মিনিট পাঁচেক পরে ও ফিরে এল, এসেই বলল চল। কোথায়? বা যে জন্য এসেছে, সেখানে যাবে না? আমি বুঝেও না বোঝার ভান করে বললাম, তোমার হেঁয়ালি কথা ছাড়। একটু সোজাসুজি বল। বলছি, এসো না আমার সাথে। না আমার সাথে যেতেও অসুবিধা। বললাম সৌমেন্দ্র কোথায়? বাড়ীতে গেছে। কথা বলতে বলতে মিনিট কয়েকের মধ্যে ওর কোয়ার্টারে এসে উপস্থিত হলাম, এর আগে হোস্টেলে ছিল, অল্পদিন হলো কেয়ার্টার পেয়ে চলে এসেছে। আমাকে একটা দরজা দেখিয়ে বলল, ভিতরে গিয়ে বস। আমি পোষাকটা বদলে আসি।
ভেজানো দবজা ঠেলে ঢুকলাম, আব ঢুকেই চমকে উঠলাম। অশ্রুকণা খাটের রেলিংএ একটা বালিশে ঠেস দিয়ে আজকের কাগজ পড়ছে। ও বোধ হয় বুঝতে পারছে না, আমি এসেছি, ডাকলাম কণা!
অতি পরিচিত কণ্ঠ স্বরে আর ওই নামে, যে নামে, ওকে আর কেউ ডাকেনা, আনন্দ ও বেদনা মিশ্রিত চোখ তুলে তাকালো। তারপর বলল, ভয় নেই প্রান্তিক তপতীদিকে বলেছি মাত্র একটা দিন যেন আমাকে আশ্রয় দেয়। এইটুকু দয়া তুমি কর প্রান্তিক!
যেন ব্যথার সমুদ্র থেকে ভেসে আসছে অতি করুণ এক সুর। আমি আস্তে এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসলাম। ও বাধা দিল না। বললাম, কেন এত ব্যথা দাও সকলকে! চল আমার সাথে। কোথায়? সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না কণা, আমি যেতে বলছি, তুমি যাবে। কোন উত্তর না করে চুপ করে রইল। আমি আবারও বললাম, এতো দেরি করোনা। ওরা সবাই তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। ও অবাক হয়ে বলল, ওরা মানে? বা, ওরা মানে মিনতি সেন, নীলাঞ্জনা পিসি, সেলিনা। ও তাই বল। ওদের জন্যই তুমি এসেছো। কিন্তু আমি যাব না প্রান্তিক। আমি আর ফিরে যাবো না। আমি আবেগ মথিত কণ্ঠে বললাম, তুমি কাউকে বুঝতে চাওনা কেন বলত। না আমি কাউকে বুঝতে চাই না, আসলে নিজেই নিজেকে বুঝিনা। এবার ওর একটা হাত ধরে বললাম, কণা, সত্যি তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। বড় মুখ করে ওদের আমি কথা দিয়ে এসেছি, ওদের কাছে আমাকে ছোট করে দেবে।
দেখতে পাচ্ছি, ওর চোখ দুটি জলে ভারাক্রান্ত, এখনি বোধ হয় টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়বে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তিন কাপ চা নিয়ে ঢুকলো তপতী। হাসতে হাসতে বলল, ঠিকতো প্রান্তিক, তোমাকে একটু আগে বলেছিনা, আজ না এলে হয়তো ভাবতাম তুমি আমার কাছে এসেছে। আমি অশ্রুকণার হাত ছেড়ে দিয়ে তপতীর কোন উত্তর না দিয়ে তপতীকেই বললাম, সকাল থেকে বলতে গেলে চা খাওয়াই হয়নি। তারপর বললাম শুধু চা? কিছু টিফিন হবে না? কি খাবে বল। যা হোক একটা কিছু দাও। সত্যি ভীষণ খিদে পেয়েছে। তপতী বলল, চাটা খেয়ে নাও দেখছি কি আছে?
