প্রান্তিক এসে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে, বলল, চলনা পিসি তুমিও। নীলাঞ্জনা বললেন, নারে প্রান্তিক, তোমরাই যাও। আমার কাজ আছে। সেলিনাকে বললাম, আকাশ লাল হয়ে গেছে, আযানের সুর শেষ, এখনি হয়তো কাঁসর ঘন্টা বেজে উঠবে মন্দিরে মন্দিরে, তাড়াতাড়ি চল। সেলিনা বলল চল। আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম।
এতদিন প্রমথ বাবু জানতে পারেনি, অশ্রুকণা মিনতি সেনের বাড়ীতে আছে। অনুতপাই সংবাদটি দিয়েছিল। এসেছিলেন একদিন স্নেহময়ী দেবী ও প্রমথবাবু। মিনতি সেন, তাদের আপ্যায়ন করে ঘরে নিয়ে এলেন। এ কয় দিনে চেহারা অনেকটা ভেঙে গেছে ওঁদের। মিনতি সেনের কাছে কাতর আবেদন জানালেন, আমাদের একমাত্র মেয়ে, ওকে আমাদের সঙ্গে ফিরে যেতে বলুন।
ওরা এসেছেন জেনেও অশ্রুকণা আসেনি ওঁদের কাছে। মিনতি সেন বললেন, কেন পাগলামি করছিস অশ্রু, বাব-মায়ের কষ্টটা একটু বোঝবার চেষ্টা কর। ফিরে যা ওদের সঙ্গে, ওর সেই এক কথা, না পিসি, আপনার যদি অসুবিধা হয় আমিই চলে যাব, তবু যে বাড়ী ছেড়ে এসেছি, আর সেখানে ফিরে যাব না। আপনি ওদের চলে যেতে বলুন। কথাগুলো মোটই আস্তে বলেনি অশ্রুকণা। সবই শুনতে পেয়েছেন ওর বাবা ও মা। ব্যর্থ হয়ে যখন মিনতি সেন ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রমথবাবু বললেন, না আপনাকে কিছু বলতে হবে না মিনতি দেবী। যা শোনার আমরা শুনে নিয়েছি। বাবা মা হওয়া যে কি কষ্টের আপনাকে বোঝাতে পারবো না, তবু আপনার কাছে আমার একমাত্র অনুরোধ, ওকে আপনি দেখবেন। উঠে পড়েন প্রমথবাবু এবং স্নেহময়ী দেবী। স্নেহময়ী দেবী শুধু একবার বললেন, একবার শুধু চোখের দেখা দেখব কোন কথা বলব না, কিছু জানতেও চাইবো না। চোখ ফেটে জল আসতে চাইলেও কাঁদব না, শুধু একবার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াক ও, তারপর চলে যাব, আর কোনদিন আসব না বিরক্ত করতে।
না মিনতি সেনকে এ অনুরোধ করতে হয় নি। অশ্রুকণা নিজেই এসে দাঁড়িয়েছে ওদের সামনে। তারপর বলেছে, দেখাতে হয়েছে, আর কোন দিন আসবে না আমার কাছে, আমার খোঁজও নেবে না। তোমাদের কোন কিছুর পরে আমার কোন লোভ নেই। ইচ্ছে করলে তোমাদের অতুল ঐশ্বৰ্য যাকে খুশী দিয়ে যেতে পারো। কথাগুলো বলে, যেমন এসেছিল তেমনি ঢুকে গেল ভিতরে, যেন একটা দমকা বাতাস এল এবং মিলিয়ে গেল।
জীবন নাট্যের যবনিকাপাত যে কিভাবে হয় কেউ তা জানে না। আসলে আমরা যে খেলার পুতুল মাত্র সে কথাই ভুলে যাই। আমাদের নিজেদের পরে অধিকার যে কত ভঙ্গুর তা যদি জানতাম, অনেক অহংবোধ থেকে মুক্ত হতে পারতাম। মিনতি সেন বললেন, এ তুই কি করলি অশ্রু, এভাবে কেউ বাবা-মাকে আঘাত দেয়? অশ্রুকণা উত্তরে বলে, আঘাত যে ওদের পেতেই হবে পিসি। কেন? বিনা কারণে কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইলে, সেই কাঠগড়ায় আগে