আমাদের যিনি নিতে এসেছিলেন, তিনি সত্যভূষণ দোসাদ। ভদ্র শিক্ষিত এবং মার্জিত এক যুবক। আমরা নামতে তিনি নমস্কার করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমি আপনাদের নিতে এসেছি।
রাস্তা দিয়ে চলছি। চারপাশের হত দরিদ্র মানুষগুলিকে দেখে কান্না আসার মত অবস্থা। এত দীর্ঘ পথে কোথাও একটা ভালবাড়ী চোখে পড়লনা। জামা গায়ে আছে এমন মানুষজনের সংখ্যাও খুব কম। সত্যভূষণ বাবু আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন,এখানকার মানুষজন খুবই গরীব, কিন্তু তাই বলে আপনারা শহরের মানুষেরা এই সব গরীব মানুষদের যে চোখে দেখেন এরা কিন্তু তা নয়, এদের আত্মমর্যদা সীমাহীন। এরা চুরি করে না, না খেয়ে থাকলেও ভিক্ষা করে না। বরং শহর থেকে যারা এখানে আসেন, তাদের যাতে কোন কষ্ট না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন, অথছ মজার ব্যাপার কি জানেন, শহরের মানুষ এদের কখনো মানুষ বলেই ভাবে না। হোট বড় সকলকেই তুচ্ছার্থে তুই তোকারি করেন। সামান্য ভদ্রতা করে তুমি পর্যন্তও বলেন না। অথচ এরা কিন্তু কোন কিছুই তেমন একটা গায়ে মাখে না। তার বিশ্বাস, ঈশ্বরই এই ব্যবধান যখন রচনা করেছেন তখন আর তাদের প্রতিবাদ কবে কি লাভ? সেলিনা ও অশ্রুকণা কোন কথারই কোন উত্তর না করে চুপ করে শুনে যায় মিঃ দোসাদের বক্তব্য। আমি বললাম, সত্যভূষণ বাবু, আপনিতো এদেরই একজন। উনি বললেন হ্যাঁ। আপনি নন? আমি চমকে উঠলাম, সত্যভুষণ বাবু যে এমন চোখা প্রতি উত্তরে আমার হৃদয়কে নাড়া দিয়ে যেতে পারেন তা ভাবনার অতীত ছিল।বললাম, নিশ্চয়ই। আমি অবশ্যই এদেরও একজন, যেহেতু এরা মনুষ্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নন। কিন্তু আপনাকেই আমার জিজ্ঞাস্য আমার মনে হয় আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত। উনি কথার মাঝখানে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, শিক্ষিত বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন জানিনা।যদি একাডেমিক কোয়ালিফিকেসানকে আপনি শিক্ষিতের মানদণ্ড হিসাবে বিচার করেন তাহলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমি গত বছর ইংরেজীতে প্রথম শ্রেণীর এম.এ করেছি। অবশ্য এটাকে আমি কোন পবিচয় বলে মনে করিনা। কারণ একটু অনুকূল পরিবেশ আর আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলে যেকোন মানুষই আমার মত বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে এমএ করতে পারেন। কারো নামের পাশে এক গাদা ডিগ্রী দিয়ে আমি তার মূল্যায়ন করিনা। সামান্য থেমে বললেন আমি মানুষকে বিচার করি তার হৃদয়ের সংবদেনশীলতা দিয়ে। মানুষকে আপন করে নেওয়াব ক্ষমতা কতটুকু আছে তাই দিয়ে তাকে আমি পরিমাপ করি। তারপর সুন্দর হেসে বললেন, থাক না ও সব কথা। আপনারা আজ প্রথম এসেছেন আর আসার সময় এই অখ্যাত অজ্ঞাত কুলশীল মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে এসেছেন। ভয় পেয়ে যেতে পারেন, সেই আশঙ্কাতেই এত কথা বলা। কিন্তু ওরা যে ভয়েব বস্তু নয়, এটাই শুধু জানিয়ে দিতে চেয়েছি। আমার বাচালতাকে ক্ষমা করবেন।
