আমি অশ্রুকণার নাম ও ঠিকানা দিতেই উনি চমকে উঠে বললেন, অশ্রুকণা। আমি বললাম, হ্যাঁ। আপনি ঠিকই ধরেছেন। যে মেয়েটিকে আপনারা সজল বাবুর জন্য দেখতে গিয়েছিলেন।
কি যেন ভাবলেন প্রতীমবাবু। তারপর বললেন, কিন্তু ওখানে কি ওর ভালো লাগবে? বললাম ভালো না লাগার দায়িত্ব আমি নিলাম। কিন্তু বাকী দায়িত্বতো আপনাকে নিতে হবে। উনি বললেন তা না হয় নিলাম, কিন্তু আমি একটা জিনিষ কিছুতেই বুঝতে পারছি না। আমি সোজাসুজি বললাম, আসলে ও বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে ওদের সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে মায়ের কাছে এসেছে। মা প্রথমে ওকে হঠাৎ খেয়াল এরকম একটা কিছু ভেবে খুব একটা গুরুত্ব দেননি, এবং এই অবহেলার জন্য, আমার মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ী থেকে চলেও যায়। যদিও তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে, কিন্তু কথা দিতে হয়েছে তার জন্য মা চেষ্টা করবেন।
প্রতীমবাবু বললেন, আমার কাছে যে এসেছে সে তোমার নিজের ইচ্ছেয়। হ্যাঁ আমার নিজের ইচ্ছেয়, তবে মায়ের যে এ ব্যাপারে কোন ছুতমার্গ নেই তা আপনাকে হলফ করে বলতে পারি। উনি আর কথা বাড়ালেন না। বললেন, ওদের দরখাস্ত আমাদের অফিসে পৌঁছাবার শেষ তারিখ আজ। আজ হয়তো পারবে না কিন্তু কাল দশটার আগে তুমি নিজে এসে আবেদন পত্রটা আমার হাতে জমা দিয়ে যেও। আরেকটা কথা, আগামী বুধবার আমরা ইন্টারভিউ নেবো। যদি মনোনীত হয়, তবে তার এক সপ্তাহের মধ্যে কাজে যোগদান করতে হবে, পারবে তো? আমি বললাম নিশ্চয়ই পারবে।
হাতে সময় নেই। বিকেলেই মিনতি সেনের ওখানে এলাম। উনি বাড়ী নেই। জবার মা দরজা খুলে দিলেন। বললাম মা, নেই? না উনিতো ফেরেন নি। তাহলে? দিদিমনি আছেন। আপনি আসুন।
উপরে গিয়ে দেখি অনুতপা আর অশ্রুকণা কথা বলছে। বহুদিন পরে ওর সঙ্গে দেখা। ও বলল, আজকাল দেখছি চিনতে পার না। না চিনতে চাও না। যা তোমার ভাল মনে হয়। তা কেমন আছো? ভাল। তুমি এখন বাড়ী থেকে? না ঠিক বাড়ী থেকে নয়, আবার বাড়ী থেকেও বলতে পার। বড় হেঁয়ালি কথাবার্তা। আগেতো এভাবে কথা বলতে। আগে কি তুমি বলতে এ ভাবে কথা। বললাম আমি? অশ্রুকণা বাধা দিয়ে বলল, তুমি কি ঝগড়া করবে নাকি, সোজা উত্তর দিতে পারনা। কোথা থেকে আসছ?
