ঠিক সেই সময় সেলিনা কফি নিয়ে এসে দাঁড়ালো সামনে, বলল, মা ছেলের কথায় ব্যাঘাত ঘটালাম নাতো! আমাকে ছেড়ে দিয়ে মিনতি সেন বললেন, তুই আমার মেয়ে না? অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, সে আর হতে পারলাম কই পিসি, আপনি বুড়ো খোকাকে আদর করছেন, আর মার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেন না। কফির সরঞ্জাম সামনের টেবিলে রাখল সেলিনা, মিনতি সেন তখনো খাটে বসে আছেন, সেলিনা ওগুলো রাখা মাত্র সেলিনাকে টেনে নিয়ে তার কপালে পরপর কয়েকটি চুমু খেয়ে বললেন, রাগ পড়েছে মেয়ের? আমি কেন রাগতে যাব, ঐ দেখুন না আপনার ছেলে আমাকে আদর করছেন বলে কেমন বড় বড় করে তাকাচ্ছে, বলে আর অপেক্ষা না করে দ্রুত পালিয়ে গেল।
অশ্রুকণা তখনো অপেক্ষা করছে সেলিনার জন্য। আসার পরে নিজেরা কফি খেয়ে নিয়ে সেলিনাকে বলল, মাংসটা তুমি রান্না কর না সেলিনা। আমি? হ্যাঁ তুমি, দেখ আমি কোনদিন রান্না করিনি। ভেবেছিলাম পিসি বুঝি দেখিয়ে দেবেন। কিন্তু একবারও রান্না ঘরে আসেন নি। আমি কয়েকবার জিজ্ঞাস করাতে বললেন, তুই যা ভাল বুঝিস তাই কর। মেয়েরা নাকি জন্মের পরদিন থেকেই রান্না করতে পারে। বাজে কথা সবই শিখতে হয়। অশ্রুকণা বলল, তা হলে তুমি এই মাংসটা রান্না করতে আমায় সাহায্য কর।
হঠাৎ বুঝি মিনতি সেনের খেয়াল হয় সেই যে অশ্রুকণা রান্না ঘরে ঢুকেছে একবারও বাইরে আসেনি। ওতো বলেছিল কোনদিনই রান্না করেনি। আমিই ওকে সাহায্য করব বলেছিলাম, অথচ আমি একবারও রান্না ঘরে না গিয়ে বলেছি যা পারিস তাই কর। কি জানি কি করছে খাওয়ার মত হবে তো।
সেলিনা তখন মাংসের হাঁড়িটাতে সব কিছু পরিমান মত দিয়ে চাপাতে যাচ্ছে মিনতি সেন পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, তুইতো আর কিছু বললি না, অথচ বললি রান্না করতে জানিস না। হঠাৎ অশ্রুর মনে হল সে একেবারে অপাংক্তেয় এবাড়ীতে। কাজের লোক ছাড়া যেন কিছুই নয়। বহু কষ্টে অদম্য কান্নাকে চাপা দিয়ে বলল, আপনি ব্যস্ত ছিলেন, তাই আর কি। মেয়েদের রায়া না জানাটা যে কত কষ্টের আগে বুঝতে পারিনি, মাংসটা তাই সেলিনাকেই করতে বলেছি।
অশ্রুকণা যে কথাটা বলতে পারেনি, সেই অব্যক্ততা যেন আঘাত করল মিনতি সেনকে। বললেন, যা অশ্রু, এবার বাথরুমে গিয়ে হাতেমুখে সাবান দিয়ে পরিস্কার হয়ে নে। তুইও যা সেলিনা। রাত হয়ে যাচ্ছে তোদের তো আবার যেতে হবে। সেলিনা কোন ভাবে চোখে মুখে সাবান দিয়ে বেরিয়ে এল। কিন্তু অশ্রু কলার সমস্ত শরীর যেন ব্যথায় টনটন করছে। কি জানি কেন যে তার এত অপমান লাগছে সে নিজেই বুঝতে পারছেনা। তবে একথা ঠিক যে সে সেলিনার আসার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। না সেলিনাকে সে এই মুহুর্ত্তে মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা।
প্রথমে ভেবেছিল ভাল করে হাতে মুখে সাবান দিয়ে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু অবশেষে পূর্ণ স্নানই সে করল। ঘরে এসে সব থেকে কম দামের আটপৌরে শাড়ীটা পরে নিল। মাথায় কোন ভাবে চিরুনি বুলিয়ে হাত দিয়ে আধো খোঁপার মত চুলটা বেঁধে নিল। মুখটা সাবান দেওয়ার জন্য খস্ খস্ করাতে ক্রিম বুলিয়ে নিল। সব সময় যে সরু চেনটা পরে থাকে, তা কি খেয়াল হতে খুলে ফেলে হাল্কা একটা কিছু পরে নিল। তারপর এল সে সেই ঘরে যেখানে ওরা সবাই আছে একসঙ্গে। ওকে দেখে