অভিমানে ঠোঁট ফোলায় অশ্রুকণা বলে, আমি যে সবকিছু ছেড়ে চলে এসেছি তোমার জন্য প্রান্তিক! এ তুমি ভুল করেছে কণা। যদি ভুলও করে থাকি, আমার যে ফেরার কোন পথ নেই। নীরবে একটা হাত তুলে নিয়ে বলে, বিশ্বাস কর, আজ যদি রেহানা থাকতো, আমি তোমার জীবন থেকে সরে যেতাম, কোন ভাবেই তোমাকে আমি বিব্রত করতাম না। আমি জানি, রেহানার জন্য তোমার কষ্টটা কত। আর সব চেয়ে বড় কষ্ট, এই ভাবে তার চলে যাওয়া। সামনে গঙ্গা বয়ে চলেছে, চটি খুলে পা দুটো জোয়ারের জলে ভিজিয়ে দিয়ে বললাম জানিনা, আজ রেহানার জন্য কোন কষ্ট হয় কি না। রেহানা যদি আমাকে বলে যেতো, অথবা রেহানা যদি বলতো, আমি যা বলেছি সব ভুল, তোমার জন্য রেহানার কোন দরদ নেই, হয়তো প্রথম প্রথম কষ্ট হতো কিন্তু তারপর এক সময় ঠিক হয়ে যেতো। মনকে সান্ত্বনা দিতম, রেহানা অন্তত দ্বিচারিতা করেনি।
রেহানা যদি অন্য কাউকে ভালবেসে চলে যেতো মনকে বোঝাতে পারতাম, নিজের জীবনের সুখ কিনে নেওয়ার অধিকার তার আছে, কিন্তু একি সে করল, আজ কতদিন হয়ে গেল না এলো সে, না এলো তার কোন সংবাদ।
অশ্রুকণা চোখ তুলে তাকালো আমার দিকে। একদিন তো তার হাতে তোমাকে তুলে দিয়ে আমি সরে গিয়েছিলাম। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ কণা! কৃতজ্ঞ মানে? মানে কিছু নেই, কিন্তু সে কথা থাক। তোমাকে একটা কথা বলব কণা? বল। জীবনের মানে তুমি এই ভাবে খুঁজতে চেয়েছে কেন? কেমন ভাবে! এই যে ভাবে, নিজের জীবনকে তুমি তিল তিল করে ক্ষয়ের পথে নিয়ে যাচ্ছ, ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছ, কি পাবে এর দ্বারা? যদি বুঝতাম কি পাব যদি লাভ লোকসানের হিসাব কষতাম, তাহলে হয়তো উত্তর দিতে পারতাম। আমিতো লাভলোকসানের হিসাব নিয়ে তোমার কাছে আসতে চাইনি, আমি শুধু চেয়েছি, তোমার শূন্যতাকে বুঝতে! যে ভাবে বুঝতে চাইছে সে ভাবে কি পারবে বুঝতে? জানিনা পাব কিনা, তবু তোমাকে বুঝতে চাইবো, রেহানার না ফেরা পর্যন্ত। তারপর বলল, তোমাকে কথা দিচ্ছি প্রান্তিক, রেহানা যদি ফিরে আসে, বা তার খোঁজ পাই, তার হাতেই তোমাকে সঁপে দিয়ে আমি ফিরে যাবো। কোথায়? তাতো জানিনা, তবে তোমায় বিড়ম্বনায় ফেলব না, এ প্রতিশ্রুতি তোমায় আমি দিচ্ছি। জীবনকে কি তুমি খেলার পুতুল মনে কর কণা? জীবনতো খেলারই পুতুল। না এ তোমার ভুল, ইচ্ছে হলেই খেলার পুতুল ভেঙে দেওয়া যায়, কিন্তু ইচ্ছে হলেই কি জীবনকে ভেঙে দেওয়া যায়? যায় না। তাই তোমাকে বার বার বলছি, এই ভাবে জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেল না কণা।
