জানি অংকের হিসাবের সঙ্গে জীবনের হিসাব মেলে না। মিনতি সেন সরাসরি অকশাকে নিয়ে হাওড়াতে চলে যাবেন। আমি যাব এখান থেকে ৮ টায় ট্রেন। সুতরাং আমাকে ৭টা থেকে ৭.১৫ মি. মধ্যে বেরোতেই হবে। সকালে উঠে প্রস্তুতও হয়েছি। সেলিনাও যথা সম্ভব সাহায্য করেছে। নীলাঞ্জনা বললেন, সেলিনা, মা তুইও যা, কয়েকদিন থেকে আয় অশ্রুদের সাথে, ওর ও ভাল লাগবে, তোরও ভাল লাগবে। সেলিনা বলল কেন যে বিরক্ত কর মা, বারবার এক কথা বলে, একদম আমার ভালো লাগে না, বলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। যাওয়ার সময় হয়ে গেছে আর দেরি করলে ট্রেন মিস্ করতে পারি। ওর দরজার কাছে গিয়ে বললাম, সেলিনা আসছি, তারপরে কণ্ঠে আবেগ ঝরিয়ে বললাম ঠিক আছে তোমাকে যেতে হবে না, তাই বলে যাওয়ার সময়ও তুমি দরজা বন্ধ করে থাকবে? কণ্ঠে বুঝি আবেগের সঙ্গে মিশেছিল বিষণ্ণতার ছোঁয়া। কোন উত্তর নেই ভেতর থেকে। পিসিকে প্রণাম করে আমি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ছি, হঠাৎ দরজা খুলে বেরিয়ে এল সেলিনা, ঠিক যে পোষাকে ও কাল রাতে এসেছিল আমার কাছে। শুধু খোঁপাটা এলো নয়, চুল সুন্দর বেনী করে বাঁধা। কাঁধে শান্তিপুরী ঝোলা ব্যাগ। বেরিয়ে এসে বলল চল প্রান্তিক ভাই। আমি অবাক হয়ে বললাম কোথায়? ওর কণ্ঠে সেই চাপল্য, বলল। নিজের স্বার্থটাতো ভাবতে হবে, তোমাদের অবাধ্য হয়ে নিজের স্বার্থ বাঁচাব কি করে? দেখতে পাচ্ছি নীলাঞ্জনার চোখ দুটি আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বললেন, সেই যখন যাবিই ঠিক করলি, কিছু না খেয়ে বেরোবি। দাঁড়া একটা মিষ্টি আর এক গ্লাস জল খেয়ে যা। বাধ্য মেয়ের মত তাই খেয়ে নিয়ে, আমাকে বলল, গাড়ীতে উঠে কিন্তু খাওয়াবে প্রান্তিক ভাই। পেটে অত খিদে নিয়ে আমি কিন্তু এতটা পথ যেতে পারবো না। বললাম আচ্ছা। রাস্তায় নেমেও আবার দ্রুত ফিরে এল ও ঘরে। আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠলো। কি জানি, আবার মত পরিবর্তন করবে কি না। কিন্তু না, ও এসে নীলাঞ্জনাকে প্রণাম করে বলল, চিন্তা করো না মা, আমি যত জেদীই হইনা কেন তোমাদের অবাধ্য হব না, বলে নীলাঞ্জনাকে কিছু বলার অবকাশ না দিয়েই আবার দ্রুত ফিরে এল। একটা চলন্ত ট্যাক্সিকে হাত দিয়ে থামিয়ে উঠে পড়লাম। বসলাম পাশাপাশি, ট্যাক্সি চলতে আরম্ভ করলে বললাম, কাল থেকে বলছি চল আমার সাথে, পিসি বলেছে, তবু এত উৎকণ্ঠায় রাখলে কেন? ও শুধু হাসল। হাসলে যে। না এমনি। শুধু এমনি, না অন্য কিছু ভা ছিলে? ও আস্তে আস্তে আমার একটা হাত ওর হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, কি জানি কেন ভীষণ ভয় করছে, কেন যে বুকটা এমন করে খাঁ খাঁ করছে, কিছুতেই বুঝতে পারছি না। তারপর বলল এই সব অশুভ চিন্তাকে সরিয়ে রাখতে প্রাণপনে যুদ্ধ করবার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারলাম না তোমাকে একা ছেড়ে দিতে, যদি অন্যায় করে থাকি, ক্ষমা করে দিও। তারপর বলল, আমার মনের মধ্যে যে কী হচ্ছে সে কেবল আমি জানি তোমাকে তা বোঝাতে পারবো না।