চমকে উঠে সেলিনা বলল অশুদি? অকশা ওর কথার উত্তর না দিয়ে প্রান্তিককে বলল, অনেকক্ষণ এসেছে, তোমাদের কাছে আসতে পারিনি বলে কিছু মনে করো না। আসলে জবার মা আজ কয়েকদিন ধরে আসছেনা তো, তাই পিসির অনুরোধে ওর কাজটা আজ আমাকেই করতে হল, আর সেদিন তুমি কথাচ্ছলে বলেছিলেন, যাকে যে কাজ মানায়, তাকে সে কাজই করা উচিত্র আর তার পোষাকটাও সেই রকমই হওয়া উচিত না হলে সামঞ্জস্য থাকে না। অবশ্য কথাটা তোমার নিজের ক্ষেত্রেই তুমি বলেছিলে, কিন্তু আরো বলেছিলে তুমি বিশ্বাস কর, তোমার এ মতটা সার্বজনীন। আমিও তাই কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার চেষ্টা করেছি। এতেও যদি ভুল হয়, বলে দিও ভবিষ্যতে আবার কোনদিন এরকম অবস্থায় সম্মুখীন হতে হলে যাতে অস্বস্তিতে পড়তে না হয়।
সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, বলে কি অশ্রুকণা। ওকি অপমান করতে চাইছে? আমার এবং মিনতি সেনের ভাবনাটা অন্তত সে রকম কিছু। ওর অভিমানটাকে বুঝি, বুঝতে পারে সেলিনাও। সে উঠে এসে অশ্রুকণাকে জোর করে টেনে নিয়ে যায় যে ঘরে আপাতত থাকে ও। বলে, অশ্ৰুদি আমাকে একটা সত্যি কথা বলতো, আমি তোমার ছোট বোনের মতন, কি হয়েছে তোমার? মিনতি পিসি বা প্রান্তিক ভাই তোমাকে কি কোন অপমান করেছেন? কি ভাবে যে কান্না দমন করছে অশ্রুকণা, তা দৃষ্টি এড়ায়না সেলিনার। বলে, দুঃখকে এভাবে চেপে রেখোনা অশ্রুদি, তাতে আরো বেশী কষ্ট পাবে। বলনা কি হয়েছে? অশ্রুকণা বলে কিছু হয়নি সেলিনা, তোমাদের তো যেতে হবে, চল ও ঘরে। যাব, কিন্তু তার আগে তোমাকে বলতে হবে কি হয়েছে তোমার? কার বিরুদ্ধে তুমি প্রতিবাদ জানাচ্ছ? অশ্রুকণা বলে প্রতিবাদ জানাবার জন্য অধিকার থাকা চাই, যাদের উপর সে অধিকার ছিল প্রতিবাদ করে তাদের কাছ থেকে চলে এসেছি, এবারতো আর প্রতিবাদ করা চলে না ভাই। নিজের পায়ের নীচের মাটি আগে খুঁজে নিতে হবে, যতদিন তা না পাচ্ছি ততদিন আমিতো একটা পরগাছা মাত্র। পরগাছার আবার অধিকার? যাকে নির্ভর করতে হয় অন্যের পরে তারতো কোন স্বপ্ন থাকতে নেই, নেই কিছু পাওয়ার আশা করতে। যতদিন বাবা-মায়ের কাছে ছিলাম, ততদিন বুঝতে পারতাম না, কিন্তু এখন ভালো করে বুঝতে পেরেছি আমার মূল্য কতটুকু। তাই থাক এসব কথা সেলিনা, দেরি হয়ে যাবে তোমাদের। হোক দেরি, তবু তুমি বল অদি। বলতে পারলে দেখবে অনেক হাল্কা লাগছে। অশ্রুকণা বলে, না আর কিছু বলার নেই। নতুন পথে চলতে চলতে যদি নতুন সত্যের কিছু সন্ধান পাই, আর কাউকে না জানালেও তোমাকে জানাব সেলিনা। সেলিনা বলে তুমি কি এখান থেকে চলে যেতে চাইছো? দেখি, সেদিন যখন এসেছিলাম, কেন এসেছিলাম জানতাম না। আবার যখন চলে যাব, কেন চলে যাব, তাও হয়তো বলতে পারবো না, তবু যেতে হবে। কেন? না হলে মা ও ছেলের বিচ্ছেদ হয়ে যাবে, আমি কি তা চাইতে পারি? যার পর নাই বিস্মিত হয়ে সেলিনা বলল, কি বলছ অশ্রুদি। যা ঠিক তাই বলছি, তা না হলে তুমিতো জান আমি আজ কতদিন হয়ে গেল এখানে এসেছি, অথচ প্রান্তিক সেই যেদিন প্রথম এসেছিলাম সেদিনের পরে আর একদিনও আসেনি। কাল আমি ওর সঙ্গে নিজেই দেখা করেছিলাম, হয়তো রাত হয়ে যাওয়াতে বাড়ীতে নামিয়ে দিয়ে পিসিকে বলল, তোমার মেয়েকে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেলাম। অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিল খুঁজে