আমি বললাম আর তুমি? আমার কথা থাক প্রান্তিক ভাই। রেহানার জায়গায় তুমি। আমাকে স্থান দিতে চেওনা, তাতে শুধু আমাকে অপমান করা হবে না, অপমান করবে তুমি আমার মা আফরোজ বেগমকে। আর সব থেকে অপমান করবে রেহানাকে। এ ভাবনা থেকে তুমি সরে এস প্রান্তিক ভাই। আমি বললাম তোমাকে আমি বুঝিনি কোন দিন, আজো বুঝতে পারলামনা। কিন্তু একটা কথা আমাকে দেবে সেলিনা? বল। যতদিন না রেহানা ফিরে আসে ততদিন তুমি থাকবে আমার পাশে। যদি তোমাদের দাবী মেটাতে অশ্রুকণাকেও জায়গা দিতে হয়, তবুও তুমি থাকবে আমার পাশে, বল থাকবে? কথা দাও সেলিনা।
শুনতে পাচ্ছি, অস্পষ্ট উচ্চারণে সেলিনা বলছে, হায় ঈশ্বর একি পরীক্ষা তুমি আমাকে দিয়ে করতে চাইছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও বলল, এ কঠিন পরীক্ষায় তুমি আমায় ফেলতে চাইছো কেন? যে দুর্বলতায় তুমি আজ ভাস্বর আমাকে পাশে রেখে, তুমি কি তা থেকে মুক্তি পাবে? না পাব না জানি আর সত্যি কথা বলতে কি মুক্তি তো আমি পেতে চাই না। অবাক হয়ে সেলিনা বলল, তা হলে? আমি চাই জ্বলতে। জ্বলতে জ্বলতে ভিতরটা আমার ছাই হয়ে যাক, আর আমার সেই জ্বালা তোমাকে জ্বালায় কি না তাই শুধু দেখতে চাই। তারপর বললাম, নিজেকে তুমিও অনেক বড় মনে কর সেলিনা। ভাব জ্বলতে যদি হয়ই, তবে তুমি একাই জ্বলবে। আমি তাই দেখতে চাই জ্বলার ক্ষমতা তোমার কতটা। তুমি যদি ভেবে থাক বক্সিংএর রিং এ আমাকে তুমি হারিয়ে দেব, হয়তো তা তুমি পারবে সেলিনা, কিন্তু জীবনের রিং এ তোমাকে আমি কিছুতেই জয়ী হতে দেবনা। দেখতে চাই। তোমার দৌড় কতটা। আমার কথা শুনে সেলিনা একেবারে নির্বাক হয়ে গেল। বলে কি প্রান্তিক? তবু, সেলিনা, রেহানা, অশ্রুকণা বা তপতী নয়, সে সেলিনা, তাই সে বলে, বেশ তাই হবে। তাতেই যদি তোমার ভিতরে আগুন নেভে, আমি রাজী। কিন্তু তোমাকেও কথা দিতে হবে প্রান্তিক ভাই, কি? আমার বুকে যত আগুনই জ্বলুক, কোন অবস্থাতেই তুমি তা নেভাতে চেষ্টা করবেনা, যদি তা কর, সেদিন থেকে কিন্তু আর আমাকে পাবেনা তোমার পাশে, সেদিন জানবে রেহানার মতো সেলিনাও হারিয়ে গেছে।
কি কঠোর এবং কঠিন শাস্তি! দেখতে পাচ্ছি বেরিয়ে যাচ্ছে সেলিনা, ভেজানো দরজা খুলে বাইরে পা দেবে, আমি আবার ডাকলাম সেলিনা! ও ঘুরে তাকালো আমার দিকে! বলল, বল! রাত কি সত্যি শেষ হয়ে গেছে? হ্যাঁ, ভোরের আযান ভেসে আসছে মজিদ থেকে। বললাম, একটু বোস। কেন? বোসনা। ও আমার সামনে এসে বসল। আমি পূর্ব দিকের জানালা খুলে দিলাম। ভোরের নরম বাতাস আবছা আঁধারে ধুসর হয়ে আছড়িয়ে পড়লো ঘরেব মধ্যে। আমি ওকে বসিয়ে রেখে বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে জল দিলাম, তারপর রাতের পোষাক বদলে এসে বললাম, যাবে আমার সাথে? কোথায়? একবার ভোরের রাজপথে তোমাকে পাশে নিয়ে হাঁটতে চাই? ও চমকে উঠে বলল, স্বপ্ন! না বাস্তর! বললাম দেখতে পাবে ল, ও বলল, দাঁড়াও প্রান্তিক ভাই, মাকে বলে আসি। পিসিতো ঘুমাচ্ছেন। জানিনা, তবু ঘুম থেকে উঠে যদি না দেখতে পান, চিন্তা করতে পারেন। আচ্ছা।
