জীবনে বুঝি ভুল বোঝাবুঝির কোন শেষ নেই। তা না হলে সেলিনা অমন করে বলবে কেন, প্রত্যেককে অপমান করতে করতে প্রান্তিক ভাই এটা তোমার একটা নেশা হয়ে গেছে। বলিহারি এদের অপমান বোধ। সেদিন ছিল সেলিনার জন্মদিন, কাউকে বলা হয়েগুলার এর হয় নি, মিনতি সেনের দেওয়া শাড়ী ও গয়না পরে ও যখন স্নান করে ভোরে আমাকে প্রণাম করতে এল, সত্যি ওকে অপূর্ব লাগছিল। বলেছিলাম, সেলিনা, তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে আমার অন্তরের ভালবাসা, তোমার জন্মদিনের সৌন্দর্যে পাক তার পূর্ণতা। কেউ ছিল না ঘরে। সম্ভবত: লজ্জায় পালিয়ে গিয়েছিল ও।
নীলাঞ্জনা পিসি মেয়ের জন্মদিনের মিষ্টি নিজে নিয়ে এসে আমাকে দিলে বলেছিলাম আজতো পিসি তোমার জন্মদিন নয়, যার জন্মদিন মিষ্টিটাতো তার হাত দিয়েই আসা উচিত ছিল। আর আমার এই সাধারণ কথার এই উত্তর হয়।
আঘাত সাধারণত আমি পাইনা। কিন্তু ইদানীং যে ভাবে আমাকে লক্ষ করে চারপাশ থেকে বজ্রের ন্যায় অভিযোগের তীর ছুটে আসছে, বুঝতে পারছি তার থেকে বাঁচতে হলে আমাকে পালাতে হবে একদিন। কিন্তু পালাব কোথায়?
যে সেলিনা সকালে করল অপমান, সেই এল গভীর রাতে একা ক্ষমা চাইতে! আমি অবাক হয়ে বললাম, তোমাদের বোঝা সত্যি দুঃসাধ্য সেলিনা।
মাত্র কদিন আগে, মেদিনীপুরের এক আধা মফসল শহরে স্কুলের চাকরি নিয়ে চলে গেছে অশ্রুকণা। মিনতি সেন বার বার অনুরোধ করেছিলেন, মেয়েটিকে এগিয়ে দিয়ে আসার। কোনদিন মিনতি সেনের অবাধ্য হইনি, সেদিন কিন্তু হয়েছিলাম। বলেছিলাম মা, কি ভাব তোমরা আমাকে বলত। আমি কি রোবট? আমার কি রক্তমাংস নেই, অনুভুতি নেই? না আমি তা পারবো না। কিছুতেই পারবো না। মিনতি সেন চুপ করে থেকে বললেন, ঠিক আছে তোর যেতে হবে না। আমিই যাব, আর কোন দিনই ফিরে আসব না। ওর কাছেই থাকব। যদি কোনদিন আমার কথা মনে পড়ে গিয়ে নিয়ে আসিস। নিজের মান-অপমান, রাগ-অনুভূতি, কামনা-বাসনা কত কথাইতো বললি? ওগুলো কি আমার নেই? আমার কোন স্বপ্ন থাকতে নেই? কেন একটা মেয়েকে তুই স্বপ্ন দেখালি? বুঝলি যদি অসম্ভব, তবে এড়িয়ে না গিয়ে আবো ভালবেসে ভুলটা ভেঙে দিলি না কেন? অশ্রুকণা বলল, পিসি, এ আপনি কি সব বলছেন। আমি নিজেই যেতে পারবে। আপনাকে যেতে হবে না পিসি। মিনতি সেন বললেন হ্যাঁ একাইতে যাবি? তা না হলে আর আমাকে অপমান করা সম্পূর্ণ হবে কেন? মিনতি সেন উঠে চলে গেলেন। আমিও উঠতে যাব, অশ্রুকণা বলল, একটু দাঁড়াও প্রান্তিক। বল। তোমার কি আমার সঙ্গে যাওয়া সত্যিই অসম্ভব। করুণ ভাবে তাকালো ও আমার দিকে। আমি বললাম, আমাকে একটু ভাবতে দাও কশা। ভাবতে তোমাকে হবে ঠিকই কিন্তু তোমার ভাবনার থেকেও যা আমাকে ব্যথা দিচ্ছে তা হচ্ছে আমার প্রতি তোমার অবিশ্বাস। তারপর একটু থেমে বলল, সত্যি কি আমাকে একদমই বিশ্বাস করা যায় না?
