আমি বললাম, থাক সেলিনা ওসব কথা, তার চেয়ে কলকাতার এই ফাঁকা রাস্তা আর উপরের নীল আকাশ দেখ। কলকাতার এই চেহারাতো দেখনি কোনদিন! তুমি বুঝি বার বার দেখেছে? দেখেও আঁশ মেটেনি বলে আবারও দেখতে চাইছো?
আমি বুঝতে পারছি সেলিনা প্রচণ্ড রেগে আছে আমার ওপর। মনে মনে ভাবছি। যত তাড়াতাড়ি পথটা শেষ হয় ততভাল। ফাঁকা রাস্তায় কুকুরের পাল, মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করছে, আর সেই মুহূর্তে রাতের এই নিঃশব্দতা খান খান হয়ে নিজেদের বুকে শিহরণ জাগাচ্ছে।
এক সময় পৌঁছে গেলাম বাড়ীতে। নীলাঞ্জনা পিসি ঠায় দরজা খুলে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছেন বারান্দায়। হয়তো বকাবকি করবেন। কিন্তু না, নীলাঞ্জনা পিসি কোন কথাই বললেন না। শুধু সেলিনাকে বললেন, একটা সংবাদ যে কোন ভাবে পাঠিয়ে দিয়ে থেকে যেতে পারতিস তো। সেলিনা বলল, ট্রেনটা বিগড়ে যাবে ভাবতে পারিনি, তাই রাত হল, তুমি খেয়েছো? না খাওয়া হয় নি, তোরা তাড়াতাড়ি আয়, বেশ খিদে পেয়েছে।
খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু পিসিকে কষ্ট দেওয়া হবে, তাই ডাইনিং টেবিলে এসে বসলাম, খেলামও। ঘুমোতে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে খিল তুলে দিলাম।
সকালে ঘুম ভাঙতে দেরি হয়। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সকাল নটা। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখি সেলিনা। কি ব্যাপার তুমি? সে কথা পরে হবে প্রান্তিক ভাই, কিন্তু তুমি দরজা বন্ধ করে শুয়েছে কেন, চোর আসার ভয়ে? মিটি মিটি হাসছেও। বললাম যা হয় একটা ভেবে নিও। আচ্ছা পরেই না হয় ভাববো, আপাতত মায়ের ঘরে চল, প্রায় ২ ঘন্টা হলো মিনতি পিসি এসেছেন, আর তখন থেকেই তোমাকে ডাকছি। বাব্বাঃ ঘুমোতেও পার বটে।
আমি অবাক হয়ে বললাম মা! এত সকালে, কিন্তু কেন? সে তুমি ও ঘরে গেলেই জানতে পারবে, তুমি তাড়াতাড়ি এস। আমি চা নিয়ে আসছি।
নীলাঞ্জনা পিসির ঘরে এসে দেখি বিমর্ষ চিন্তান্বিত মিনতি সেন, চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। বললাম কি হয়েছে মা, এত সকালে? মিনতি সেন কোন কথা না বলে একটা চিঠি তুলে দিলেন আমার হাতে। অশ্রুকণার লেখা, মিনতি সেনকে লিখেছে, পিসি, গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার পথে নামলাম। বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনার কাছে জীবনে বেঁচে থাকার জন্য একটা ছোট্ট চাকরি চেয়েছিলাম, হয়তো আমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আপনি রাজী হননি। কিন্তু আমার জন্য আপনার ও আপনার ছেলের মধ্যে কোন ব্যবধান তৈরি হোক চাইনি। আর হ্যাঁ, না বলে আপনার কিছু টাকা নিয়ে গেলাম, অবশ্য টাকাটা বাইরেই পড়েছিল। চোরেও চুরি করতে পারতো। আমাকে না হয় তাই ভাববেন। আপনার ভালবাসা ও সহানুভূতি আমার আজীবন মনে থাকবে। অশ্রুকণা।