সেলিনা গিয়ে দেখ নীলাঞ্জনা তখনো না ঘুমিয়ে বসে আছেন। বলল তুমি ঘুমাওনি? ঘুম আসেনি। তুমি আমাকে ডেকে পাঠাওনি কেন? ইচ্ছে করেই। না ঘুমিয়ে তোমার যদি শরীর খারাপ করে? করলই বা, তোরাতত আছিস! সেলিনা যেন কি বলতে চেয়েও বলতে পারল না। ও ওর নিজের ঘরে ঢুকে গেল। তারপর সারারাতের বাসি পোক ছেড়ে অন্য পোষাকে নীলাঞ্জনার সামনে এসে দাঁড়ালো। কোথাও যাবি? প্রান্তিক ভাই ভোরে বেড়াতে নিয়ে যাবে বলছে, তুমিও চল না মা। নারে তোরা যা। অফিস আছে, কাজ আছে। সেলিনা বলল, তা হলে আসি। নীলাঞ্জনা বললেন, হ্যারে সেলিনা, এত কঠিন শাস্তি মাথা পেতে নিচ্ছিস কেন? লজ্জায় মুখে ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুল মুখে দিয়ে চুপ কর রইল সেলিনা। কি উত্তর দেবে। প্রতি রাতে একটি কথাই তাকে বলে নীলাঞ্জনা, তুই আবার হারিয়ে যাবিনা তো আমার জীবন থেকে? কোথায় যাব মা। তোমাদের ছেড়ে আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তা হলে তুই আমার স্বপ্নকে এভাবে ব্যর্থ করে দিচ্ছিস কেন? তা হয়না মা। কেন হয় না। তুই কি ভাবছিস আমি তোর মনের কথা জানি না? আমার মনের কথা সব নয় মা। আরেক জনকে তো আমাকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। আর তাছাড়া, রেহানার শূন্যস্থানে? না মা তা হয় না।
কিন্তু এখন কি বলবে, প্রান্তিকতো এগিয়ে এসেছে। এখন যদি নীলাঞ্জনাও আরো দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসেন কি উত্তর দেব? কিরে চুপ করে আছিস কেন? তারপর বললেন, তোরা বোধহয় আমার কথা ভাবসিনে, তাই না। মা এ তুমি কি বলছ? দেখ তোদের সব কথা আমি শুনেছি, হ্যাঁ শ্রুতিকণার কথা আমিও বলেছিলাম। তার কারণ, আমার বিশ্বাস ছিল রেহানাকে বাদ দিয়ে ও কোন দিনও অন্য কারো কথা ভাবতে পারবেনা। কিন্তু ও আমার মনের কথা নয়। কত ছোট কালে ওকে আদর করতাম। তারপর তো এলো একদিন আমার কাছে। যৌবনের দ্বার প্রান্তে এসে থাক সেদিনের সে সব কথা। দেখতে দেখতে আমার জীবনটাও কেমন যেন মরুভূমি হয়ে গেল একদিন, এর মাঝে তুই এলি মরুতৃষ্ণাকে কানায় কানায় ভরে দিয়ে। আমার জীবনে অতীত শুধু অতীত। আজ তোকেই নিয়ে আমার বাস্তব, তোকেই নিয়ে আমার স্বপ্ন। তোকে যে আমি কোন ভাবেই চোখের আড়াল করতে পারবো না মা। কেন আমাকে চোখের আড়াল করবে? তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। তাই কি হয় পাগলি মেয়ে। তারপর বললেন, এক যদি প্রান্তিকের কথায় রাজি হতিস তা হলে না হয় কথা ছিল, কিন্তু তার দেওয়া শাস্তিই শুধু মাথা পেতে নিলি, তাকে নিলি না। মা হয়ে আমার এসব ভাল লাগে? সেলিনা তখনো স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে আছে কি বলবে সে। নিজের জীবনের শূন্যতা? মায়ের স্বপ্ন! প্রান্তিকের আকষর্ণ সবইতো তাকে টানে তবু সে পারছে না কেন? যে হয়তো কোনদিনই আসবেনা, তারই জন্য জীবনের সব সাধ আহ্লাদকে বিসর্জন দিতে হবে? কিন্তু কেন?
