আমার যেন কিছুই বলার নেই। এরা নিজেরা যেমন রেহানাকে ভুলে যেতে চাইছে তেমনি আমার জীবন থেকেও মুছে দিতে চাইছে তার সমস্ত স্মৃতিটুকু। তোমরা তোমাদের নিজেদের মত করে কথা বলছ, আমাকে বুঝতে চাইছে না, দুঃখ এখানেই সেলিনা। কেন তোমারা বুঝতে পারছো না আমার জীবনে অন্য কোন মেয়ের জায়গা নেই। হয়তো বুঝি প্রান্তিক ভাই। কিন্তু তুমিতো শুধু একা রেহানার নও, তুমি তো আমাদেরও। রেহানা তোমার জীবনের যতটাই অধিকার করে থাকুক না কেন, আমাদের সম্মিলিত অধিকারকে দাঁড়িপালায় ওজন করলে কি, রেহানার একার ওজনের থেকে ভারি হবে না? এও এক অবুঝ অভিমান সেলিনা। সত্যি বলছি আমি তোমাদের বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারছনা, না বুঝতে চাইছো না? তোমার যা ভাললাগে তাই তুমি মানে করতে পারো। আমি শুধু বিশ্বাস করি ও কথা দিয়েছে ও আসবে আমার কাছে। আমাকে সেই অপেক্ষাটুকু করতে দাও সেলিনা। এইটেই তোমার শেষ কথা? হা এটাই আমার শেষ কথা। সেলিনা বলল তুমি কেন বুঝছো না প্রান্তিক ভাই, রেহানা যদি সত্যিই আসত তা হলে ডালিমের মৃত্যুর পরেই আসতে পারতো। ও তো তোমাকে ডালিমের হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল। সমস্ত ঝুঁকি নিয়েও সে চেয়েছিল, ডালিম যেন তার নিষ্ঠুর আক্রমণে তোমাকে ক্ষতবিক্ষত না করে। আমি বললাম, এমনও তো হতে পারে ডালিমের মৃত্যু সংবাদ সে জানেই না। সেলিনা ধীরে ধীরে বলল এ তোমার বিশ্বাসের কথা। বাস্তব নয়? বাস্তব নয়? না। তবে কোনটা বাস্তব? সেলিনা বলল বাস্তব সব সময় সুন্দর হয় না প্রান্তিক ভাই। ডালিমের সুইসাইড নোট পড়েছো? হ্যাঁ পাড়ছি। কিছুই কি বুঝতে পারনি? না বোঝার কী আছে। হয়তো আমার মতো করে আমি বুঝেছি? সেলিনা হেসে বলল তোমার মত করে বোঝা হলেই তো তা বাস্তব হয় না? বাস্তব থাকে আরো গভীরে। ডালিম নিষ্ঠুর, ডালিম হিংস্র শুধু নয়, সে শয়তান, কিন্তু তার মানবিক গুন শুলো যে একেবারে শেষ হয়ে যায়নি, তার প্রমাণ তো তার সুইসাইড নোট। তারপর বলল ভুল ক্ষণিকের, উত্তেজনার আগুন তাকে দাউ দাউ করে জ্বালায় মাত্র, কিন্তু সেই ভুলে কেউ যদি মমতার পরশ বুলিয়ে দিতে, সত্যি কারের ভালবাসা নিয়ে তার পাশে এসে দাঁড়াতো হয়তো ডালিম এতবড় ভুল করতো না। লুণ্ঠনে তৃপ্তি নেই, তাকে যদি একথাটা কেউ প্রথমেই পরম মমতায় বুঝিয়ে দিতো, তাহলে হয়তো ওর পথ অন্য রকম হতো। একটু থেমে বলল তোমাকে বললাম না প্রান্তিক ভাই, ডালিমের সুইসাইড নোট প্রমাণ করে প্রতিশোধের স্পৃহায় তাকে পাগল করেছিল, তাই সে একের পর এক প্রতিশোধ গুলো নিতে চেয়েছে, যদি সার্থকতা আসত, তাহলে হয়তো আরো নতুন নতুন নেশায় মেতে উঠতো, হারিয়ে যেতে যা কিছু পুরোনো। কিন্তু ব্যর্থতা তাকে একটা জায়গায় আটকে রেখেছিল। আর এই হতাশার মধ্যেই মৃত্যুর স্বপ্ন দেখলো সে।