আমি যে কি বলব বুঝতে পারছি না, বললাম, আমি কি কখনো বলেছি তোমাকে আমি অবিশ্বাস করি। না মুখে বলনি ঠিকই, কিন্তু তোমার প্রতিটি আচরণ আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা তোমার ভুল! তাহলে সত্যটা কি? তোমাকে জানতে হবে? যদি না বলতে চাও, আমার হয়তো এমন কোন জোর নেই, যাতে তোমাকে আমি বাধ্য করতে পারি। আসলে কশা, নিজের প্রতি বিশ্বাস আমি ক্রমান্বয়ে হারিয়ে ফেলছি। এটা তোমার অজুহাত। না অজুহাত নয়, তুমি কেন বুঝতে চাইছো না, আমিও মানুষ, আমিতো দোষ ক্রটির উর্দ্ধে নই। এই জন্য তোমার ভয়? আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি প্রান্তিক, এরকম কোন অবস্থার সৃষ্টি হবে না। বরং এই অজুহাতে যদি তুমি আমাকে এড়িয়ে যাও, আমার অপমান কি পরিমান হতে পারে, তা কি বুঝতে পারছ? আমি বললাম তোমার কথাইতো সব নয়, আমার ভিতবেব দুর্বলতাগুলোকে আমি বন্ধ করব কি করে? অশ্রুকণা বলল, তুমিতো এত দূর্বল ও প্রান্তিক। তুমি নিজেকে যত দূর্বলই মনে করোনা কেন তোমার সৌজন্য বোধ তোমার সীমাবদ্ধতা এতদিন তোমাকে যেমন রক্ষা করে এসেছে আজও তেমনি ভাবে করবে। বললাম জানিনা, কিন্তু কণা, কোন এক অসতর্ক মুহূর্তে তোমাদের পরিচিত প্রান্তিকের যে মৃত্যু হয়ে গেছে সেকি তুমি জান? পবম দুঃখে কেঁপে উঠে বলল, প্রান্তিক। আমি ওকে বললাম, ভয় পেলে কেন কণা? আমিতো দেবতা নই, হতেও চাইনি কোন দিন। দোষেগুণে মানুষ। হয়তো তুমি আমার উপর অনেক ভুল ধারণা করেছে, আমাকে না বুঝতে পেরে রাগও করেছে, অভিমানে দূরে সরে যেতে চেয়েছে। অথচ আমাকে বোঝার কোন চেষ্টাই করলে না কোনদিন।
অশ্রুকণা বলল, তোমাকে এ ভাবে ভাবিনি কখনন, আজো ভাবিনা, যা তুমি বলছ, ওই দুর্বলতা সবারই আছে আর আছে বলেই আমরা কেউ দেবতা নই। দুর্বলতা কি আমার ভিতরে নেই প্রান্তিক? তুমি জান না? কি তীব্র ভাবে তোমাকে আমি চেয়েছি? চেয়েছি আমার সমস্ত অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার করে। তবু কি পেরেছি তোমাকে আচ্ছন্ন করতে? আমি জানিনা, তোমাকে নিজের কথা আর কোন দিন বলতে পারবো কি না। তবু একটা অনুবোধ, বল আমাকে ফিরাবে না।
আবেগে ওর গলা যেন কেঁপে ওঠে। বললাম, বল। আগে কথা দাও তুমি আমায় ফেরাবে না। দিলাম। তা হলে চল আমাকে এগিয়ে দিয়ে আসবে। জীবনের অনেক কথা যা অনেক বার তোমাকে বলতে চেয়েছি, একটু খানি সময় দিতে পারবে না কণা। ও কি প্রান্তিক, তুমি এমন থর থর করে কাঁপছ কেন? ও এগিয়ে এসে আমাকে ধরল তারপর বলল, খুবই কি আঘাত দিয়েছি? আমি বললাম, না, আঘাত আজকাল আর পাইনা। আমারও অনেক কথা বলার আছে তোমাকে। ও বলল, চা খাবে? বললাম, না থাক। কখন তোমার ট্রেন? কাল সকাল ৮ টায়। ঠিক আছে আমি যানো। আসি তা হলে। আমি চলে আসতে চাইলে ও বলল, একটু শুয়ে থাক প্রান্তিক। তোমার শরীরটা সত্যি ভাল নেই। উঠোনা কিন্তু আমি আসছি।
