আমি রেহানা হতে পারবো না, যে গভীর ভালবাসায় সে পথে নামতে পারে তা আমার নেই, আবার তোমার বিশ্বাসও আমার মধ্যে নেই। আমি প্রতিমুহূর্তে চেয়েছি প্রতিদান, মিথ্যে হোক, তবু যদি একবারও ও বলতো কণা আমি তোমায় সত্যিই ভালবাসি, সব অভিমান জল হয়ে আমি হয়তো নতুন স্বপ্নের আলোকে পথে নামতে পাবতাম। কিন্তু সেলিনা, আজ আমি নিঃস্ব, কিছু নেই আমার। তবু আমি হারতে চাই না, একদিন না একদিন আমার জয় আসবেই, আর সেদিন হয়তো তোমাদের কথাই মনে পড়বে ভীষণ ভাবে। রেহানা, তুমি, প্রান্তিক, তোমাদের আবার নতুন করে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করবো। একটু থামলো অশ্রুকণা, তারপর বলল, এত কথা বলার অন্য কোন কারণ নেই সেলিনা, কারণ আমার প্রতি মুহূর্তের ভয় তুমি আমাকে বাধা দিতে পারো। তাই তোমার ছাড়পত্র আগে থেকেই আদায় করে নিতে চাই।
এতক্ষণ ধৈর্যের সঙ্গে সেলিনা শোনে অশ্রুকণার ক্ষোভ অভিমান, রাগ আর তার ক্ষত-বিক্ষত জীবন কাহিনী। কি উত্তর দেবে সে। যা সে বলেছে তার সম্পর্কে, কোন দিন সেলিনা ভেবে দেখেনি, তা কতটা সত্য, কতটা কল্পনা। কিন্তু তাই বলে প্রান্তিকের সঙ্গে কথা না বলে, কোন ভাবেই অশ্রুকণার যাওয়া হতে পারে না। তার ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে বাধা। সে দেবেই। ধীর ধীরে বলল, তোমার সব কথাই শুনলাম অশ্ৰুদি, অংকের মত হিসাব করে ভালবাসার নিক্তিতে মেপেছছ জীবনের দেনা পাওনা। ওভাবে জীবনের অংক মেলেনা অদি। আর পরগাছার কথা বলেছে। জানিনা কেন এই ভয়ংকর শব্দ তোমার মুখে উচ্চারিত হল। বুঝতে পারছি আঘাতের তীব্রতা তোমায় কোথায় নিয়ে পৌঁছে দিয়েছে। তবুও অশ্ৰুদি তোমায় বলব, ছোট খাট ২/১টা ঘটনা দিয়ে জীবনের বিচার করোনা, অপেক্ষা করো, ধৈর্য ধর। নিজেকে জানার চেষ্টা করা সবার আগে। ভাব কি চাও তুমি, তারপর না হয় নতুন ঠিকানার খোঁজ কর। এখন চল। সত্যিই রাত হয়ে যাচ্ছে, মা চিন্তা করবেন।
নিজের আঁচলে চোখটা মুছে নিয়ে অশ্রুকণা বলল, বেশ চলল। ভেজানো দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই দেখে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন মিনতি সেন।
যখন বাড়ী ফিরে এসেছি তখন প্রায় রাত ১২টা, কলকাতার রাস্তায় পারত পক্ষে কোন বাস নেই। ট্যাক্সিতো নেইই। মিনতি সেন বার বার বলছিলেন আজ থেকে যা প্রান্তিক, আমি নীলাঞ্জনাকে যে কোন ভাবে সংবাদ পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এত রাত হবে বুঝতে পারলে হয়তো, আসতাম না, কে জানতো ওভার হেড তারে বিদ্যুৎ না থাকার জন্য ট্রেন প্রায় দেড় ঘন্টা লেট করবে।
একেবারে ফাঁকা রাস্তা। বললাম মনে হচ্ছে হেঁটে যেতে হবে। সেলিনা বলল, তাই চল। দাঁড়াও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি। অবশেষে বেশী পয়সার টোপ ফেলে একজন টানা রিক্সাওয়ালাকে ম্যানেজ করা গেল, তার দাবি অতরাতে ওতো আর এখানে ফিরতে পারবেনা, তাদের বারান্দায় বা অন্য কোথাও রাত কাটাবার ব্যবস্থা করে দিলে সে যেতে রাজী। তাতেই রাজী হয়ে উঠে পড়লাম।