কিছু নেই, তাই চা-ই ওদের সঙ্গে খেতে হল। খাওয়া হয়ে গেলে বললাম, তপতী তুমি তো বহুদিন থেকে বলছ পিসির ওখানে একবার যাবে। যাওনি, আজ চল। না আজ থাক। সৌমেন্দ্রের আজ আসার কথা, কোথায় গেছি হয়তো ভাবতে পারে। হাসলাম একটু। তারপর বললাম ওটা অজুহাত। তুমি ভালভাবেই জান, সৌমেন্দ্র আজ আসবে না। ও অবাক হয়ে তাকালে আমার দিকে, তারপর বলল এটা মিথ্যে অজুহাত নয়, ও সত্যিই আসবে। ঠিক আছে, চল। কিন্তু অশ্রুকণা কিছুতেই রাজী নয়। ও বলল, কেন মিথ্যে পিছু ডাকছু প্রান্তিক। আমি আর ফিরে যেতে চাইনা। আমি বললাম বেশ, তুমি চলে এস, কিন্তু এখন আমার সঙ্গে চল, একবার অন্তত আমার কথা রাখ। তার কোন দরকার নেই প্রান্তিক, তুমি ধরং তপতী দিকে নিয়ে যাও, কথা দিচ্ছি আমি এখানেই থাকবো।
তপতী বলল, অশ্রু কেন এরকম করছ? আমার মনে হয় তোমার যাওয়া উচিত। তোমার কাছে যেটুকু শুনেছি, আমি কিছু না শুনে না জেনেও, তোমার থেকে বেশী জানি ভাই। মিথ্যে অভিমান করে কাকে আঘাত দিতে চাইছো? বরং প্রান্তিককে তোমার কিছু বলার থাকলে বলে নাও এই বেলা, আমি শাড়ীটা বদলে আসছি। তপতী সত্যি সত্যি শাড়ী বদলাতে অন্য ঘরে চলে গেল।
অশ্রুকণা বলল, তুমি কি করে জানলে আমি এখানে এসেছি? আমি বললাম, আমার মন বলছিল আমার সঙ্গে দেখা না করে তুমি কোথাও যেতে পার না। তাই প্রথমে গঙ্গার ঘাটে গিয়েছিলাম, কিন্তু সেখানে যখন পেলাম না, তখন ভাবলাম, এখানে আসতে পার। এরকম ভাবলে কেন? ভাবনাটা মনে এসে গেল তাই। কিন্তু ওসব কথা থাক। এবার ওঠ কণা। ও বলল, তুমি কি বিশ্বাস কর তোমার সঙ্গে দেখা না করে আমি কোথাও যেতে পারি না। আমার বিশ্বাস থাক কিন্তু তুমি বলত, আমাকে না জানিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবে? জানিনা। জানো যখন, তখন ওঠ। তপতী কি ভাবছে বলত!
শেষ পর্যন্ত এল ও আমাদের সাথে। তবে তাকে কথা দিতে হয়েছে, আজকেই সে ফিরে আসবে তপতীর সঙ্গে। আমি বললাম তাই হবে।
মিনতি সেন অশ্রুকণাকে জড়িয়ে বলল, এ পাগলামি তুই কেন করতে গেলি অশ্রু। আমাকে যদি একটুও ভাল না বাসিস কেন গিয়েছিলি আমার কাছে? এবার চল আমার সাথে! অশ্রুকণা মিনতি সেনকে ছেড়ে দিয়ে বলল, তা হয় না পিসি। আমাকে নিজের পথ খুঁজে নিতে দিন। উনি বললেন, ওরে পাগলি মেয়ে, আমার সর্বস্ব চুরি করে ভাবছিস তুই পথ খুঁজে পাবি? কোন দিন পারি না। যদি আমার সঙ্গে না যাস তা হলে তোকে আমি এমন শাস্তি দেব, যে শিউরে উঠবি। মনে রাখিস আমি তোর বাবা-মা নই, যে হাজার অপরাধ করলেও তোকে ক্ষমা করতে হবে! অশ্রুকণা চুপ করে রইল। আমি চলে গেলাম আমার নিজের ঘরে। ও ঘরেই একটু পরে এল তপতী, সেলিনা এবং নীলাঞ্জনা পিসি। সেলিনা বলল চা খাবে তপতীদি! নীলাঞ্জনা বললেন কতদিন পরে তোকে দেখছি, পথে ঘাটে দেখা হলে আমিতো চিনতেই পারতাম না। এত কাছে থাকিস অথচ একবারও এলি না ব্যাপার কি বলতো। তপতী বলল, পথে ঘাটে দেখা হলে আমিও তোমায় চিনতে পারতাম না। সেই কত ছোটবেলায় তোমাকে দেখেছি। প্রান্তিকের কাছ থেকে তোমার ঠিকানাও নিয়েছি, কিন্তু আসা আর হয়ে ওঠেনি। সেলিনা চা নিয়ে এল। নীলাঞ্জনা বললেন, সকাল থেকে এরা কিছু খায়নি। মিনতিকে কতবার বললাম, প্রান্তিক যখন বলেছে ওকে যেখান থেকে হোক ফিরিয়েই নিয়ে আসবে, যা হোক কিছুমুখে দাও ভাই। কিন্তু ওর ওই এক কথা। ও না আসা পর্যন্ত আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে না। কিন্তু তপু তোর ওখানে ও গেল কি করে? আর গেলইবা কখন? তপতী বলল, ও আগে কোথাও গিয়েছিল কি না জানিনা, প্রান্তিকের যাওয়ার ঘন্টা ২/৩ আগে ও আমার অফিসে গিয়ে উপস্থিত হয়। তারপর নিজেই বলে, তপতীদি একটা রাত আমি তোমার কাছে থাকব, তুমি আমায় ফিরিয়ে দিওনা, বলে, ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। তারপর ওকে নিয়ে আমি আমার কোয়ার্টারে এলাম, শুনলাম ওর কথা। তারপর বললাম, অশ্রু, দিদি বলে যখন ডেকেছে, তখন একটা রাত কেন, যতদিন তোমার থাকতে ইচ্ছে করে তুমি থাক। এরপর ওকে ঘরে রেখে আবার আমি ডিউটিতে চলে যাই, কিছু জরুরী কাজ ছিল। সেটা যখন তাড়াতাড়ি সাবছি তখন গেল প্রান্তিক। ওর কথায় বুঝেছি ওর যাবতীয় অভিমান প্রান্তিকের উপর।