আমি বললাম, থাক ওসব কথা। তোমরা কথা বল, আমি বরং জবার মাকে বলি, যদি চা বা কফি খাওয়াতে পারে। অশ্রুকণা বলল, তুমি বোস আমি নিয়ে আসছি। অনুতপা বলল আমি উঠিরে অশ্রু। আমি অনুতপাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, অনুতপা, শুধু অকণা তোমার বন্ধু নয়, আমিও তোমার বন্ধু। তুমি মান সে কথা? না মানার কিছু হয়েছে কি? হয়নি বলতে চাও? অশ্রুকশা কথার মাঝে বাধা দিয়ে বলে, চলে যাসনে কিন্তু, আমি কফি নিয়ে আসছি। ও চলে গেলে অনুতপা বলে চলে, এ বাড়ী থেকে আমাদের বাড়ীতে বেশী দুরে নয়, বরং এবাড়ী আসতে গেলে আমাদের বাড়ীর পাশ দিয়েই আসতে হয়, কিন্তু গেছো একদিনও? অথচ বন্ধুত্বের বড়াই করছ? না হয় অশ্রু, রেহানারা তোমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। আমাকে না হয় ভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু হিসাবে ক্ষমা ঘেন্না করতে। বলে হেসে উঠলো। হেসে ৩ঠলেও ওর অভিযোগকে অস্বীকার করতে পারি না, তা যেন হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। বললাম, সত্যি ভুল হয়ে গেছে অনুতপা। আমি প্রমিজ করছি এ ভুল আর হবে না। অনুতপা বলল, আমিও প্রমিজ কবছি আরেকদিন এসে চা খাব, আজ সত্যিই আমার কাজ আছে। অশ্রুকে বলে দিও। তুমি বলে যাওনা। ও আমার চোখে চোখ রেখে বলল, ঠিক আছে তোমাকে বলতে হবে না।
অশ্রু কফি নিয়ে এসে দেখে অনুতপা নেই। বলল, ও চলে গেলো? আমাকে একবার বলে গেলো না? ওতো বলল তোমাকে যাওয়ার সময় বলে যাচ্ছে, বললাম আমি। কিছুটা বিরক্তি সহকারে অশ্রুকণা অস্পষ্ট উচ্চারণে বলল, এখন এই অতিরিক্ত এক কাপ কফি কে খাবে? আমি বললাম এর জন্য বিরক্তির কি আছে কণা। হয় এসো আমরা ভাগ করে খাই, না হয় ফেলে দাও। ফেলে দেবো? তাছাড়া আর কি করবে? ভাগ যদি করতে না চাও ফেলে দিতেই হবে। ফেলে দেওয়ার অভ্যেস যে তোমার আছে সে আমি জানি। আমিও জানি ভাগ তুমি করতে পারবে না।
এই শেষের কথাটা বোধ হয় অফিস থেকে ফিরে মিনতি সেনের কানে যায়। বলে কি ভাগ করবি, আর কিইবা ফেলে দিবি। বরং আমাকে দে, তোদের ভাগও করতে হবে না, ফেলতেও হবে না। অশ্রুকণা যেন আমার সঙ্গে একা কাটাবার দ্বিধা থেকে মুক্তি পেল।
কফি খেতে খেতে মিনতি সেনকে বললাম, তোমার মেয়েকে বল, এই ফর্মটা যেন এখনি ফিলাপ করে আমাকে দিয়ে দেয়। ফর্ম জমা দেওয়ার শুধু নয় ওখানে পৌঁছাবার শেষ তারিখ আজ। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে কাল দশটার আগে ওটা ওদের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। মিনতি সেন উত্মা প্রকাশ করে বললেন, তা একথা ওকে বলতে পারলি না। কাকে বলব, ও আমার সঙ্গে কথাই বলতে চাইছেনা। তারপর না জানি কি কথা শুনতে হবে।
এত বড় অভিযোগেরও কোন উত্তর দিল না অশ্রুকণা। মিনতি সেনের কাছ থেকে ফর্মটা নিয়ে যেখানে যেখানে আবেদনকারীর স্বাক্ষরের দরকার, সেখানে সেখানে স্বাক্ষর করে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, পিসি আপনার ছেলেকে বলবেন বাকিটা পূরণ করে নিতে। বলেই ও উঠে চলে গেল। মিনতি সেন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, শুধু আমাকে বললেন তোঁদের এই ভুল বোঝাবুঝি মিটবে কবে প্রান্তিক!
