ও চলে গেল। এ আমার কি হল। সমস্ত পৃথিবীটা কেন আমার চোখের সামনে ঘুরছে। আমি যে কথা দিলাম পারবো কি মৰ্য্যাদা রাখতে? অশ্রুকণা যে বিশ্বাস রাখতে চাইছে পারব কি আমি হৃদয় দিয়ে তা উপলদ্ধি করতে।
আমার এই কলকাতা জীবনে প্রথম যে মেয়েটি এসেছিল তার ভালবাসার ডালি নিয়ে সেতো এই অশ্রুকণা। কিন্তু তবুতো একে আমি উজাড় কবে নিজেকে দিতে পারলাম না, সেকি আমার দোষ না অতি সাধাবণ হয়ে অতবড় উঁচুতে হাত বাড়ানো ঠিক হবে না ভেবে নিজেকে দূরে সরিয়ে এনেছি, জানিনা। এল রেহানা। তার ফুলের মত কোমল সৌন্দর্য নিয়ে ধীরে ধীরে ও আমাকে তার দিকে টেনে নিল। সর্বস্ব উজাড় করে তাকে দিলাম আমার সবটুকু, তবু কেন বুকে ব্যথা বাজে। অশ্রুকণা তার অভিমান দিয়ে আমাকে জয় করতে চেয়েছিল, মনে হয় তার মানে বুঝতে পারিনি। আজো কি পেরেছি?
কফি নিয়ে এল অশ্রুকণা, বললাম মা কোথায়? শুয়ে আছেন। শুয়ে আছেন? মানে শরীর খারাপ? শরীর হয়তো তত খারাপ নয়, তবে মনে খুব আঘাত লেগেছে। তুমি কফিটা খেয়ে একবার যাও তার কাছে। আমি বলে এসেছি প্রান্তিক কফি খেয়ে আসছে আপনার কাছে।
আমি বললাম, কণা, একটা কথা বলব? বল ও তার ভেজা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো আমার দিকে। আমি আস্তে আস্তে বলতে থাকি, আমি যে সত্যিই তোমাকে ধীরে ধীরে ভালবাসতে চেয়েছিলাম, যদি একথা বলি তুমি কি অবিশ্বাস করবে। কেন এমন ভাবছ যে আমি তোমাকে অবিশ্বাস করব। তাহলে শোন, যেদিন তুমি সত্যি সত্যি বাবা-মাকে ছেড়ে চলে এলে সেদিন থেকে মনে হয়েছে আমি সত্যি তোমাকে ভালবাসি। কিন্তু আমার পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছে একদিকে রেহানা, আর একদিকে সেলিনা। রেহানাকে বুঝতে পারি, কিন্তু বুঝতে পারিনা সেলিনাকে। আরো ভয় হয় ওর সহজ সাবলীল স্পষ্টতাকে। আজ আমি চাইলেও বোধ হয় আমার মুক্তির পথ নেই। নিজের দেওয়া গন্ডীতে নিজেই বাধা পড়ে গেছি কখন যেন। যতই তোমাকে অস্বীকার করতে চেয়েছি, যতই তোমাকে এড়িয়ে চলবার চেষ্টা করেছি, তোমার তীব্র অভিমান, ততই তোমাকে আমার আরো কাছে নিয়ে এসেছে। এখন মনে হয়, তোমাকে ছাড়া বুঝি আমি চলতে পারব না, আর এই দুর্বলতা মনের মধ্যে যতই অনুভব করেছি ততই না জেনে তোমাকে আরো বেশি আঘাত দিয়ে ফেলছি। এবার বল আমি কি করব।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অশ্রুকণা বলল, তোমাকে আমি বুঝি প্রান্তিক, তোমার দুঃখ কষ্ট ব্যথা বেদনা সব কিছু একাকার হয়ে আমাকে গ্রাস করে। আমি বললাম, তুমি বোঝ আমার কষ্ট? তোমার কি মনে হয়, বুঝি না? জানিনা কণা, শুধু মনে হয় আজ যে গোলক ধাঁধায় আমি পথ হারাতে বসেছি, সেখান থেকে তুমিই একমাত্র আমাকে বাঁচাতে পার। কি ভাবে? তাতো জানিনা কশা, এ শুধু আমার বিশ্বাস, যে মেয়ের আমাকে না জানিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই, কেবল মাত্র তার কাছেই আমার মুক্তির মন্ত্র।
