না কোন বাধা দিল না সেলিনা, শুধু চোখের জলে আমার বুকের জামা ভাসিয়ে দিল। আমি ওকে বুক থেকে তুলে নিয়ে বললাম, ছিঃ সেলিনা তুমি কাঁদছো? ও বলল আমাকে ছাড়, মা জেগে আছেন, আমি ওকে ছেড়ে দিলাম। ও ধীরে ধীরে পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসল, নিশ্চল নিঃশব্দ এক প্রতিমুৰ্ত্তি যেন।
নিজের কাছে নিজেরই খুব অস্বস্তি হচ্ছে। আমি এত দুর্বল তাতো আগে জানা ছিল। কি করে ভুলে গেলাম রেহানার উজাড় করা ভালবাসাকে। কি করে ভুলে গেলাম আফরোজ বেগমের সেই শেষ কথা গুলো, তোমার জীবনে রেহানার যে স্থান সে স্থানে, সেলিনাকে জায়গা দিতে বলছিনা বাবা। অথচ আমি? তাহলে কোথায় আমি আলাদা ডালিম থেকে? ও ওতো ভালবেসে ছিল রেহানাকে, কিন্তু চেয়েছিল সেলিনা তার হোক। আমিও তো তাই, সে লুণ্ঠনে যা পেতে চেয়েছিল আমি আত্ম নিবেদনের মাধ্যমে তাই পেতে চেয়েছি। মাধ্যম যাই হোক উদ্দেশ্য তো এক। সেলিনা কিছু না বলে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো বললাম চললে? হ্যাঁ। কিছু বলবেনা? আজ কিছু বলার নেই প্রান্তিক ভাই, তুমি এই মুহূর্তে ভীষণ ভীষণ দুর্বল। তুমি এখন ঘুমাও। আমি মাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। বললাম, আমি তো তা চাইনি, আমি চেয়েছি তোমাকে, জানি। তাহলে? তা হয় মা প্রান্তিক ভাই। এই মধ্য রাতের মুহূর্তের আবেগ প্রভাতের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যাবে দূর সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে। তখন তুমি না পারবে আমার চোখে চোখ মেলে তাকাতে, না পারবো আমি তোমার সামনে দাঁড়াতে। তার থেকে নিঃশব্দ আধারের ভেতর দিয়ে যে সত্যের আলোকে আমি তোমাকে দেখলাম, তোমার যে রূপ আমার মনে তার চিরস্থায়ী আসন গেড়েছে, বিলীন হয়ে যাক তা এই অন্ধকারের বেলাভূমে। এটাও স্মৃতি হয়ে যাক প্রান্তিক ভাই। এর বেশি কিছু আমি চাইনা। সেলিনা। এগিয়ে এসে আবারও ওর একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলাম। ও এবারও কোন বাধা দিল না শুধু বলল বল। তুমি কি আমায় বুঝতে চাইছো না? ও বলল আমার থেকে তোমাকে কেউ বেশী বোঝেনা প্রান্তিক ভাই। কিন্তু আমার জীবন নিয়ে যা কিছু করার বা বলার অধিকারতো শুধু তোমার আর মায়ের। তোমরা যা বলবে, অবাধ্য না হলে, আমি তাই করতে বাধ্য? বল কি করতে হবে? আমি চমকে উঠে দূরে সরে গিয়ে বললাম, তুমি এতদূর থেকে কথা বলছ কেন সেলিনা। মনে হয় সহস্র যোজন দূর থেকে তোমার কণ্ঠ ভেসে আসছে। ও বলল, এ তোমার ভুল ধারণা প্রান্তিক ভাই। আমিতো তোমার পাশেই আছি। তুমি শুধু চিনতে ভুল করছ? তাই হয়তো হবে। নিজের অহঙ্কারে আমি প্রতি মুহূর্তে ভেবেছি, আমি যেমন নিজেকে বুঝতে পারি এমন বুঝি কেউ পারে না। সেলিনা এবারও চুপ করে রইল। আমি বললম, তুমি কি কোন কথাই বলবেনা? ও বলল বল কি জানতে চাইছো? একদিন যে জোর বা অধিকার এবং দাবী ছিল তোমার আজ কি তা নেই। না নেই। কেন? সেদিনের যেকোন জোরের পিছনে আমি জানতাম, আমার কোন দুর্বলতাই তোমাকে স্পর্শ করবেনা, আমার আত্ম নিবেদন এবং ভালবাসা দিয়েও আমি তোমার নাগাল