একই নারীর কি বিচিত্র রূপ। ঠিকই বলেছিল কাল রাতে ও, আমিতো কেবল শান্ত সরোরব নই আমি উত্তাল সমুদ্র। নিজের সম্পর্কে তার এই মূল্যায়ন আমার মনে হয় ১০০ ভাগ খাঁটি। জিজ্ঞাসা করার সময় হলো না, তোমার কথা অনুসারে যারা আমার উপরে নির্ভর করতে চায় তাদের আগলে রাখার ক্ষমতা আমার আছে কি না, তারা কারা। তার আগেই গাড়ীটা ঢুকে গেল স্টেশনের ভিতরে।
প্লাটফর্মে গাড়ী দেয়নি তখন, হয়তো এখনি দেবে। দেখতে পেলাম একটি কফি স্টলে দাঁড়িয়ে আছেন মিনতি সেন ও অশ্রুকণা। তারা এদিকে ওদিক তাকাচ্ছেন, আমরা এসেছি কি না তাই হয়তো খুঁজে দেখছেন, সেলিনা এগিয়ে এসে অশ্রুকণার হাত ধরে বলল, অশ্ৰুদি লোভ সামলাতে পারলাম না, তাই চলে এলাম তোমাকে তোমার নতুন জায়গায় শুধু পৌঁছিয়ে দিতে নয়, কটাদিন থাকার বায়নাও নিয়ে এসেছি তাড়িয়ে দেবে নাতো।
এতো সেই পরিচিত সেলিনা। তোমাকে তাড়িয়ে দেব বলেই কি প্রান্তিককে অত করে বলেছিলাম আসতে না চাইলেও জোর করে নিয়ে আসবে। সেলিনা তাকালে আমার দিকে, অসম্ভব দুষ্টুমি ভরা দুটি চোখ। বলল, কই প্রান্তিক ভাই একবারও তো বললে না সে কথা। শুধু তুমি কিছু মনে কর কি না, তাইতো এত না আসার বায়না ধরেছিলাম। কিন্তু তোমার ছাড় পত্র নিয়েও এই গোপনতার মানে কি?
কি উত্তর দেব এর, তবু কিছু না বললে অশ্রুকণা ভুল বুঝতে পারে, তাই বললাম, তুমিই বলতো সেলিনা, সে সুযোগ কি তুমি দিয়েছো? কাল থেকে আজ পর্যন্ত যা তুমি করেছে তাতে বলার সুযোগটা পেলাম কখন? হয় তো সত্যি। সেলিনা যে তা বোঝে না তাও নয়, তবু সে সেলিনা, যে কখনো হারতে জানে না। বলল পিসি তোমার ছেলেকে আমার পিছনে লাগতে না করে দাও, নিজে হাজারটা দোষ করবে আর অপরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে এটা ঠিক নয়, এটা অন্যায়। মিনতি সেন ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন হারে সেলিনা, ওখানে গিয়েও কি এমনি করে ঝগড়া করবি নাকি তোরা। এই দেখ পিসি, নিজের ছেলের অন্যায়টাকে কি কৌশলেই না তুমি আড়াল করতে চাইছে। হেসে ফেলেন মিনতি সেন, বললেন, এতো সব মায়েরই ধর্ম। তোর মা তোকে আড়াল করে না? করেন তো, আবার বকেনও। অবাক হয়ে মিনতি সেন বললেন, নীলাঞ্জনা তোকে বকেছে কোনদিন? হা বকেছো তো। এমন ভাবে বকেছে যে কাল রাতে খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে গিয়ে সারারাত না খেয়ে রয়েছি। এখন মনে হচ্ছে দূর আমি কি বোকা। রাগারাগি করে না খেয়ে থাকার কোন মানে হয় নাকি। এখন খিদের কষ্টটাতো আর মাকে পেতে হচ্ছে না। আমাকেই ভুগতে হচ্ছে। তা পিসি যা হোক কিছু খাওয়াও তো আগে, তারপর কথা হবে।
আচ্ছা খাওয়াচ্ছি, বল কি খাবি? কি করে জানব তোমাদের কাছে কি আছে? আর এই সময় হুট হুট করে ট্রেনটা প্লাটফরমে ঢুকে গেল। মাইকে, ঘোষনা করা হচ্ছে ১৫ নং প্লাটফর্মের গাড়ী নির্দিষ্ট সময়েই ছাড়বে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আর মাত্র ৫ মিনিট সময় বাকী আছে। অশ্রুকণা বলল ট্রেনে গিয়েই খাওয়া যাবে সেলিনা, আমারও খিদে পেয়েছে। তোমার মত কাল রাতে আমারও খাওয়া হয়নি। সেলিনা অবাক হয়ে বলল, কেন, তোমার খাওয়া হয়নি