১৩. কফিটা শেষ হয়
কফিটা শেষ হয় এক সময়। আমার স্বীকারোক্তি কে এড়িয়ে গিয়ে অশ্রুকণা বলে, সেলিনা কে তুমি ভালবাস না? উত্তরে বলি সত্যি কথা কি জান কণা, সেলিনা আমার জীবনে যেমন এক ঝলক মুক্ত হাওয়া, তেমনি কেবলমাত্র সেই আমার জীবনে নিয়ে আসতে পারে প্রচণ্ড ঝড়, যাতে শিকড় সুদ্ধ উপড়ে যেতে পারে আমার, কেন তোমার এরকম মনে হয়। তাতো বলতে পারবো না। শুধু অনুভবে বুঝতে পারি ছায়ার মত তার উপস্থিতি। তাই কখনো কখনো এত দুর্বল হয়ে যাই যে আমার নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়।
ও আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে প্রান্তিক, অপরাধ তুমি করতে পার না। শুনেছি তপতীদি তোমাকে একদিন ভীষণ ভালবাসতো। রেহানার কথা থাক, হয়তো তার স্তরে নিজেদেব পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু সেলিনা, সে যে তোমাকে কি পরিমান ভালবাসে তার কল্পনাও তুমি করতে পাববে না। আমাদের বাধন কাটাতে পারলেও তার বাধন তুমি কোনদিন কাটাতে পারবে না। সে হয় তো কোন দিন তোমাকে ভালবাসার কথা বলেনি, হয়তো বলবেও না, কিন্তু অন্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিক্তিতে ওজন করে নিয়েছে তার ভালবাসার ভার কতো। আজ তোমাকে বলতে কোন দ্বিধা বা লজ্জা নেই, ও আমাদের সকলের ছোট অথচ সবাই আমরা হেরে গেছি ওর কাছে। তোমাকে আমার অনুরোধ, যদি এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে ভালবেসে থাক তাহলে সেই ভালবাসার অধিকারে দাবী করছি, যদি সত্যিই রেহানা ছাড়া তোমার জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে, সেলিনাকে গ্রহণ করো, তোমার তপ্তমক হৃদয় একমাত্র ওইভরে দিতে পারে মরুদ্যানে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কশা আজ তোমাকে বলতেই হবে, জীবনে যদি এমন কিছু ঘটে পারবে মেনে নিতে? অশ্রুকণা বলল, আমি রেহানার মতো বড় নই, তাই তোমার মঙ্গল কামনায় সে যেমন হারিয়ে যেতে পারে, আমি তা পারি না। আমি একেবারে সাধারণ মেয়ের মতন একান্ত করে পেতে চাই আমার ইপ্সিতকে। তোমার কথার প্রতিধ্বনি করে বলা যেতে পারে ভাগ আমি চাই না। আমি মরে যাব, সেও ভালো তবু মেনে নিতে পারবো না আর কারো দাবীর অধিকার। তাই অভিমান বা রাগ আমার যাই থাকুক, সে শুধু আমারই থাকুক। আর সেজন্যই কষ্ট হলেও একদিন যেমন রেহানার কাছে হেরে গিয়েও জয়ী হতে চেয়েছিলাম, আজো তেমনি সেলিনার হাতে তোমাকে তুলে দিয়েও জয়ী হতে চাই। অশ্রুকণার আভিজাত্য ব্যর্থতার মধ্যে খুঁজে পাক তার চরম সার্থকতা। শরবে না মন থেকে, তোমার কণার প্রেমিকা সত্তা মুছে দিয়ে শুধু তোমার বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে।