সেলিনা বলল, কি ভাবছে প্রান্তিক ভাই। না কিছু না। কিছুনা যদি তাহলে এমন চুপ করে আছো কেন? কি বলব বল। কিছু তো একটা বলতে হবে? তুমিই বল আমি কি করব, আমার কি করা উচিৎ? আমি বলব? অবাক করলে প্রান্তিক ভাই। তোমার ভাগ্যকে পরিচালিত করবে তুচ্ছ সেলিনা? এ তুমি ভাবলে কি করে? আমি একটু জোরের সঙ্গে বললাম কেন পারবে না। নিজের মনের আগুনকে ছাই চাপা দিয়ে রেহানার জায়গায় তুমি কেন অশ্রুকণাকে এগিয়ে দিতে চাইছো? তারপর বললাম দেখ সেলিনা আমিও মানুষ। রক্তমাংসেরই মানুষ। ব্যথা বেদনা কামনা বাসনা মান অভিমান রাগ অনুরাগ সবই আমার আছে। আমিও চাই, কেউ আমার পাশে থেকে আমাকে উৎসাহ দিক, আমাকে পথ দেখাক, ভুল করলে ভুল ভেঙে দিক। যে শুধু মাত্র দূরের নক্ষত্র হয়ে থাকবে না। সে আমার বাগানে ফুল হয়ে ফুটবে। কখনো বা তাকে সাজাবো আমার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যে বুঝবে আমার হৃদয়কে, সে আমার ভালবাসাকে দেবে মৰ্য্যাদা, কর্ম ক্লান্ত প্রান্তিকের পাশে এসে বসবে সে, প্রয়োজনে তার আঁচলের হাওয়ায় মুছিয়ে দেবে ক্লান্তি, সে আমার ঘুমহীন চোখে গুন গুন সুরে সূচনা করবে ঘুমের আগমন আবার ভোরের সূর্য ওঠার আগে সেইই জানাবে আমায় নতুন দিনের বার্তা। আবেগে কাঁপতে থাকে আমার কণ্ঠ তাতে আরো আবেগ ঢেলে আমি জানতে চাই পারবেনা সেলিনা, আমার হৃদয় ক্ষতকে তোমার মরমী স্পর্শে শুকিয়ে দিতে পারবে না, শ্রান্ত আর ক্লান্ত প্রান্তিককে তোমার গানের সুরে ঘুম পাড়াতে পারবেনা আমার জীবনের সমস্ত আগুনকে নিভিয়ে দিয়ে, কেবল তোমার ভালবাসার প্রদীপ জ্বালাতে? গভীর আবেগে ওর একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে বললাম, একদিন রেহানাও চেয়েছিল, তোমার ভালবাসার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে নিতে। আজ আমি সত্যি ক্লান্ত, সত্যি একটু খানি আশ্রয়ের যে আমার ভীষণ প্রয়োজন। আরো বললাম চার দিক থেকে যে ঝঞ্জা আসছে, হয়তো সে ঝঞ্জায় কোনদিন হারিয়ে যাব, তার আগে দেবে আমায় একটু আশ্রয়? তোমার ভালবাসায়, তোমার মমতায় তোমার কল্যাণ কামনায়, জন্ম হোক নতুন প্রান্তিকের, যে শুধু তোমার আর কারো নয়। রেহানা ছবি হয়ে জায়গা নিক দেওয়ালে। অশ্রুকণা খুঁজে নিক নতুন ঠিকানা। আমি শুধু তোমার মধ্যেই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে ধন্য হতে চাই। বল সেলিনা বল, পারবেনা আমার বোঝা বইতে। গভীর আগ্রহ নিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাই ওর দিকে, তারপর এক সময় সজোরে ওকে বুকের পরে টেনে নিই এক নিমেষে।
