণা বলল তোমরা বোস সেলিনা আমিই দেখছি। সেলিনা বলল এখন থেকে এত নিজের নিজের ভাবলে চলবে কেন অদি। আমরা চলে গেলেই না হয় ভেবো। আমি বললাম, কণা ওকে চাবিটা দিয়ে দাও, সত্যিই তো আমাদের চা বা কফি খাওয়াবার অধিকারতো ওর আছে। সেলিনা তার তীর্যক দৃষ্টি হেনে বলল, তাহলে মানছ আমার কথা, ও চাবি নিয়ে চলে গেল হাসতে হাসতে।
অশ্রুকণা চুপ হয়ে বসে আছে। এই প্রাকৃতিক পরিবেশ ওর ভাল না খারাপ কেমন লাগছে এই দ্বিধায় পড়েছে বোধ হয়। বললাম, কিছু ভাবছো কণা। না এমন কিছু নয়। ও উঠে গেল। আমায় বলে গেল, সারদিনের পোষাকটা বদলে আসছি। তুমিও বাথরুমে গিয়ে হাতে মুখে জল দিয়ে পোষাকটা বদলে নাও। ভাবছি স্নান করব। ও আঁতকে উঠে বলল, না প্রান্তিক, নতুন জায়গা জ্বরটর আসতে পারে। এলোই বা, কয়টা দিনতো তোমার শুশ্রূষা পাব। ও থমকে দাঁড়িয়ে বলল, লোভ যে হয় না প্রান্তিক তা নয়, তবে সে অধিকারটুকু পাব কি না কে জানে। ও চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কফি, বিস্কুট, ডিম সিদ্ধ নিয়ে এল সেলিনা, আমাকে একা বসে থাকতে দেখে বলল, অশ্ৰুদি কোথায়? সারা দিনের পোষাকটা ছাড়তে গেছে। এখনি আসবে। তুমি ছাড়বেনা? তারপর বলল, তুমি একটু বোস আমি আসছি। ও ভিতরে গিয়ে দেখল, অশ্রুকণা কিছুই ছাড়েনি, একা একা কাঁদছে। সেলিনা বলল, অশ্ৰুদি তুমি কাদছো, সেলিনাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার একদম ভাল লাগছেনা। সেলিনা এ চাকরি আমি কবব না। তোমাদের সাথেই ফিরে যাবো। সেকি কথা অদি। এত সুন্দর জায়গা, কেন করবে না? কেন তুমি এরকম ভাবছো! জানি না, কেন আমার মোটেই ভাল লাগছেনা। আচ্ছা ঠিক আছে। কালতো রবিবার। কাল না হয় সারদিন ভেবো। এখন চল, আমি কফি করে ও ঘরে রেখে এসেছি, প্রান্তিক ভাই বসে আছে, আগে ওটা খেয়ে নাও, তারপর না হয় শাড়ী বদলিও। সেই গাড়ীতে কখন কি খেয়েছে। তারপর অশ্রুকণাকে এক প্রকার জোর করে নিয়ে এলো সেলিনা।
চুপচাপ কফিটা খেয়ে উঠে পড়লো ও। সেলিনা বাধা দিল না। ও চলে গেলে, সেলিনা বলল, জান প্রান্তিক ভাই অশ্ৰুদি শাড়ী বদলাবার নাম করে ঘরে গিয়ে শুধু কাদছিল। কঁদছিল? কেন? তাব নাকি এ জায়গা একদম ভালো লাগছেনা, তাই অশ্ৰুদি এখানে জয়েনও করবেনা, আমাদের সঙ্গেই ফিরে যাবে। তুমি কি কিছু বলেছো? আমি উন্মা প্রকাশ করে বললাম, হঠাৎ আমাকে আক্রমণ করছ কেন? আমি ওকে কি বলবো? তারপর বললাম এত সুন্দর জায়গা যদি ওর পছন্দ না হয়, তাহলে কিছু করার নেই। এই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও কোথায় পাবে? ওরতো বরং প্রতীমবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এত সুন্দর একটা চাকরি ওকে পাইয়ে দিয়েছেন বলে? বাঃ তোমার বক্তৃতা শেষ? মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ হলেই বুঝি একা একা থাকা যায়? একা একা থাকবে কেন? সত্যভূষণ বাবুতো। বলেছেন, কাল থেকে একটি কাজের মেয়ে আসবে। তাছাড়া এখানে