আমি তার আবেগকে বুঝতে পারছি। সংক্রামক রোগের মতো তা যে আমাকেও সংক্রামিত করে চলেছে, ওর দুটো হাত নিজের দুহাতের মধ্যে তুলে নিয়ে, দু হাতের করতলে আমার কম্পিত ওষ্টধর নামিয়ে এনে গভীর ভালবাসার চিহ্ন একে দিলাম।
বেরিয়ে যখন আসছি, ও এল পিছু পিছু বলল সেলিনা যদি যেতে চায়, ওকে কিন্তু নিয়ে এসো। আমি অবাক হয়ে বললাম সেলিনা কেন? ও মৃদু হেসে বলল এমুহূর্তে তোমাকে বড্ড দুর্বল লাগছে প্রান্তিক। একা পথ ভুল করতে পার। সেলিনা তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসবে। অভিমানে বললাম, আমায় তুমি ঠাট্টা করছ? অশ্রুকণা বলল, ছিঃ প্রান্তিক, ওকে না নিয়ে এলে যে সারা জীবন তোমাকে ভুলের খেসারত দিয়ে যেতে হবে। আমার মাথার দিব্যি ওকে তুমি জোর করেই নিয়ে এসো। তারপর বলল আমার লোভর মাত্রাতে জানি, ও যদি আসে, বেশ কয়েকটা দিনের জন্য আমি তোমাকে কাছে পাবো, একি আমার কম লোভ। আচ্ছা বলে আর ফিরে না তাকিয়ে বেরিয়ে এলাম।
অতরাতে ফেরার জন্য নীলাঞ্জনা পিসি বললেন, কেন যে এত রাত কর প্রান্তিক। তোমাকে আগেও বহু বার বলেছি, মিনতির ওখানে যেদিন যাবে, সেদিন রাত হলে একটা ফোন করে দেবে। আসতে হবে না। তোমার তো দেখছি আমাকে গুরুত্ব না দিলেও চলে। আমি এগিয়ে এসে পিসির মুখ চেপে ধরে বললাম, আর কখনো একথা বলবেনা। আমাকে কেন বোঝনা পিসি। তোমাকে বাদ দিলে কি আমার গুরুত্ব? পিসি তবু রেগে গিয়ে বললেন, অনেক গুলো ভালো ভালো বুলি শিখে নিয়েছে তাই দিয়ে চুম্বকের মতো টানো সকলকে। চারিদিকের যা অবস্থা, প্রতিদিন রাজনৈতিক খুন, ছিনতাই রাহাজানি খুন হয়েই চলেছে, ভয় হয় না? অথচ একটা সংবাদ দেওয়ারও প্রয়োজন বলে মনে করো না।
বুঝতে পারছি, যে কোন কারণে পিসি রেগে আছেন। সেলিনা এগিয়ে এসে বলল, কেন রাগ করছ মা। তোমার এখানে কি ভাবে সংবাদ দেবে। আমাদেরই বরং উচিৎ ছিল, মিনতি পিসির বাড়ী ফোন করে জানা প্রান্তিক ভাই কখন আসছে। তাইতো প্রান্তিক ভাই? পিসীর কথা যদিও বা সহ্য করা গেল, কিন্তু সেলিনার কথায় যেন সমস্ত শরীরে আগুনেব। ফোস্কা পড়ল। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে পিসিকে বললাম, উপায় ছিল না পিসি, হঠাৎ মিনতি সেন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আর কালই অশ্রুকণার নতুন জায়গায়। যোগদানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে করতে একটু রাতই হয়ে গেল। মিনতি সেন কিছুতেই ঘুম থেকে উঠছেন না আর তাকে না বলেও আসতে পারছি না। এই উভয় সংকটে পড়ে শেষ পর্যন্ত অবশ্য না বলেই এসেছি, তুমি চিন্তা করবে। পিসি বললেন তাহলে আমার কথা ভেবেছিলে, এটাই যথেষ্ট প্রান্তিক, তবুও তোমাকে আমার অনুরোধ, মিনতির ওখানে গেলে তোমার আসতে অসুবিধে হতে পারে, তাই একটু জানিয়ে দিয়ে থেকে যাবে। ভবিষ্যতে কোন দিন এতরাত করে বাড়ী ফিরবে না।