নিজেদের দাঁড়াতেই হয় এটা তাদের জানা দরকার। কেন তুই বিনা কারণে এ সব কথা বলছিস? তোর কি কোন দোষ নেই? আমি তো আমার দোষকে অস্বীকার করছি না পিসি। আমাকে যে কোন কথা বলার, আমাকে বিনা কারণে শাস্তি দেওয়ারও হয়তো ওদের অধিকার আছে, কিন্তু তাই বলে যার কোন দোষ নেই, যে কেবল তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে যথাসাধ্য করেছে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কোন ভাবেই মেনে নিতে পারব না পিসি। বুঝতে পারছি তোর মনের অবস্থা। কিন্তু তোকেও ভো বুঝতে হবে ওদের মন, ওরা কি চান? ওদের কোথায় ব্যথা। ওদের ব্যথাকে, আপনি যতটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন, আমার ব্যথাকে কি সেই ভাবে ভাবছেন? কেমন করে বুঝলি যে তোর কথা আমি ভাবছি না। যদি ভাবতেন তাহলে একটা কিছু করতেন এতদিন। কি করতাম বল! অশ্রুকণা বলল আমিতো প্রথম দিনই বলেছিলাম পিসি, যত ছোট হোক আমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিন। হাসলেন মিনতি সেন, বললেন, একটি চাকরি পেলে তোর সব কষ্ট যন্ত্রণা মিটে যাবে? যা তুই চাস সব পেয়ে যাবি? পারবি ভুলে যেতে প্রান্তিককে? এভাবে বলছেন কেন পিসি। প্রান্তিককে ভোলা না ভোলা সে তো সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। আমি ভুলে গেলাম কি গেলাম না তাতে তো কারো কিছু যায় আসে না।
তাই বুঝি বেরিয়ে এসেছিস ঘর থেকে? তারপরে বললেন, সত্যি করে বলতো, পারবি হাসিমুখে প্রান্তিককে অন্য কারো হাতে তুলে দিতে? এসব কথা থাক পিসি। কেন থাকবে কেন? তোর চাওয়ার ওপর তোর কোন অধিকার নেই? অধিকারতো এভাবে পাওয়া যায় না। আমাকে তো বুঝতে হবে যে অধিকারের বড়াই আমি করছি, তার ওজন আছে কি না। মানে? আপনিও যদি মানে না বোঝেন তাহলে আমার কিছু বলার নেই পিসি। তোরা সবাই বড্ড হেয়ালী কথা বলিস। আসলে তোরা সোজাসুজি কথা বলতে পারিস না তার কারণ, তোরা জানিসই না তোরা কি চাস? অশ্রুকণা বলল, আমি চাইলে পাব? পাওয়ার মত চাইলে, না পাওয়ার তো কোন কারণ নেই। মনে থাকবে পিসি। দেখব সত্যিকারের মনের জোর আমার আছে কি না?
অশ্রুকশার মনের জোর ছিল কি না জানি না, কিন্তু একদিন সে সত্যি সত্যি বলল, আমার ভিতরের সত্যটা তুমি কবে দেখতে পাবে প্রান্তিক? আমি চমকে উঠেও বললাম, আমার ভিতরের সত্য যেদিন আমি দিনের আলোর মত পরিস্কার দেখতে পাব। তার মানে? আসলে কি জান কণা, এত মানুষের সংস্পর্শে এসে তোমাদের এত ভালবাসা পেয়ে আমি নিজেই বুঝতে পারি না, সত্যি করে আমার ভিতরে কোন ভালবাসা আছে কি না। এ তোমার হেয়ালী, আসল কথাটা বল। আসল কথা তুমি জান না? কি? তারপরে অবশ্য বলল রেহানা ফিরে আসবে তোমার কাছে এই তো? ধর প্রান্তিক সে কোনদিন এলনা, এমন এক মুহূর্তে তুমি যদি নিজেকে বুঝতে পার, পিরবো কি সেদিন তোমাকে কিছু দিতে? দিতেই হবে, এমনকি কোন কথা আছে।
