মিনতি সেনের বাড়ী এসে, ব্যাগটা কোন ভাবে টেবিলের ওপর রেখে ও বাথরুমে ঢুকে গেল। মিনতি সেন বললেন, কি হল প্রান্তিক, ওর শরীর খারাপ নয়তো। কখন বেরিয়েছিস? এইতো ঘন্টা দেড়েক আগে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল সেলিনা। মিনতি সেনকে প্রণাম করে বলল, কেমন আছ পিসি? ভাল। তোর মা কেমন আছে? ভালো। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল অশ্ৰুদিকে দেখছিনা, অশ্ৰুদি কোথায়? মিনতি সেন বললেন রান্না ঘরে, যানা ওর কাছে? এই যাই বলে নিজের ব্যাগটা নিয়েই ও রান্নাঘরে ঢুকে গেল, পিছন থেকে অশ্রুকণার চোখ বন্ধ করে বলল, বলত আমি কে? হঠাৎ না বলে কয়ে চোখ বন্ধ করাতে ও চমকে ওঠে, তারপর গলার স্বরে চিনতে পেরে বলে, রান্না করতে করতে যার কথা ভাবছিলাম, তুমি সেই এবার ছাড়তো মেয়ে! অশ্রুকণার চোখ ছেড়ে দিয়ে খিল খিল করে হেসে উঠলো সেলিনা, বলল মিথ্যে কথা অশ্রুদি, তুমি আমার কথা একবারের জন্যও ভাবোনি। অশ্রুকশা আঁচটা কমিয়ে দিয়ে ওর দিকে ফিরে বলল, ভাবিনি মানে, বিশ্বাস কর, প্রতিটি মুহূর্তে তোমার কথাই ভেবেছি, তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল, যার জন্য সেলিনার পক্ষে অবিশ্বাস করা সম্ভব হল না। বলল তোমার কথা বিশ্বাস করছি অশ্রুদি। কিন্তু তোমার এ অবস্থা কেন? কি হয়েছে তোমার! না কিছু হয়নিতো। তারপর আঁচটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, তুমি ভিতরের ঘরে যাও সেলিনা, আমার হয়ে গেয়ে প্রায়। হোক এক সঙ্গেই যাব। বাঃ তুমি এসেই রান্নাঘরে ঢুকলে ওরা কি ভাববে? কেউ কিছু ভাববে না। তাছাড়া পিসি তো আমাকে তোমার কাছেই পাঠালেন। তারপর বলল তুমি যাও সেলিনা, আমি আসছি। আমি থাকলে তোমার রান্নায় অসুবিধা হবে, না? তোমার রান্নার নিয়ম কানুন শিখে ফেলি কি না তার জন্য তাড়াতে চাও। অশ্রুকণা হেসে ফেলে বলে, না ভাই তোমার সঙ্গে পারা যাবে না। পেরে কাজও-নেই অশ্ৰুদি, জীবনে তো আর আমার সঙ্গে ঘর করবেনা যে আমার সঙ্গে পারতে হবে। কিন্তু যার সঙ্গে ঘর করবে বলে সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছে তার সঙ্গে পারবে তো। চোখে দুষ্টু হাসি ঝিলিক মেরে যায় সেলিনার। কিন্তু সেলিনার এই ঠাট্টাও অশ্রুকণার মনে কোন নাড়া দেয় না। সে চুপ করে থেকে রান্না করতে লাগল। সেলিনা বলল কি হল অশ্ৰুদি, তোমার মনের মানুষকে নিয়ে অন্যদের ঠাট্টার অধিকারটুকুও কেড়ে নিতে চাও নাকি! অশ্রুকণা আবারও আঁচটা কামিয়ে দিয়ে সেলিনার দিকে ফিরে বলল, কেন এরকম অসম্ভব ঠাট্টা কর সেলিনা। কার জন্য আমি ঘর ছেড়ে এসেছি, কে আমার মনের মানুষ। অশ্রুকণার এই হঠাৎ প্রতিবাদে অবাক হয়ে যায় সেলিনা। বলে, আমি জানিনা অশ্রুদি এতদিনে তোমার মনের কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা। আমি জানিনা, সত্যি তুমি কেন চলে এসেছে। না জেনে তোমায় যদি সত্যি আঘাত দিয়ে থাকি, তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। অশ্রুকণা ওকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল, কি সেলিনা, তুমি তো সত্যি কিছুই জান না। বলে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে, উনুনের আঁচটা বাড়িয়ে রান্নায় মনসংযোগ করে অশ্রুকণা। সেলিনা বলল একটা কথা বলব অশ্ৰুদি? বল। কি হয়েছে তোমার? না কিছুই হয়নি তো। কিছুই যদি না হবে, তা হলে আজকের তুমি আর সেদিনের তুমির মধ্যে এত ফারাক কেন? সেতো সেলিনা, তোমার মধ্যেও সে ফারাক রয়েছে। হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু তার মধ্যে নিশ্চই কারণ আছে? কি কারণ। সব থেকে বড় কারণ অশ্রুদি, রেহানার ঐ ভাবে চলে