গভীর অভিমামে হৃদয়টা ওর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, আর তারই ফলে বুকের ওঠানামাটা সাগরের তরঙ্গমালার মত এই ভাসছে এই ডুবছে। হয়তো আমি হারিয়ে যাব ঐ তরঙ্গ মালায়। ভয় হচ্ছে এখনি বুঝি ডুবে যাব আমি। বললাম, দেখ সূর্য ডুবে গেছে, এখনি গভীর আঁধার নেমে আসবে এই গঙ্গার বুকে, সেই অন্ধকারে হয়তো পথ খুঁজে পাবো না, চল ওঠা যাক। ও বলল, হারিয়ে যেতে তোমার খুব ভয় তাই না? তোমার ভয় নেই? না। কেন ভয় থাকবে, আমিতো হারাতে চাই। একবার শুধু একবারের জন্য আমাকে হারাতে সাহায্য করে। কণা। বল। এ ভাবে আমায় দুর্বল করে দিওনা! আমাকে সাহস দাও, বাঁচতে দাও নিঃশ্বাস নিয়ে।
আমাকে ছেড়ে দিয়ে হেসে উঠল ও, না। তোমার মনের জঙ্গলে এমন কোন গহন অন্ধকার নেই, যেখানে হারিয়ে গেলে আর পথ খুঁজে পাবনা, তার থেকে চল ওঠা যাক। চল। আমরা উঠে এলাম গঙ্গার ঘাট থেকে।
হাঁটতে লাগলাম গড়ের মাঠের ভেতর দিয়ে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় ভিক্টোরিয়ার সামনে এসে যখন থামলাম, সামনে এসে দাঁড়ালো এক ফুলওয়ালী। ফুল নেবেন না বাবু? অশ্রুকণা তাকালে আমার দিকে, তারপর ফুলওয়ালীকে বলল, কি হবে ফুল দিয়ে? আমি ওকে বাধা দিয়ে ফুলওয়ালীকে বললাম, মালা নেই, যুঁই ফুলের মালা! না বাবু শেষ হয়ে গেছে। তাহলে কি আছে? ভালো গোলাপ আছে নেবেন বাবু? অশ্রুকণা বলল, তুমি চল প্রান্তিক, রাত হয়ে যাচ্ছে। বললাম দাঁড়াওনা। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে বললাম, তোমার গোলাপ কত করে? বলল, এক টাকা ডজন। বেশ এক ডজন দাও। আমি গোলাপ নিয়ে ফিরে এলাম অশ্রুকণার কাছে। বললাম, আমার কাছে এসোতো। কেন? কেন আবার কি, যেখানে যা শোভা পায় তাকেতো সেখানে রাখতে হবে। ও বাধা দিয়ে বলল, না প্রান্তিক, এ ভাবে সাজতে আমার ভাল লাগেনা। ভাল লাগেনা? না, একদম ভালো লাগেনা। আমারও ভাল লাগেনা, বলে, সমস্ত ফুলগুলো কুটি কুটি করে ছিঁড়ে ছড়িয়ে দিলাম রাস্তার চারিদিকে। আমার ঐ কাণ্ড দেখে ও অবাক হয়ে বলল, এ তুমি কি করলে প্রান্তিক! যা করা উচিত তাই করেছি, তারপর একটা চলতি ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে উঠে পড়লাম, সোজা মিনতি সেনের বাড়ী। পথে একটিও কথা বলিনি ওর সাথে। ও-ও বলেনি। মিনতি সেনকে বললাম, মা, তোমার মেয়েকে দিয়ে গেলাম। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছিল অনেক কষ্টে খুঁজে এনে তোমার কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেলাম। দেখ, আবার যেন পথ হারিয়ে না ফেলে, বলে আর কোন অপেক্ষায় না থেকে বেরিয়ে পড়লাম। মিনতি সেন ডাকলেন প্রান্তিক শোন! বল? অনেক দিন আসিস না, একটু বোস না, কতদিন তোকে দেখিনা! আজ না মা, ভীষণ তাড়া আছে, কাল আসব।
