কি যে মনে করে ও তাকিয়ে ছিল আমার দিকে, ভাষায় তা ব্যাখ্যা করা যাবে না। মনে হতে লাগলো অশ্রুকণা আমাকে এই চরম পরীক্ষায় ফেলে প্রমাণ করতে চায়, তাকে হারানোর সাধ্য কারো নেই। আমি বললাম, জীবনের স্মৃতি কি মুছে দেওয়া এত সহজ? কি করে ভুলে যাব, প্রথম যে দিন গঙ্গার ঘাটে বিশাল বট গাছের নীচে আমার জন্য বয়ে আনা টিফিন তুমি ফেলে দিয়েছিলে গঙ্গায়। আমার জীবনে রেহানা সেদিন তেমন করে আসেনি। ভুলতে পারব কি ব্যাণ্ডেলে যাবে বলে বাড়ী থেকে বেরিয়েও আমাকে কিছু না বলে তোমার বাড়ীতে ফিরে যাওয়া। কেমন করে ভুলবো রেহানার জন্য নিজে সরে দাঁড়ানো, যে চরম অভিমানে তুমি আমাকে পেতে চেয়েছে, তার কোন মৰ্যাদাই দিতে পারলাম না একথা ভুলবো কি করে? কি করে ভুলবো, আমাকে সকলের থেকে উঁচুতে জায়গা দিতে গিয়ে চিরদিনের জন্য তোমার বাবা-মাকে ছেড়ে আসা। পিরবো কি ভুলে যেতে আমাকে না জানিয়ে তুমি যেতে পারোনা এই তীব্র অভিমানকে। যে জোর সেলিনার আছে বলে তুমি বলছ, সেই জোর তোমার থাকবে না? ম্লান হাসল অশ্রুকণা, যে হাসিতে দুঃখ আনন্দ ব্যথা বেদনা সব কিছু একাকার হয়ে যেন চরম প্রশান্তি নেমে এল। বলল, আমার জোর নেই কে বলেছে? জোরের কথা যদি বল, একদিন নিজেই জানতে পারবে আমার থেকে কারো বেশী জোর নেই, না রেহানারও নেই। যত ভালবাসাই তোমার পরে তার থাকনা কেন, একদিন তোমার মনে হবে জীবনের আনন্দ যজ্ঞে সে তোমাকে ঠকিয়েছে।
আমি প্রতিবাদ করে বললাম, কণা এ তুমি কি বলছ? ও কোন প্রতিবাদ না করে বলল, আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা করো না। আমি ওই ভাবে বলিনি। তোমার জীবনে রেহানার অভাব আমি বুঝি। কিন্তু এও বুঝি সে তোমাকে পূর্ণতা দেয়নি, দিয়েছে চরম শূন্যতা আর হাহাকার। হয়তো রেহানা এমন এক জীবন বেছে নিয়েছে, যত মহানই সে জীবন হোক, সে জীবন তোমার জন্য নয় প্রান্তিক। যদি তার সন্ধান পাও কোন দিন সে মহাজীবনের করুণা তোমার ওপর বর্ষিত হতে পারে, কিন্তু তোমার সুখ দুঃখের সাথী হয়ে তোমার আপন ঘরে সে আর ফিরে আসবে না কোন দিন। তুমিও পারবে না নিজেকে তার সামিল করতে, যদি পার, তাহলে মনে করব, আমার ভালবাসা মিথ্যাই শুধু নয়, জীবন সম্পর্কে আমার গোটা ধারণাটাই ভুল।
হয়তো অশ্রুকণা যা বলেছে সে তার বিশ্বাসের কথা। হয়তো রেহানা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন মনগড়া। কি করে ভুলে যাবো রেহানার ভালবাসা, তার সেই কথা, প্রান্তিক আমিতো তোমারই। আমি যখন বলেছিলাম, কিন্তু কেউ যদি তোমাকে ছিনিয়ে নেয় আমার কাছ থেকে? বলেছিল রেহানার দেহটাইতো সব নয়, তার মন? সে তো তোমারই প্রান্তিক। আমি জানি, কেউ আমাকে তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। আর সেটা ভালো করে জান বলেই এই অকারণ ভয় দেখাচ্ছো আমাকে। সেই রেহানা, আমাকে ছেড়ে অন্য জীবন বেছে