পাব না। তাই অবলীলায় বলতে পারতাম, বলুনতো এই পোষাকে কেমন লাগছে আমাকে। অথবা নিজে ফুল তুলে এনে আপনার হাতে দিয়ে বলতে পারতাম, দিনতো আমার বেনীতে গুঁজে, অথবা ফুলের বাগানে আপনাকে দেখে বলতে পারতাম সব থেকে সুন্দর ফুলে আমাকে সাজাতে ইচ্ছে করে না? আমার চোখের তীব্র আহ্বানকেও আপনি সেদিন অবহেলায় ফিরিয়ে দিতে পারতেন, তাই সেদিন যা সম্ভব ছিল আজ আর তা নেই। আজ আমি জানি, আমার সেদিনের ছেলেখেলা তোমার মনে আরেক ভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। আজ তুমি এক অন্য মানুষ দুর্বলতাই যার একমাত্র সত্য। না প্রান্তিক ভাই এ ভাবে তুমি আমাকে চেওনা, তাতে তুমি নিজে না পাবে মৰ্য্যাদা না পারবে আমাকে মৰ্য্যাদা দিতে তার চেয়ে অন্য কোন আশ্রয় খুঁজে নাও প্রান্তিক ভাই। আর আমাকে ফিরিয়ে দাও আমার অতীত।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, হয়তো তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু কেন এত দূর্বল হয়ে যাচ্ছি বলত সেলিনা? কেন মনে হচ্ছে আমার পাশে কেউ নেই, কেন এই মুহূর্তে বেশী করে মনে হচ্ছে আমাকে যদি সব থেকে কেউ বেশী আঘাত দিয়ে থাকে তবে সে রেহানা। কেন মনে হচ্ছে সে আর কোন দিনই আসবেনা আমার জীবনে। সেলিনা আস্তে আস্তে বলল, যে কারণটা তোমাকে আঘাত দিতে পারে আমি জানি। জান? হ্যাঁ জানি। বল না কারণটা কি? বললে হয়তো আমার অহংকারের কথা হয়ে যাবে তবু প্রান্তিক ভাই, যে কথা একটু আগে বলেছি, আমার থেকে বেশী করে তোমাকে কেউ বোঝেনা। তুমি কতটা বিশ্বাস করবে জানিনা, তবু একথা সত্যি যে আমি তোমাকে পেতে চেয়েছি আমার চঞ্চলতায় আমার চটুলতায় আমার চপলতায়, আবার কখনো বা আমার বক্সিং এর রিং এ। আবার একান্ত ভাললাগার অনুভূতির ভেতর দিয়েও তোমাকে যেমন করে কাছে পেতে চেয়েছি এক তপতীদি ছাড়া তেমন করে কেউ তোমাকে কাছে পেতে চায় নি এবং বুঝবারও চেষ্টা করেনি। তাই বলছি, যে দেবত্বের আবরণে নিজেকে তুমি আচ্ছাদিত করতে চেয়েছো, ওরা চেয়েছে সেই দেবতার পায়ে শ্রদ্ধা জানাতে, ভালবাসাকে তারা অর্ঘ্য হিসাবে অঞ্জলি দিতে চেয়েছে। চেয়েছে তোমার দেবত্বই বড় হোক মনুষ্যত্ব নয়। আমি চেয়েছি প্রতি মুহূর্তে তোমার মানবিক রূপ। কামনা বাসনাময় জীবন্ত মানুষ। ওরা চেয়েছে মনুষত্ব থেকে দেবত্বে তোমার উত্তরণ ঘটুক। কিন্তু আমি চাইনি। আমি সব সময় চেয়েছি তোমার মধ্যেকার সেই রক্তমাংসের মানুষটাকে যার দুঃখ আছে, বেদনা আছে, আছে জোর করে ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকার। তাই তোমার আজকের এই আচরণে কোন লজ্জা নেই। তুমি মানুষ এটাই তোমার আসল পরিচয়। তাই চেয়েছিলাম, রেহানা থাক তার ভক্তির অঞ্জলি নিয়ে, সে তোমার এই মনুষ্যত্ব রূপে দেখে হয়তো আঘাত পাবে, মনে হবে তার দেবতার এ পরিণতি অসহ্য। তোমার ভিতরের দুর্বলতাকে যে সে বোঝেনা তা নয়, তবু অবুঝমন, যে ভাবে স্বপ্ন দেখে, সে ভাবেই দেখতে চায় বাস্তবকে। রেহানার কাছে তুমি দেবতা হয়েই থাক, কিন্তু অশ্ৰুদির জন্য তোমার, মানবিকতাই জয়ী হোক, তুমি ওকে ফিরিয়ে দিওনা, মা বা পিসি অন্তত তাইই চায়।
