আমার আর কি বলার থাকতে পারে। চুপ করে আছি। মনে গভীর বিশ্বাস, একবার যখন ওকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছি, তখন মিনতি সেনের কাছ থেকে ছাড়া ও আর পাবে না। তপতীর কথার উত্তরে সেলিনা বলল, প্রান্তিক ভাই অদির সঙ্গে যা ব্যবহার করেছে তাতে তো অভিমান হতেই পারে, আমার সঙ্গে প্রান্তিক ভাই ওরকম ব্যবহার করলে আমি শুধু অভিমানে ঘর ছাড়তাম না, প্রান্তিক ভাইকেও রাস্তায় নামিয়ে ছাড়তাম।
তার রাগের আঁচ পেয়ে আমি শুধু শব্দহীন হাসলাম। তপতী বলল তা তুমি পার সেলিনা, তোমার যে পরিচয় আমি পেয়েছি তাতে তোমার পক্ষে সবই সম্ভব। সেলিনা বলল, এটা সম্ভব অসম্ভবের কথা নয় তপতীদি। এটা অধিকারের কথা। আমাকে প্রান্তিক ভাইয়ের ভাল না লাগতে পারে, তাই বলে আমাকে অপমান করার অধিকার তার নেই। তবে প্রান্তিক ভাই বলতে পারে উনি যা করেছেন, তাতে অপমানের কিছু নেই, কিন্তু মান অপমানের সংজ্ঞাতো সবার কাছে সমান নয়। কেউ মেনে নিতে পারে, কেউ পারে না। অশ্ৰুদি পারেনি, তার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না। আমিও পারতাম না, তাই বলে, আমি নিজে রাস্তায় না নেমে প্রান্তিক ভাইকে রাস্তায় নামিয়ে ছাড়তাম।
অত্যন্ত কঠিন প্রতিবাদ। সেলিনার জেদি মনোভাবের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, কিন্তু এখন ও যা বলল, এর দ্বারা ও কি বলতে চাইছে বুঝতে পারলাম না। নীলাঞ্জনাও সম্ভবত বুঝতে পারেননি। তপতী শুধু ওকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, কেন মিথ্যে ভয় পাচ্ছ সেলিনা, তুমি তপতী বা অশ্রু নও, প্রান্তিকের সাধ্য কি তোমাকে অপমান করার। তারপর নীলাঞ্জনাকে বলল, পিসি সকাল থেকে তো কিছুই খাওনি এবার চল যা হোক কিছু খাবে। রান্না করেছে? হ্যাঁ সেলিনা করেছে।
অশ্রুকণা রাজী হয়েছে মিনতি সেনের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার, তবে মিনতি সেনকেও রাজী হতে হয়েছে খুব তাড়াতাড়ি অশ্রুর যে কোন একটা ব্যবস্থা উনি করবেন। যাওয়ার সময় মিনতি সেন বললেন, প্রান্তিক আগামী রবিবার একবার আসিস তো। আচ্ছা। আর শোন, তার আগে শুক্রবার একবার ওখানে যাবি। সবকিছু ভালো করে জেনে আসবি। আমি বললাম আচ্ছা। মিনতি সেন অকশাকে নিয়ে চলে গেলেন।
তপতী বলল, আমাকেও যে যেতে হবে প্রান্তিক। নীলাঞ্জনা বললেন, কতদিন পরে তোর সঙ্গে দেখা, আজ থেকে যা না। তপতী আমার দিকে তাকালো। আমি বললাম, না পিসি, ওরতো রাতে ডিউটি আছে। তপতী বলল, আরেকদিন আসব পিসি। আমিতো দেখে গেলাম, বরং তোমরা সবাই একদিন এস না, আমার কোয়ার্টারে। ওখানে আর কে কে থাকে জিজ্ঞাসা করলেন পিসি। তপতী বলল, আমি একাই থাকি। একার পক্ষে কোয়ার্টার যথেষ্ট বড়। বল কবে যাবে? সেলিনা বলল, তপতীদি তুমিতো কোয়ার্টার আজকে পাওনি বেশ কিছুদিন আগেই পেয়েছে। আমাদের চেনোনা তাতো নয়, তবুতো তোমার গৃহপ্রবেশে বলনি,
আজকে হঠাৎ লজ্জায় বলছ নাতো।