সন্ধ্যার পরে আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছালাম মন প্রশান্তিতে ভরে গেল। বিরাট স্কুল কমপাউন্ড। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। অজস্র জানা অজানা গাছ-গাছালি আর কোয়ার্টারের সামনে সুন্দর ফুলের বাগান। প্রত্যেকটা কোয়ার্টার একতলা, মেঝে পাকা, কিন্তু ছাদ টালির। এক একটা কোয়ার্টার থেকে আরেকটা কোয়ার্টারের দূরত্ব বেশ খানিকটা এবং কাটাতারের বাউন্ডারি দিয়ে তা আলাদা করা। সেলিনা বলল, প্রান্তিক ভাই কি অপূর্ব জায়গাটা তাই না? তারপর অশ্রুকণাকে বলল, অশ্ৰুদি তোমার ভাগ্যটা সত্যিই হিংসা করার মত। সত্যভূষণ বাবু বললেন, আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না, তবে একথা আপনি ঠিকই বলেছেন জায়গাটা অপূর্ব। মানুষগুলো আরো অপূর্ব, শুধু যদি তাদের অনাড়ম্বর সাধারণ জীবন যাত্রাকে মেনে নিতে পারেন। আরেকটা কথা ভয় পাবেন না। এমনিতে এখানে কোন ভয় নেই, তবু ম্যানেজমেন্ট এই গোটা বাউন্ডারির বাইরে পাহারা দেওয়ার জন্য রক্ষী মোতায়েন রেখেছেন। নামেই তারা রক্ষী, আসলে তারা এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের দল। তাদের কাছে এই স্কুলটা দেব মন্দিরের মতন পবিত্র, তাই তারা নিজেদের গরজেই সারারাত ধরে পাহারা দেন কেউ যাতে এই মন্দিরের পবিত্রতা নষ্ট করতে না পারেন। ম্যানেজমেন্ট তাদের জন্য যা ব্যয় করেন, তা তারা কেউই হাতে নেননা, এই স্কুলকেই দান করে দেন। অশ্রুকণা এই প্রথম বলল, আশ্চর্য তো। হ্যাঁ সত্যিই আশ্চর্য! তারপর বললেন, থাকতে থাকতে যদি এদের ভালো লেগে যায় তাহলে দেখবেন আরো অনেক ব্যাপারে আশ্চর্য হয়ে যাবেন। আমি বললাম, তা হলে কি আপনি বলতে চাইছেন এখানে চোব, গুডা, বদমায়েস এ সব নেই? নেই কেন হবে? আছে। তবে আপনাদের শহরের মতো তারা মাথা উঁচু করে চলে না। তারা এই সমাজ জীবনের বাইরেই থাকে। গ্রাম্য নেতৃত্ব তাদের সাধ্যমত বাইরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে যে আপনি বললেন, এখানে কোন চোর-গুভা নেই। আমি সেই ভাবে বলিনি, আসলে আপনারা শহরের ভদ্রলোকেরা যেমন ভাবেন, গ্রামের গরীব মানুষ মানেই হয় গুন্ডা না হয় চোর আমি তার প্রতিবাদ করেছি মাত্র। আপনার এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক। উত্তরে মিঃ দোসাদ বললেন সেই অর্থে আমি প্রতিষ্ঠানের কেউ নই। প্রতীমবাবু একদিন আমাকে ডেকে বললেন, তোমার ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাক আমি চাইনা, তবু যদি গ্রামকে ভালবেসে গ্রামেই থাকবে বলে মনস্থ কর তাহলে, এই প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দের দায়িত্ব গ্রহণ কর না। তা ছাড়া আমি এই স্কুলেরই ছাত্র। তাইতো তার অনুরোধকে ফেলতে পারলাম না, এই আর কি। সরকারি ভাবে আমি কেউ নই, শুধু ভালবাসার টানে থেকে গেছি। অবাক হয়ে শুনছে অশ্রুকণা ওর কথা। বুঝতে পারছি ওকে আমাদের সবার ভাল লেগে গেছে। উনি বললেন, আজ আর হবে না অশ্রুদেবী, তবে কাল থেকে এখানকার একটি মেয়ে আপনার সংসারের যাবতীয় কাজ করে দেবে। ওকে বেতন দেওয়ার দায়িত্ব অবশ্য ম্যানেজমেন্টের। তাকে ভাল লাগলে আপনাকে শুধু সুপারিশ করতে হবে। অবশেষে বললেন আসি তাহলে নমস্কার। রান্না ঘরে সবই আছে এখানে রান্না কয়লায় করতে হবে। বাসন পত্র রান্নার সবই আছে। এবেলার মত তরিতরকারী, ডিম, ডাল রাখা আছে। ম্যানেজমেন্টের বাজার সরকাব কাল সকালে আসবেন, এখানকার স্টোর থেকে তিনিই সব পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। মাসের শেষে আপনার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। এটাই এখানকার নিয়ম। অবশ্য আপনি ইচ্ছে করলে বাজারটা নিজেও করতে পারেন। পারবেন কিনা বলতে পারবো না কারণ, কাছাকাছি কোন বাজার নেই। আসি তাহলে। উনি বেরোতে গিয়েও আবার ফিরে এসে বললেন। এই দেখুন সবই বললাম, কিন্তু চাবি দিতে ভুলে যাচ্ছিলাম। এই ধরুন চাবি। চা-কফি-বিস্কুট, গুড়ো দুধ সবই আছে ষ্টোর রুমে। স্টোর রুম খুললেই দেখতে পাবেন।
