পরের দিন অশ্রুকণা বলল, আপনার ছেলে আসবে, আমি থাকলে ওর অস্বস্তি হবে, আমি বরং ঘুরে আসি। কোথায় যাবি? দেখি অনুতপা বাড়ী আছে কি না যদি না থাকে, তাহলে ন্যাশানাল লাইব্রেরী থেতে ঘুরে আসব। অনেকদিন লাইব্রেরীতে যাওয়া হয় না। মিনতি সেন বললেন তুই চাস না, ও আসুক আমার কাছে? পিসি! কণ্ঠে ওর অনুতাপের ছোঁয়া। আমি কি তাই বলেছি? না তা বলিসনি, কিন্তু বলতো অশ্রু, সেই কবে কি এক তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে চলে গেল, আর এলো না, এর মাঝে কি ভাবে তোর সাথে দেখা হয়েছে, আর কোথায় হারিয়ে গিয়ে ছিলি কিছুই জানিনা। কতদিন পরে এলোও যেমন বেরিয়েও গেল তেমনি ঝড়ের মত। যদি বা বলল আজ আসবে, তুই পালাতে চাইছিস। তার মানে আর কোনদিন হয়তো আসবে না। তুই কি চাস ও যেন না আসে?
১২. অশ্রুকণা বোকা নয়
অশ্রুকণা বোকা নয়, এ আঘাত যে কত বড় তা সে বোঝে। আবার এও বোঝে, মিনতি সেনের মাতৃত্বের হাহাকার। সত্যিই তো। আমি আমার খেয়ালে নিজের ভাগ্যকে এখানে নিয়ে এসেছি। এ দোষ আমার। মিনতি সেন আমাকে থাকতে দিয়েছেন, তাই বলে প্রতিদানে আমি তার সব কিছু কেড়ে নেবো এ হয় না। বললাম, না পিসি আমি সেভাবে বলিনি। দেখলেন না কেমন ব্যবহার করে চলে গেল। আজও যদি আবার আমাকে দেখে এমনি ভাবে চলে যায়। নিজেকে ক্ষমা করব কি করে? তাই বলছিলাম, তাকে থামিয়ে দিয়ে মিনতি সেন বললেন, থাক তোকে আর বলতে হবে না, যা বলার আমিই বলব। বরং আজকের রান্নাটা তুই করনা মা! আমি? কেন পারবি না? কোনদিন তো করিনি। নাইবা করলি, আজকেই না হয় হাতে খড়ি হোক।
আমি এলাম বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার ঠিক আগে। সেলিনার বায়না, সেও আসবে আমার সঙ্গে পিসি বললেন ও যখন যেতে চাইছে, তখন ওকে নিয়ে যাও প্রান্তিক। আমি খুব একটা না করতে পারলাম না। রাস্তায় বেরিয়ে ও বলল, আমাকে নিয়ে যেতে তোমার আপত্তি আছে? কতদিন দেখিনা পিসিকে। অদির সঙ্গে দেখা হয় না অনেক দিন। তাইতো আসতে এত জোর করলাম। আমি বললাম, তোমার যখন ওদের দেখতে ইচ্ছে করছে, তুমিতো এক দিন নিজেও যেতে পারতে। তা হলে ফিরে যাই। হ্যাঁ তাতো যাবেই, তা না হলে আর আমাকে অপমান করার মোলকলা পূর্ণ হবে কেন? সব ব্যপারে তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন? আমি গেলে সত্যিই কি তোমার কোন অসুবিধা হবে? তুমি কি বলতে চাইছে, বলত? আমি যা বলতে চাইছি তাতে তোমার না বোঝার কথা নয়। অশ্ৰুদি কি আমায় তোমার সাথে দেখলে অস্বস্তি বোধ করবেন? ভীষণ রাগ হয়ে গেল ওর উপর, বললাম, সেলিনা, ভুলে যাচ্ছ কেন, আগে তোমার যাই পরিচিতি থাকুকনা কেন, এখন তুমি নীলাঞ্জনা পিসির মেয়ে, আর তিনি আমার পিসি। এতটা রেগে যাব বোধ হয় ভাবতে পারেনি সেলিনা। বলল, জানি, আর এও জানি, তুমি তা মানতে চাওনা। মানে? মানে তোমাকে তুমি নিজেই জিজ্ঞাসা কর।