যাওয়া। আমার মায়ের মৃত্যু, এবং তারপর তার ইচ্ছেনুসারে আমার নিজের মতামতকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। শুধু এই, আর কিছু নেই? সেলিনা বলল, জানিনা আর কিছু বলতে তুমি কি মীন করছ। তবে বয়সের সাথে সাথেতো অনেক কিছু পরিবর্তন হয় অদি। একদিন হয়ত মনে হতো আমার আচরণে কোন দোষ নেই, কিন্তু এখন আর তা মনে হয় না। এখন প্রতিটি আচরণকে মেপে চলতে হয়, পাছে লোকে কিছু ভাবে। যাকগে সে কথা, তোমার আর কত দেরি হয়ে গেছে তুমি একটা কাজ কর সেলিনা, কফিটা হয়ে গেছে পিসি ও প্রান্তিককে দিয়ে এসো না। বাঃ শুধু ওদের জন্য ক্লফি হবে, আর আমাদের হবে না? তুমি আর আমি এখানে বসেই খাবো। ওদের মা-ছেলের সঙ্গে বহুদিন পরে দেখা, মান-অভিমান ছাড়াও নিজেদের কত কথাই থাকতে পারে। কি দরকার তার ব্যঘাত ঘটিয়ে। কি জানি কি ভাবল সেলিনা। বলল, এতো তোমার স্বাভাবিক কথা নয় অশ্ৰুদি, কি হয়েছে আমায় বলবে না? জানিনা তোমার কোন উপকার করতে পারবে কি না, কিন্তু আমি আমার সহানুভূতিতে জানাতে পারবো। একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে অশ্রুকণা বলল, থাক ওসব কথা। আমার ভাগ্যের জন্য তো আমি দায়ী, তাকে তো কেউ গড়ে দিতে পারবে না। এরপর প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল, রেহানার কোন সংবাদ পেলে? অবাক হয়ে সেলিনা বলল, রেহানার সংবাদ পেলে তুমি তা জানবে না, এ আবার কবে থেকে ভাবতে আরম্ভ করলে অশ্রুদি! তারপর নিজেই বলল, প্রান্তিক ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বুঝি? বিষয়টাকে হালকা করার জন্য বলল ঝগড়া হলে আনকোরা হাতে রান্না করতাম না। সেলিনা বলল, ঝগড়ার সঙ্গে রান্নার কোন সম্পর্ক নেই, আর রান্নাতো তুমি নিজের ইচ্ছেয় করছ না, পিসির শরীর খারাপ আর জবার মা আসেনি তাই। কি জানি, বলে প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে সেলিনাকে তাড়া লাগিয়ে বলল যাও সেলিনা এটা দিয়ে এস না। দাও বলে সেলিনা কফি এবং তার সঙ্গে টিফিন খাওয়ার জন্য অশ্রুকণা যা তৈরি করেছে তাই নিয়ে মিনতি সেনের ঘরে আসে। ঐ ঘরে বসেই তখন আমি মিনতি সেনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। মিনতি সেনের শেষ কথা শুনে ফেলে সেলিনা। মিনতি সেন বলছিলেন, তাহলে ঐ কথা রইল প্রান্তিক, তুই কাল একবার যাবি ওখানে। কাগজে ওরা বিজ্ঞাপন দিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটি কি, বিজ্ঞাপন কি তোক দেখানো না সত্যিকারের ভালো ছেলে মেয়েদের ওরা মেধার ভিত্তিতে নিতে চায় ঠিকই তবে একটু বাজিয়ে। আমি বললাম, কিন্তু তোমার কথা যদি জিজ্ঞাসা করে কি বলব? কিছু বলতে হবে না। মানে? মানে তোর ভয় নেই, যে পরিচয় তুই আমাকে দিলি, তাতে তোকে তুই নিজে জিজ্ঞাসা না করলে, কোন কিছু বলবে না। আমি বললাম এই যে দেখা হওয়ার পরেও তোমার কথা যদি কিছু জানতে না চান, তোমার কষ্ট হবে না মা! পাগল ছেলের কথা দেখ। আমিতো মা! এক তুই যদি কষ্ট না দিস তাহলে আমার কিসের কষ্ট? আর তা ছাড়া যার কথা তুই বলছিস, সেতো তার অন্তরের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আমার অহংকারকে, মৰ্য্যাদা জানিয়েছেন আমার মাতৃত্বকে, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রতিমুহূর্তে পাশে থাকার। একটি মেয়ের কাছে এর থেকে তো আর বেশী কিছু পাওয়ার নেই। আমি তবু বললাম, সব জেনেও জানতে চাইছি এতে তোমার একটুও কষ্ট হবে না? পাগল ছেলে কোথাকার। এরপর আমাকে তার কোলের পরে টেনে নিয়ে বললেন, তুই শুধু আমায় কোন আঘাত দিসনা, আমি কষ্ট পেতে পারি এমন কিছু করিসনে। তাহলে কোন কষ্টই আমার কাছে কষ্ট বলে মনে হবে না।
