আগে পিসির ঘরে আলদা বিছানায় ও রাত কাটাতো। ওর পড়াশোনার অসুবিধা হয় বলে পাশের যে ঘরটা এতদিন অব্যবহারে পড়েছিল সেটাই সাজিয়ে গুছিয়ে তাকে দেওয়া হয়েছে। ঘরটা আমার ও পিসির ঘরের মাঝখানে। ও সেই ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। নীলাঞ্জনা ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন। উঠে গিয়ে ওকে ডাকলেন কয়েক বার। কিন্তু সেলিনা বলল, আমার ঘুম পাচ্ছে, আমাকে আর বিরক্ত করোনা মা। নীলাঞ্জনা আর অপেক্ষা না করে ফিরে এলেন। বুঝতে পারছি খুবই আঘাত পেয়েছেন নীলাঞ্জনা পিসি। মাতৃত্বের সবটুকু অধিকার তাকে দিয়েও কেন যে এই অভিমান কে জানে? আমি বললাম, ওতো চিরদিনই এই রকম, ও বলছিল বোলুকনা, আমিতো ওর কথায় কিছু মনে করিনা পিসি।
নীলাঞ্জনা বললেন তা ঠিক। তারপর কী ভেবে বললেন, এক কাজ করে প্রান্তিক তুমি ওকেও নিয়ে যাও। এখানে থাকলে কে জানে ওর এই অভিমান কদিনে ভাঙবে? আমারও খুব খারাপ লাগবে। বরং তোমার সাথে গেলে হয়তো আস্তে আস্তে এ অভিমান এক সময় জল হয়ে যাবে। যদি যেতে না চায়? জোর করে নিয়ে যাওনা। আমার বিশ্বাস তুমি জোর করলে ও অমত করবেনা। আচ্ছা কাল সকালেই দেখব। কাল সময় হবে না। আজই রাজী করাও। কি করে করাবো, ও যদি দরজা না খোলে। খুলবে। বললাম যদি খোলেও আমার প্রস্তাবে কি রি-অ্যাক্ট করবে কে জানে?
আমি খেয়ে উঠে পিসির সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কথা সেরে, নিজের ঘরে যাওয়ার সময়, ওর দরজায় ঠক্ঠক্ শব্দ করে ডাকলাম ওকে। কিন্তু ও কোন সাড়া দিল না। আমি ওযাতে শুনতে পায় তেমনি ভাবে বললাম, আমি জেগে থাকব। তোমার সঙ্গে আমার ভীষণ জরুরী কথা আছে, একবার এসো লক্ষ্মীটি। তারও কোন প্রতি উত্তর ও দিল না। পিসি বললেন, তুমি নিজের ঘরে যাও প্রান্তিক। ওকেতো বললেই, ওর সঙ্গে তোমার কথা আছে, যদি ওর প্রয়োজন থাকে ও যাবে তোমার কাছে, না হলে আর কি করা যাবে। নীলাঞ্জনা পিসিও খানিকটা বিরক্ত হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজায় খিল তুলে দিলেন।
রাত ক্রমান্বয়ে গম্ভীর হয়ে এসেছে ও আসতে পারে, এই আশায় আলো জ্বালিয়ে শুয়ে আছি। মুহূর্তের পর মুহূর্ত অতিবাহিত হয়ে যায়। গভীর ঘুম নেমে আসে চোখে, ও তবু আসে না। তারপর বাত কত হবে জানিনা ঝড়ের মতো ঘরে এসে ঢোকে সেলিনা। ওই রাতেও সেজেছে পরিপাটি করে। চোখে দিয়েছে সুর্মা, সুন্দর এলো খোঁপায় বেঁধেছে চুল, গলায় একটা সকচেন চিকচিক্ করছে ঘাড়ের কাছে, কপালে সবুজ টিপ দুই ভুর মাঝখানে। ধূসর রঙের শাড়ী পরেছে রাতের অন্ধকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। চোখে অদম্য কৌতূহলের দুষ্টুমি। অপূর্ব লাগছে ওকে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল বা খুব সুন্দর লাগছে তো তোমাকে, কিন্তু সে যে তার এক রাতে কি সুর বেঁধেছে কে জানে? তাই কিছুই না বলে বললাম তুমি? কেমন লাগছে বললে নাতো। আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল–
হারিয়ে যাওয়া মুখর রাতে
তোমায় আমি চেয়েছিলাম,
আসলে নাতো সেদিন প্রিয়া
তবু তোমায় পেয়েছিলাম,
ধূসর বাতের অন্ধকারে,
স্বপ্ন ভেলায় সওয়ার হয়ে
তোমায় যখন ছুঁয়েছিলাম,
আকাশ ভরা তারার রাতে,
হঠাৎ কখন মিলিয়ে গেলে
আবার যদি আসলে ফিরে
চোখের তারায় আগুন জ্বেলে,
কোন সে ফাগুন জ্বালাতে চাও?