পিসি আর কোন কথা না বলে রান্না ঘরে চলে গেলেন। সেলিনা বলল চল প্রান্তিক ভাই খাবে। সকালে পিসি আগে খেয়ে বেরিয়ে যান, সেলিনা যেদিন বেরোয় আমার আগেই বেরিয়ে পড়ে, দুপুরের খাওয়া আমাকে একাই সারতে হয়, কিন্তু রাতে আমরা এক সঙ্গেই খাই। একটা পারিবারিক স্পর্শ লেগে থাকে তাতে।
খেতে খেতে সেলিনা জানতে চাইল, তা হলে তোমাদের ট্রেন কখন প্রান্তিক ভাই। আমি অবাক হয়ে বললাম আমাদের ট্রেন মানে? বাঃ অদিকে তুমি এগিয়ে দিতে যাবে না? না, এখনো সেই অভিমান? তারপর বলল দেখ প্রান্তিক ভাই এত অভিমান কিন্তু ভাল নয়। হঠাৎ বললাম, না আমি যাব না। সেলিনা হেসে ফেলল। পিসি বলল, তুই হাসলি যে, . বাঃ হাসব না। প্রান্তিক ভাইকে যেতেই হবে, ও ভালো করেই জানে ওর না গিয়ে কোন উপায় নেই, তবু বলছে যাব না। হাসব না। পিসি বললেন, তুই সব জেনে বসে আছিস। জানিই তো। প্রান্তিক ভাই যদি শেষ পর্যন্ত রাজী না হতেন, তাহলে কিছুতেই এত রাতে বাড়ী না ফিরে অনেক আগেই ফিরতেন। আমি অবাক হয়ে ভাবি এ মেয়ে কি সবজান্তা। কিন্তু ওর কোন কথার প্রতিবাদ করারও সাহস হল না আমার। নীলাঞ্জনা পিসি বললেন, ও না গেলে তো সেই মিনতিকেই যেতে হতো ও যদি যেতে রাজী হয়ে থাকে তাহলে তো বলব ও ঠিকই করেছে, বাবা-মাকে ছেড়ে ও এসেছে, এখন প্রান্তিক যদি সব ব্যাপারেই ওকে এড়িয়ে চলে তাহলে মেয়েটিই বা দাঁড়ায় কোথায় বল? আর ও যখন রাজী হয়েছে তখন উল্টো পাল্টা কথা বলে তুই আবার ওকে বাধা দিচ্ছিস কেন সেলিনা? যেন আকাশ থেকে পড়েছে, এই ভাবে সেলিনা বলল, আমি বাধা দিচ্ছি? আমি তো আরো প্রান্তিক ভাইকে যেতে বলছি। আমার কথার তুমি এই মানে বুঝলে। থাক আমাকে অত মানে শেখাস না। দেখতে পাচ্ছি, আজকাল প্রান্তিক যাইই করে তুই তার বাঁকা অর্থ করিস। অভিমানে উঠে পড়ে সেলিনা। বেশ আমি কোন কথাই বলব না। এখনতো দেখছি আমার কথারই তুমি বাঁকা অর্থ কর। তারপর এতদিন অদিব সঙ্গে যা ব্যবহার করেছে প্রান্তিক ভাই তুমিতো তার জন্য কিছুই বললে না, আর অশ্ৰুদি যেই মাত্র কান্নাকাটি করে কোন ভাবে প্রান্তিক ভাইকে রাজী করিয়েছে, সেই মাত্র প্রান্তিক ভাই ভাল হয়ে গেল। আর আমি হয়ে গেলাম খারাপ? ঠিক আছে, আমি আর কোন কথাই বলব না, আর থাকবও না তোমাদের কোন কথার মধ্যে।
আমি বললাম সেলিনা বোস, পিসিকে তুমি ভুল বুঝছ কেন? পিসিতে তোমাকে এমন কিছু বলেননি, ও আমার কথায় কোন গুরুত্ব না দিয়ে বলল তোমরা কথা বল, আমার খাওয়া হয়ে গেছে আমি চললাম। সত্যি সত্যি ও চলে গেল।