বুঝতে পারছি সেলিনা সেদিন রাতের সেই আবেগ দুর্বলতার কথার দিকে ইঙ্গিত করছে। আমরা যখন শিয়ালদা স্টেশানে এসেছি একটা ফুলের দোকানে এসে থেমে গেল সেলিনা। বলল, দেখ কি অপূর্ব যুঁই ফুলের মালা, কিনব? তোমার পছন্দ? ভীষণ! আচ্ছা কেন তাহলে। কোন মালাটা কিনবো! যেটা তোমার পছন্দ! তোমার পছন্দ নেই? আমার একটাও পছন্দ নয়। দোকানদার বলল, সে কি বাবু এত সুন্দর সুন্দর মালা আপনার পছন্দ নয়? সেলিনা বলল থাক কিনতে হবে না! কেন? তোমার পছন্দ কোনটা বল না? আমারও পছন্দ নয় একটাও। চল, এখানে দেরি না করলে আগের ট্রেনটা পেয়ে যাব। আমি বললাম, বিনা কারণে রাগ করছ সেলিনা। ঠিক আছে আমিই পছন্দ করছি। তারপর ভালো দেখে একটা মালা পছন্দ করলাম, আমি দাম দিতে যাব, সেলিনা বলল, একটা নয় প্রান্তিক ভাই দুটো কেননা! কেন দুটো দিয়ে কি করবে। কেনই না। অবশেষে দরদাম করে দুটো মালা কিনলাম, ভালো করে প্যাকেট করে ওর হাতে দিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বললাম, রাতে কাউকে পরাবে বুঝি! লজ্জায় ওর কান লাল হয়ে উঠলো। কিন্তু সামলে নিয়ে বলল, দেখি যদি কেউ আসে। মালার প্যাকেটটা সেলিনা, তার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। আমরা গাড়ীতে উঠে পড়লাম। গাড়ীতে অসম্ভব ভিড়। ভিড়ের মধ্যে চাপা পড়ে ও আমার কাছ থেকে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল, আমি বললাম, স্টেশনে ঢোকার আগেই নেমে পড়ার জন্য এগিয়ে এস, ও বলল আচ্ছা।
ঢাকুরিয়া স্টেশনে যখন আমরা নামলাম, সে প্রায় সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ভিড়ের চাপে ওর শাড়ীর আঁজ কুচকে একাকার। কপালের টিপ যে কার হাতের ঘসায় কোথায় চলে গেছে কে জানে! আঁচলের নীচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে, সেলিনার ব্লাউজের উপরের বোতামটা খুলে গেছে কখন। সে দিকে ওর খেয়াল নেই। নামতে যে পেরেছে এইটাই যথেষ্ট। আমি দেখেও কিছু বলতে পারছি না।
কোন ভাবে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে রিক্সায় উঠলাম। ও বলল এইটুকু রাস্তাতে হেঁটেই যেতে পারতাম। হ্যাঁ, তা পারতাম। কিন্তু ধাক্কাধাক্কিতে এত ক্লান্তি লাগছে যে আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। ও প্রতিবাদ করে বলল তার থেকে বল না আমার সঙ্গে হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। আমি বললাম দুটোই সত্য। ও রেগে গিয়ে বলল, তা হলে তুমি রিক্সায় যাও, আমি হেঁটে যাচ্ছি। আমি বললাম সেই ভাল, তবে হেঁটে যাওয়ার আগে ভিড়ে কোচকানো শাড়ীর আঁচলটা ঠিক করে নিও, পথচারীদের দৃষ্টিকটু লাগতে পারে। কথার পিঠে কথা বলা ওর স্বভাব। বলল, তোমার দৃষ্টিকটু না লাগলেই হলো। মুখে যাই বলুকনা কেন, দৃষ্টি কিন্তু ফিরালো বুকের আঁচলের দিকে। আর নিজের অবস্থা যে সে বুঝতে পারেনি এর জন্য ওর নিজের পরে রাগে চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করতে লাগল। কিন্তু বোতামটাই যে ছিঁড়ে গেছে। কি করবে। শাড়ীর আঁচলটাই যথা সম্ভব বুকের পরে ভাজ দিয়ে দিল, আর নিজের চোখ দুটি রাখল পায়ের দিকে আলতো করে। বললাম, তাহলে রিক্সায় যাবে না হেঁটে যাবে। ও আমার কোন উত্তর না দিয়ে রিক্সায়ালাকে তাড়া দিয়ে বলল, একটু তাড়াতাড়ি কর ভাই।