একোন সেলিনা! যতই দেখছি ততই যেন অবাক হয়ে যাচ্ছি। এই রোদ তো এই বৃষ্টি, এই মরুভূমি তো পরক্ষনেই সাগরের উচ্ছল তরঙ্গ। কিছুতেই ওর মনের কিনারা খুঁজে পাচ্ছিনা। বললাম, তাহলে শুধু জিততেই পার না মাঝে মাঝে হারতেও জান, তাইনা? ও আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল, হার জিতের মানে জান? বোঝ কাকে বলে হারা আর কাকে বলে জেতা? সেই পুরোনো সেলিনার মেজাজ যেন। বললাম, না জানিনা। কিন্তু ওখানেই না থেমে বললাম, বক্সিং-ই তোমার আসল জায়গা, যেখানে হার জিতই শেষ কথা। তাই বলে ভালবাসার অভাব হয় না কোন দিন। ও বলল থাম? অনেক বড় বড় কথা বলছ প্রান্তিক ভাই। কতটুকু জান তুমি এই বক্সিং জগতের? জান ব্যর্থ যে হয় তার জন্য কাঁদে কত লোক? শুধু কথার মায়াজালে নিজের সত্যকে আড়াল করতে চাইছে। চাইছে না আমি তোমার সাথে যাই এইতো। তারপর বলল, নামিয়ে দাও আমাকে। যাবনা আমি তোমাদের সাথে? বললেই তো পারতে একথা, না ক্ষণিকের দুর্বলতায় ভুলে গিয়েছিলে সবকিছু। তোমার জীবন তোমারই, সেখানে রেহানা আসবে না অশ্রুকণা আসবে, সে অংকের হিসাব মেলাবে তুমি, কেন অকারণ আমায় জ্বালাতন কর। তারপর আমাকে কোন সময় না দিয়ে নিজেই আদেশ করল ড্রাইভার, গাড়ী রোখ।
এই প্রথম রেগে গেলাম আমি। ড্রাইভারকে বললাম, কারো কোন কথা শুনতে হবে না। ট্রেনটা মিস্ না করতে হয় তার জন্য একটু তাড়াতাড়ি চালাও ভাই। তারপর সেলিনাকে বললাম, দেখ সেলিনা, সকলের সহ্যের একটা সীমা আছে আর আছে হেয়ালিরও, নিজেকে তুমি যতবড়ই মনে করো না কেন, তোমার মূল্য কতটুকু তা তুমি ভাল ভাবেই জান। কোন কিছুকে সোজাসুজি পেতে শেখো। ভালবাসলেও সোজাসুজি ভালবাস। ঘৃণা করলেও তা সোজাসুজি করো। আর একটা কথা জেনে রাখ জীবনটা তোমার হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ তুমি আমাদের অস্বীকার করে বেরিয়ে না যাচ্ছে ততক্ষণ তোমার খেয়ালটাই একমাত্র সত্য হতে পারে না। বলেছিলে অপমান করতে করতে আমায় নাকি অপমানের নেশায় পেয়েছে। তুমি কি করছ? কে দিয়েছে প্রত্যেককে এত অপমান করার অধিকার? আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসতে চাইলো। থেমে গেলাম। কিন্তু প্রচণ্ড রেগে যে গেছি তা বুঝতে পারার জন্য তৃপ্তিও পাই। কিন্তু আমার রাগ জ্বালাকে কোন গুরুত্বই না দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠলো সেলিনা। উত্তেজিত হয়ে বললাম, হাসলে যে। এবার শান্ত সরোবরের মতন স্থির যেন ও। বলল, তোমার ভিতরের এই পৌরুষটাকেই দেখতে চেয়েছিলাম প্রান্তিক ভাই, তোমাকে দুর্বল ভাবতে এত কষ্ট হচ্ছিল যে, শুধু ভাবছিলাম, যারা তোমার উপর নিজেদের ভাগ্যকে সঁপে দিতে চায়, তাদের বুক আগলে বাঁচাবার কোন ক্ষমতা তোমার আছে কি না।