কেন? ঐ তোমারই মত। কি রকম? প্রান্তিক অতরাতে না খেয়ে চলে এল, পিসিকেও তাই আর বললাম না, ডাকলামও না, এই সবের জন্য আর কি? ওঃ এখানেও তাহলে সেই প্রান্তিক ভাই। তা হলে বুঝতে পারছ পিসি মা হয়ে ছেলেকে কেমন করে আড়াল করছো? তারপর বলল, তোমার ছেলে যদি না খেয়ে আসে, তোমার সঙ্গে দেখা না করে আসে তার জন্য তোমার নিজের ছেলেকেই বকা উচিত অশ্ৰুদিকে বকা কেন? ওকি করবে? ও কি বলেছে, তুমি খেয়োনা, মায়ের সাথে তোমার কথা বলার দরকার নেই। ওর কথা শুনে মিটি মিটি হাসছেন মিনতি সেন, সেলিনাকে বললেন, তোর অভিযোগ যথেষ্ট গুরুতর, আর ওখানে যে কয়দিন থাকবি, সব অন্যায় গুলো খাতায় লিখে রাখবি, তার পর ফিরে এসে আমাকে জানাবি, দেখবি কিরকম শাস্তি দিই। তুই কি ভেবেছিস মা হয়ে ওকে ক্ষমা করব? মোটেই নয়। মনে থাকবে তো। মনে থাকবেনা মানে, সাক্ষী নেই? সেলিনা বলল যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকেই সাক্ষী মানতে হবে নাকি? তাহলে কাকে মানবি? অশ্রুতো থাকবেনা। ও বলল তোমাকেই মানবব। মিনতি সেন একটি ছোট্ট শিশুর মতো সেলিনাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বললেন আচ্ছা তাই মানিস। তারপর দ্রুত গাড়ী থেকে নামতেই গাড়ী ছেড়ে দিল।
মেদিনীপুরের এক আধা মফসল শহরের প্রান্ত ঘেঁষা আদিবাসী, তপশিলী ও অনুন্নত শ্রেণীর মানুষের ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুল। স্কুলটা খানিকটা মিশনারী ধাঁচের হলেও মিশনারী নয়। ব্যয়ভার বহন করে প্রতীম বাবুদের কোম্পানী। ম্যানেজমেন্ট ওখানে যে সমস্ত শিক্ষয়িত্রীরা থাকতে চান তাদের জন্য যেমন হোষ্টেল এর এ্যারেঞ্জমেন্ট করেছেন, তেমনি যারা থাকতে চান না, তাবা যাতে সময় মত স্কুলে আসতে পারেন তার জন্য গ্রাম্য যান বাহনের বন্দোবস্ত রেখেছেন, এমন কি স্কুলের সকল শিক্ষাথী, তাদের জন্য আলাদা কোয়ার্টারের ব্যবস্থা রেখেছেন, সে সমস্ত কোয়ার্টারের বিদ্যুৎ থেকে জ্বালানী পৰ্যন্ত সবকিছুই বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। সপ্তাহে ৪ দিন হয় পঠন পাঠন, আর ২ দিন হাতে কলমে কাজ শেখানো হয়। অঞ্চলটা কৃষি প্রধান, তাই এখানকার ছেলেমেয়েরা যাতে কৃষি কাজটা বিজ্ঞান ভিত্তিক করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শহর এখান থেকে অনেক দুরে। তাই এখানকার ছেলেমেয়েদের জন্য মাসে একদিন শিক্ষা মূলক যাত্রা থিয়েটার ইত্যাদির ব্যবস্থা রেখেছেন। ম্যানেজমেন্ট বিশ্বাস করে, এই সমস্ত খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হলে তাদের ভাষায় তাদের মতো করেই বোঝাতে হবে। আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট আগের থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন যাতে কোন অসুবিধা না হয়। মেদিনীপুর শহর থেকে সারাদিনে একটি মাত্র বাস যাতায়াত করে। আর সেই বাস স্টপেজ থেকেও এখানকার দূরত্ব কমবেশী ২০ কি.মি., হয় সাইকেলে, না হয় ভ্যান রিক্সা অথবা হাঁটা ছাড়া যাওয়ার কোন বিকল্প উপায় নেই। মটর গাড়ী যাওয়ার কোন রাস্তা নেই, তবে সাইকেল বা ভ্যান রিক্সা যাওয়ার রাস্তা সরু হলেও পরিচ্ছন্ন।