ওর মতো আরো অনেক শিক্ষয়ত্ৰী আছেন, তারা কেমন কবে থাকছেন? তুমিতো জানো তারা কেমন করে থাকছেন। হয়তো তাদের মনেও এই রকম দুঃখ আছে। আমি বুঝতে পারছি না সেলিনা, কেন অশ্রুকশার এই ভাবনাকে তুমি সমর্থন করছে। তোমার জন্য। আমার জন্য? হা তোমার জন্য। মানে? যা হোক এমন কিছু তুমি বলেছে, যেটা অশ্ৰুদিকে আঘাত দিয়েছে। তুমি হয়তো আমায় বলতে চাইছেনা। তারপর বলল, তোমাদের সঙ্গে আমার আসাই উচিত হয়নি। কিন্তু কি করব এসে যখন পড়েছি।
আমি তারপর বিস্মিত হয়ে বললাম, তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে আমার একদম ভাল লাগছেনা সেলিনা। তাহলে কাগজ কলম দাও, লিখে রাখি কেন তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে হচ্ছে? মিনতি পিসিকে রিপোর্টটা করতে হবে তো। কবে তুমি সিরিয়াস হবে সেলিনা? কত সহজ ভাবে বলল, যেদিন তোমার মন, অন্যের জন্য সংবদেনশীল হয়ে উঠবে। কি বলতে চাইছে তুমি? কিছুনা। অদিকে কি বলেছে, তা তুমিই জান, আমি বাথরুমে যাচ্ছি, ততক্ষণ তুমি ওকে তোমার মত করে বোঝাও, একটু জিততে চেষ্টা কর প্রান্তিক ভাই? সব জায়গায় এত হেরে যাও কেন বলতো। মনে রেখ দুর্বল পুরুষকে করুনা করা যায় শ্রদ্ধা। করা যায় না।
ও কফির সরঞ্জামের সব কিছু নিয়ে চলে গেল। অশ্রুকণার দুঃখ হয়তো বুঝতে পারছি। মনের মধ্যে যে গোপন স্বপ্নগুলো থাকে, বাস্তব, পারিপার্শিকতা, আর যৌক্তিকতা যাকে প্রতিমুহূর্তে প্রতিহত করে চলে, এমনি এক উন্মুক্ত মনোরম পরিবেশে, তা হয়তো প্রকাশ হতে চায়। অশ্রুকণার মনের মধ্যেকার সেই স্বপ্নগুলো হয়তো বেরিয়ে আসার জন্য গুমরে মরছে, কিন্তু সে জানে, তার কোন উপায় নেই। তাই হয়তো চাপা অভিমান চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু আমি কি করবো। তবুআস্তে আস্তে গেলাম অশ্রুকণার কাছে। চেয়ারে বসে মাথাটা উপুড় করে টেবিলে রেখে চুপ করে আছে। পিঠ থেকে আঁচলটা সরে গিয়ে উন্মুক্ত পিঠের অনেকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। আমি ওর পিঠে হাত দিতেই ও টেবিল থেকে মাথাটা তুলেই মুহূর্তে আমাকে দেখে তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বলল, না প্রান্তিক আমি পারব না কিছুতেই পারবো না তোমাকে ছেড়ে থাকতে। আমি আস্তে আস্তে ওকে আমার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চেয়ারটায় বসিয়ে দিয়ে বললাম, কণা, এভাবে কেন নিজের দুর্বলতায় আরেকজনকে আচ্ছন্ন করছ? কেন বুঝতে পারছনা এখানে সেলিনা আছে। ও যে কিছু বোঝেনা তাতো নয়। ওর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, ওর অনুভূতি প্রখর, ওর উপলব্ধি সীমাহীন, কেন তার কাছে এভাবে ছোট হয়ে যেতে চাইছে। তা ছাড়া তাকে নিয়ে আসার জন্য তো জোর তুমিই করেছিলে। তাহলে এমন করছ কেন? আর আমার কথা কেন একদম ভাবছনা। তোমার এই দুর্বলতা আমাকে কত দুর্বল করে দিতে পারে বুঝতে চাইছেনা কেন? এরপর মুখ দেখাবো কি করে?