রিক্সায় আসতে আসতে ফেলে আসা অতীতকে নিয়ে ভাবছিলাম। অশ্রুকণা একটা কথাও বলেনি আমার সাথে। মিনতি সেনও কেমন যেন ব্যপারটিকে খুব ভালভাবে নেননি। অথচ অশ্রুকণারতো এই মুহূর্তে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ওকে নিয়ে কিছু একটা করতেই হবে। সেলিনা বলল, কি ভাবছে। বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে, ফাঁকা রাস্তা, শাড়ীর আঁচল গায়ে বেশী করে জড়িয়েও ও যে শীতে জড়সড় হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি। বললাম, না এমন কিছু ভাবছিনা, শুধু নিজের অক্ষমতা নিয়ে বড় কষ্ট হচ্ছে? তোমার তা হলে কষ্ট হয়? একথা বলছ কেন? না আমার মনে হতো তোমার স্থান এত উঁচুতে যে, তোমার কোন কষ্ট হতে নেই। ঠাট্টা করছ? পাগল তোমাকে ঠাট্টা করব? তারপর হয়তো দেখবো, পছন্দ করে যে মালা দুটো কিনেছো, তাই হয়তো টুকরো টুকরো করে এই পথেই ছড়িয়ে চলেছে।
সত্যি মনে ছিল না, যাওয়ার সময় দুটো সুন্দর যুঁই ফুলের মালা কিনে ছিলাম অবশ্য ও কিনতে বলেছিল তাই। ও নিয়ে ছোট্ট একটা ঠাট্টাও করেছিলাম কিন্তু তারপর ওটা আমার চিন্তায় আর আসেনি, কিন্তু সেটা আলাদা কথা, ও যে মালা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলার কথা বলেছে, এর পিছনে আছে নিশ্চয়ই অশ্রুকণার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছিল তার ইঙ্গিৎ। তাই বললাম, আমি বুঝি পয়সা খরচ করে কিনে ছিলাম টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলার জন্য? তা হয়তো কেনোনি, তবে কেন কিনেছিলে সেটা কি জান? আমি চুপ করে রইলাম। ও বলল হয়তো বলবে আমার ইচ্ছেয় তাইতো! কিন্তু প্রান্তিক ভাই, কাল যে গোলাপগুলো কিনেছিলে তা কিন্তু তোমার ইচ্ছেয় কিনেছিলে তবে তা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললে কেন? কেন বুঝলে না ওই অবস্থায় সবাইতো আর সেলিনা নয় এটা তোমার বোঝা উচিৎ ছিল। হয়তো একরাশ লজ্জা এসে ফুলের সাজে সাজতে তাকে বাধা দিয়েছিল বলেই সেটা সে চায় নি? পারতে না, অন্য কোন অবকাশে যা তুমি চাইছিলে সেই ভাবে সাজিয়ে দিতে তাকে? তাতে কি তোমার খুব কষ্ট হতো? তুমি যে এভাবে কাউকে সাজাওনি তাতো নয়? সাজিয়েছে বলেই তুমি কি তাদের কাছে ধরা দিয়েছে? ছিঃ প্রান্তিক ভাই ছিঃ! কি পরিমাণ আঘাত তুমি অশ্ৰুদিকে দিয়েছো জানো? আর তাছাড়া অদির যদি সত্যি কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকতে হয়তো মিনতি পিসির ওখানে আসতেন না। কিন্তু অদির আসার পরে তুমি যে ব্যবহারটা করেছে তাতে আমি ভাবতেও পারছি না। বললাম আমি খারাপ ব্যবহার করেছি? করোনি? আজ দেড় মাস হতে এল অশ্ৰুদি মিনতি পিসির ওখানে এসেছে, কিন্তু এই দেড় মাসের একদিনও কেন আসোনি এখানে? কেন অদির সঙ্গে দেখা করনি একদিনের জন্যও? সেই যখন তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজে তোমার সঙ্গে দেখা করল, মিথ্যে সান্ত্বনাও তো দিতে পারতে? ভাবলে নিজের আসল পরিচয়টাই সব। আর কারো কোন পরিচয় নেই? কারো কোন মূল্য নেই?