একটু খানি তাকিয়ে দেখ,
তপ্ত হৃদয় মরুর রাতে
আঁচল হাওয়ার দুষ্টুমিতে
অভিমানের কি দাম পাও।
জড়তাহীন লাইনগুলো কেমন করে যে হৃদয় আবেগকে ঝরিয়ে দিতে পেরেছিল বুঝতে পারিনি, বুঝতে পারলাম ও যখন বলল
অভিমানের হৃদয় মাঝে
দেখতে তুমি পাও কি আমায়?
কেমন করে আসি আমি
সেতো তোমার জমার খাতায়
না মেলা এক অংক, তুমি
মেলাতে চাও বারংবার,
ভাবতে তুমি পেরেছে কি
এই এসেছি আবার যখন
হারানো মন খুঁজে পেতে
সুর বেধেছি এক তারাতে
চিনতে তুমি পারবে কিগো
সেই সুরেরই ঐক্যতান।
দুহাতে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললাম, না সেলিনা পারবো না, পারতে আমি চাইও না, কেন পারবো? কিসের জন্য পিরবো? যে সুরের ঐক্যতান নিয়ে আজ তুমি এসে দাঁড়িয়েছে আমার দুয়ারে, নিঃশব্দ রাতের ক্ষণিক উষ্ণতায় লুণ্ঠন করে তাকে খান খান করে দিতে চাই না। তারপর বললাম জানতে চাইছিলেনা, কেমন লাগছে আমাকে? বললে নাতো! আনত চোখ দুটি নামিয়ে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে। আবেগে থর থর করছে তার সমস্ত দেহ বরী। এত দুর্বলতো কোন দিন মনে হয়নি সেলিনাকে। মায়া হল, মনে হল যে সুরের ঐক্যতান নিয়ে ও এসে দাঁড়িয়েছে আমার দ্বারে, আমার গোপনতার অন্ধকারে তাকে একাকার করে দিই। কিন্তু পারলাম না, এবারও হেরে গেলাম ওর কাছে। ও বলল, আর এগিয়োনা প্রান্তিক ভাই, মধ্য রাতের এ স্মৃতি নিয়ে কেমন করে এগিয়ে দেবে তুমি কাল অদিকে। তার চেয়ে তুমি ফিরে এসো, আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো।
ও আমার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। বললাম সেলিনা। বল কাল তুমি যাবে আমার সাথে? কোথায়? অশ্রুকণাকে এগিয়ে দিতে তুমিও চল আমার সাথে। এতক্ষণ বুঝি এই কথাই ভাবছিলে? এটা আমার উত্তর নয়। ও বলল, আমাকে সঙ্গে নিলে সব ছন্দ হারিয়ে যাবে তোমার। কেন? আমিতো শান্ত সরোবর নই, আমি উত্তাল সমুদ্র, ঢেউয়ের তালে তালে তুমি যদি নিজেকে ভাসিয়ে রাখতে ব্যর্থ হও, সেতো আমারই ব্যর্থতা। তার চেয়ে তুমি একাই যাও। আমি চোখ তুলে তাকালাম ওর দিকে, ও বলল, তাছাড়া অদির তোমাকে একা পাওয়া ভীষণ প্রয়োজন। আমি মৃদু হেসে বললাম হয়তো প্রয়োজন তার থাকতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনে সঙ্গ দিতে গিয়ে যদি পথ হারিয়ে ফেলি? চোখে সেই অব্যর্থ দুষ্টুমি মাখা হাসি। ভয় নেই, আমার অশরীরী কায়া তোমায় পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে। তবু তুমি যাবে না? কেন পাগলামী করছ। এবার ঘুমাওতো বলে ও চলে গেল। কিন্তু কি যে দিয়ে গেল, কেমন করে মেলাই তার হিসাব?