পেয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এলাম। দেখ আবার যেন হারিয়ে না যায়। সে যে কি তীব্র অপমান তুমি হয়তো বুঝবেনা। অশ্রুকণা বলে চলে আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুল না, পিসি বার বার বলল, কতদিন আসিস না, একটুখানি বসে যা প্রান্তিক। বলল, আজ না কাল। সেই কাল আজ সেলিনা। থাকতে চাইনি। দাঁড়াতে চাইনি প্রান্তিকের সামনে, আবার কি অপমান করবে কে জানে। কিন্তু পিসির অনুরোধে থেকে যেতে হল শুধু নয়, যে রান্না জানিনা, কোনদিনই করিনি, তারই দায়িত্ব গ্রহণ করতে হল। কোন দুঃখ ছিল না সেলিনা যদি প্রান্তিক অপমান না করতো। কি দরকার ছিল, তারই পয়সায় কেনা, তার প্রিয় ফুলগুলোকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়ার? আমার সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না এই তো। বলতে পারতো সে কথা। বা একথাও বলতে পারতো যে, এ বাড়ীতে তার একটা পূর্ণ অধিকার আছে। আমার জন্য সে অধিকার থেকে সে বঞ্চিত হবে কেন? আর আমিই বা তাকে বঞ্চিত করব কোন অধিকারে? না সেলিনা পারব না। একদিন তোমাকে বলেছিলাম তোমার মনে আছে কি না জানিনা, ওই অতি সাধারণ ছেলে কি অসাধারণ চৌম্বক আকর্ষণে যে আমাকে টানে, তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু না, ওর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। কোনদিনই আমার দুর্বলতার কাছে সে ধরা দেয়নি। তাইতো ওকে রেহানার হাতে সঁপে দিতে ভিতরটা কাঁপেনি। রেহানার অবর্তমানে আমার ভিতর জন্ম নিল যে নতুন স্বপ্ন, তা হয়তো স্বপ্নই থেকে যেতো, যদি না মিনতি পিসি, আমাকে, জোর বা দাবীর কথা অমন করে মনে না করাতেন। মা হয়েও মিনতি পিসি জানেন না প্রান্তিক কি চায়? অপমানটা আমার সেখানেই বেশী করে বাজছে। রেহানাকে জানি, কোনদিনই সে মুখ ফুটে কিছু চাইতে পারেনা, অথচ না চেয়েও হৃদয় তার কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। আর আমি কানা গলিতে হোঁচট খেলাম বার বার হোঁচট। একটা মেয়ে হয়েও, এই যে অপমান, আজ না বুঝলেও একদিন তুমি বুঝবে সেলিনা, কারণ আমি জানি, রেহানার থেকেও অনেক অনেক বেশী ভালবাস তুমি প্রান্তিককে। রেহানা যেখানে ভালবেসে একা পথে নামতে পারে তার ভালবাসার কি হবে এটা না জেনেও, তুমি তা পারবে না সেলিনা। তুমি উদ্দেশ্যহীন পথে ভেসে গিয়ে আরেক জনের কি হবে তানিয়ে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। তোমার ভালবাসার বর্মে তুমি তাকে ঢেকে রাখতে চাইবে। কোন ভাবেই তুমি পারবে না তোমার ঈপ্সিতকে অন্যের হাতে তুলে দিতে। তোমাকে যতটুকু বুঝেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে তুমি ভালবাসবে, ঝগড়া করবে, অভিমান করবে, কথা বন্ধ করে দেবে, কিন্তু তাকে ছেড়ে থাকতে পারবেনা। তোমার প্রলম্বিত ছায়ার নীচে একদিন তাকে আসতেই হবে, এই বিশ্বাসে তোমার পথ চলা। তুমি রেহানা নও, তাই পথেই তুমি ঠিকানা খুঁজে নিতে চাও না, তুমি চাও পথ চলা যেন শেষ হয়, তোমার হৃদয় মন্দিরে এসে। তাকে ফেরাতে প্রয়োজন হলে তুমি আঘাত দেবে, চরম অভিমানে তুমি মুখ ফিরিয়ে নেবে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রতীক্ষায় থাকবে এই বুঝি এলো সে। হঠাৎ সে আসতে পারে, এই বিশ্বাসে, খোলা রাখবে তোমার দরজা, খুলে দেবে দখিন ও পূবের জানালা, একটা দিয়ে ঢুকবে ভোরের বাতাস, আরেকটায় লাল সূর্যের আভা।