অনেকবার পড়লাম চিঠিখানা, তারপর তা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম তুমি বাড়ী যাও মা, আমি দেখছি। সেলিনা চা নিয়ে এল। মিনতি সেন বললেন কিছু খেতে ইচ্ছে করছেনা মা। তুই চা-টা নিয়ে যা। সেলিনা বলল, তুমি বাড়ী যাবে না অফিসে? না ভাবছি কমিশনার কাকার সঙ্গে একবার দেখা করব, তারপর দুপুরে এখানেই ফিরব। কিন্তু মেয়েটা যে কোথায় গেল? আমি বললাম, তুমি চিন্তা করোনা! সেকি প্রান্তিক চিন্তা করবনা? তুই বলছিস কি? আচ্ছা তুমি চিন্তাই কর। আমি আসছি। চা-টা শেষ করে জামা প্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়লাম।
মনে হয়েছিল, কলকাতা ছাড়ার আগে ভোরের গঙ্গাঘাটে একবার আসতে পারে ও, যদিও তখন আর ভোর নেই, তবুও একবার এসে পড়লাম সেই গঙ্গা ঘাটে। কিন্তু না, এখানে ও নেই। তপতীর সঙ্গে ওর পরিচয় নেই সেভাবে, তবে চেনে তাকে। জীবনের কঠিন সংগ্রামে তপতী তার পথ খুঁজে পেয়েছে। তার অনেক কথাই শুনেছে সেলিনার কাছে। অশ্রুকণার কথাও হয়তো শুনেছে তপতী। অনেকদিন যোগাযোগ নেই ওর সাথে। ওরতো বদলী নিয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল, যদি চলে না গিয়ে থাকে, একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে এলাম ও যেখানে কাজ করে সেখানে। অফিসে জেনে নিলাম, ও ডিউটিতে আছে। একমনে কাজ করছে কেউ নেই। আমি যে এতক্ষণ ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছি বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ পিছন ফিরে আমাকে দেখে চমকে উঠে বলল, আরে প্রান্তিক তুমি! তারপর বলল তোমার কথাই ভাবছিলাম না শুধু, ভীষণ ভাবে তোমাকে চাইছিলাম। আমি অবাক হয়ে বললাম কেন? তুমি বোধ হয় জানো না সৌমেন্দ্র পরীক্ষা ড্রপ করেছে। না জানি না, কিন্তু কেন? ও বলল দেখ এজন্য তোমাকে চাইছিলাম না। তবে এর মাঝে আমি বাড়ীতে গিয়েছিলাম। তারপর তোমার বাবার সাথে দেখা হয়েছিল। তোমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চেয়েছিলেন। তুমি রেহানা নামে কোন মুসলিম মেয়েকে ভালবাস কি না এটাও জানতে চাইছিলেন। আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি কি বললে? আমি কিছুই বলিনি, তবে তোমার উপর যে তোমার বাবার প্রচণ্ড অভিমান, এটা বুঝে এসেছি। কতদিন আগে গিয়েছিলে? তা বেশ কিছু দিন হল, বলল তুমি নাকি গিয়েছিলে অথচ রেহানার কথা কিছুই বলনি। আমি বললাম রেহানার কথা, কি বলব তুমিই বল? আমি বুঝি তোমার অবস্থা। কিন্তু আমার অবাক লেগেছিল, রেহানার সম্পর্কে অত কথা তিনি জানলেন কি করে? আমিও কম অবাক হচ্ছিনা, তোমার কথা শুনে। তপতী বলল, তোমার একবার গ্রাম থেকে ঘুরে আসা উচিত প্রান্তিক। তাছাড়া চিঠিপত্র লেনা। ওখানেই শুনলাম তোমরা গিয়েছিলে। যাকগে সেকথা, তুমি কি আমার কাছে এসে? তোমার কি মনে হয়? আমার? থাক আমার কথা, তবে যদি আজ না এসে অন্যদিন আসতে, ভাবতাম আমার কাছেই এসেছে। তবে আজ নয় কেন? বলব, তুমি একটু বোস, চলে যেওনা আমি আসছি।