সেলিনা চিরদিনই এই রকম যা বলে সোজাসুজি বলে। তপতী বলল, না ভাই ঠিক তা নয়। আসলে তুমি বোধ হয় জানো, আমার বদলীর অর্ডার এখনো বহাল। যেতে কিছুদিন দেরি হবে বলে কোয়ার্টারটা নিয়ে নিতে হল। এটা ঠিক হোস্টেলের এঘর থেকে ওঘরে যাওয়ার মতন। তুমি যেভাবে বলছ, সেভাবে মনেই হয়নি। তাহলে এবার গৃহপ্রবেশটা করেই নাও বলল সেলিনা। তপতী বলল, বল কবে যাবে, তোমরা যেদিন যাবে সেদিনই আমার গৃহপ্রবেশ! কণ্ঠে বুঝি কোন এক না জানা অভিমানের সুর বাজে।
সন্ধ্যা হয়ে আসে। তপতী বলে, প্রান্তিক চল একটু বাসে তুলে দিয়ে আসবে। বললাম চল।
মিনতি সেনের আদেশ, তাকে অমান্য করার কোন উপায় নেই। একদিন এলাম প্রতীম চৌধুরীর অফিসে। দেখি ঘরে আছেন সজল বাবু। আমি নমস্কার করতে উনিও নমস্কার করলেন, সৌজন্য বিনিময়ের পরে তিনি চলে গেলেন। প্রতীমবাবু বললেন, খুব তাড়াতাড়ি এলে, তোমার কথাই ভাবছিলাম। আমার কথা? কেন? হা বলছি, তুমি বোধ হয় দেখেছে আমাদের কোম্পানী কয়েক জন জুনিয়র ম্যানেজার নেবেন। তুমি যদি দরখাস্ত কর, অবশ্য তুমি যদি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করতে চাও তাহলে একটা দরখাস্ত পাঠিয়ে দিও। আমি বললাম, আপনি যে আমার কথা মনে রেখেছেন, তার জন্য খুব ভাল লাগছে, আমি এই ব্যপারেই আপনার কাছে এসেছিলাম। সত্যি? হ্যাঁ সত্যি! তা হলে দরখাস্তটা পাঠিয়ে দাও। আমি বললাম দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেই আমার চাকরি হবে? না হওয়ার তো কোন কারণ নেই। আপনাদের রিটেন, পার্সোনালিটি টেষ্ট পাশ করতে না পারলেও। তুমি ফেল করবে এটা ভাবছো কেন? পাশ করব এ গ্যারান্টিতো নেই। না তা অবশ্য নেই। যদি তাইই হয় তা হলে তো হবে না। আমি বললাম, তার মানে আপনারা চাইলেও হবে না। আমরা শুধু পার্সোনালিটি টেষ্টে কিছু কনসিডার করতে পারি, কিন্তু রিটেন টেষ্টে তোমাকে পাশ করতে হবে প্রান্তিক। ঠিক আছে আমি দরখাস্ত পাঠিয়ে দেব। তবে আমি আপনার কাছে এসেছি একটা অনুরোধ নিয়ে। আমি শুনেছি আপনাদের কোম্পানী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কয়েকটি স্কুল চালায়। সেই সমস্ত স্কুলে শিক্ষক চেয়েও আপনারা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। হ্যাঁ দিয়েছি। তুমি কি স্কুল শিক্ষকতা করবে? করব কিনা জানিনা কিন্তু দরখাস্ত করতে আপত্তি কি? না আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু তুমি মনে হয় বিজ্ঞাপনটা ভাল করে দেখোনি। দেখলে দেখতে পেতে আমরা শুধু মহিলা প্রার্থীর জন্য আবেদন পত্র চেয়েছি, কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা চেয়েছি প্রথম শ্রেণীর স্নাতক। বললাম দেখেছি। তা হলে? আমি ভনিতা না করে বললাম একটা ফর্ম দেবেন? উনি হেসে বললেন দেব। তোমার ক্যান্ডিডেটটা কে? বললাম আপনি তাকে চেনেন। আমি চিনি? অদ্ভুত কথাতো। আমি যদি চিনি তবে আমার কাছে এলোনা কেন? ওদের তো কোন রিটেন টেষ্ট নেই। শুধু মাত্র ওরাল ইনটারভিউ। আপনি থাকবেন বোর্ডে। না থাকলেও কোন অসুবিধা হবে না। তুমি তার নাম ঠিকানা দিয়ে যাও।