নেবে? না অশ্রুকণার একথা মেনে নিতে মন সায় দিচ্ছেনা। ও বলল, কিছু ভাবছো? বললাম, না, শুধু মনে হচ্ছে কি বিচিত্র এই জীবন। সম্রাট সেকেন্দার শার সেই অমর উক্তি কি বিচিত্র এই ভারতভূমি। ও সেদিকে না গিয়ে বলল, তোমাকে কি আমি আঘাত করেছি? আবেগ রুদ্ধ কণ্ঠে বললাম, ভালবাসা যেখানে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আঘাত সেখানে বাজে না। পূর্ণ ঘটে কি শব্দ হয়? তারপর এক সময় বললাম, রাত হয়েছে আমাকে যেতে হবে। জানতে চাইলাম মা কি উঠেছেন? তুমি বোস, আমি দেখছি।
কখন যেন ঘুমিয়ে গেছেন মিনতি সেন। আমি চলে যাব জেনেও ডাকতে মায়া হল ওর। এতক্ষণ শুধু গল্পই করেছে অশ্রুকণা। একবারও জিজ্ঞাসা করেনি, আমি কখন খেয়েছি। এখান থেকে বাড়ী ফিরতে তো অনেক রাত হবে, এতক্ষণ না খেয়ে থাকবে? এক অব্যক্ত ব্যথায় ভিতরটা ডুকরে কেঁদে ওঠে, অশ্রুকণার। ফিরে এসে বলল, পিসি ঘুমাচ্ছেন, আজকের রাতটা তুমি থাকতে পার না।
বললাম ভীষণ লোভ হচ্ছে, আজকের রাতটা তোমার কাছে থাকতে। তারপর ওর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, আমার এই ক্ষণিকের দুর্বলতাটুকু ক্ষমা করতে পারবে তো। ও বুঝি ভিতরে ভিতরে এতক্ষণ কাঁদছিল এবার টপটপ করে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। আমি বললাম ছি কশা! তোমার চোখে জল? আমি মুছে দিতে চাইলে ও বাধা দিয়ে বলল, সামান্য অবাধ্য জলকেও তুমি সহ্য করতে পারছে না। থানা ওটা আপনা আপনি শুকিয়ে যাবে। আমি বললাম তাই থাক। হয়তো তোমার চোখের জল এক সময় শুকিয়ে যাবে, কিন্তু আমার কাছে এ মুহূর্তটুকু যে অমরত্ব পেল তার মূল্যতে কম নয়। মাকে বলল আমি আসছি।
উঠে যখন পড়ছি, ও বলল, ভীষণ লোভটাকে কি অবলীলায় তুমি দমন করতে পারলে, কিন্তু সারারাত আমার কাটবে কি করে সে কথাতো বলে গেলে না? আমি বললাম, শ্রীরাধিকার সেই অভিশাপ তোমার মনে আছে? তাকিয়ে আছে দেখে বললাম আমার পরান যেমতি করিছে তেমতি হউক সে। প্রচণ্ড আঘাতে যেন বুক ভেঙে যাচ্ছে অশ্রুকশার, উঃ বলে চিৎকার করে উঠে অশ্রুকশা। বলল কি নিষ্ঠুর তুমি। আমি বললাম তোমার থেকেও।
মন, না চাইলেও যেতে হবে আমাকে। অশ্রুকণাও জানে ছেড়ে দিতে ইচ্ছে না করলেও ছেড়ে তাকে দিতেই হবে। কত ব্যর্থ প্রেমের ইতিহাস, এই ভাবে পৃথিবীর ইতিহাসে অলিখিত হয়ে বেঁচে আছে কে তার হিসাব রাখে? ভেজানো দরজা খুলে পা রাখলাম বাইরে। ও আবার পিছু ডেকে বলল, প্রান্তিক, শুধু এই একটা রাতের জন্য আমার স্বপ্ন কল্পনাকে তুমি বাস্তবায়িত করতে পার না? আমি ছল ছল চোখে তাকালাম ওর দিকে। বলল, কি যে হচ্ছে আমার বুকের মধ্যে দেখবে একবার? আচমকা তুলে নিল আমার হাত। আমি থর থর করে কেপে উঠলাম। ও আমার হাতটা তার নিজের বুকে রাখতে গিয়েও ছেড়ে দিয়ে বলল, তুমি চলে যাও প্রান্তিক তুমি চলে যাও এরপর হয়তো আমি তোমার কাছে ভীষণ ছোট হয়ে যাব।
