কিছুক্ষণ চুপ চাপ মিনতি সেন ও অশ্রুকণা। খানিক পরে অশ্রুকণা মিনতি সেনের বুকের পরে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, আমাকে তাড়িয়ে দেবে নাতো পিসি। আমার যে যাওয়ার কোন জায়গা নেই। মিনতি সেন ওকে কাঁদতে দিলেন। তারপর বললেন, যা চোখে মুখে জল দিয়ে আয়। তারপর খেয়েছিস কখন? কাল রাতে। সেকি! তোর বাবা-মা তোকে খাওয়ার জন্য বলেনি। সে কথা থাক পিসি, ওদের কাছে আমার তো কোন মূল্য নেই, যা কিছু মূল্য তা ওদের দম্ভ, অহঙ্কার আর ঐশ্বর্য্যের জন্য।
মিনতি সেন আমাকে বললেন, যাতে দোকানে দেখ ভালো ডিনার কিছু পাওয়া যায় কি না। আজকেও জবার মা আসেনি, আমাকেই যেতে হবে বান্না ঘরে। আমি টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। এর মাঝে মিনতি সেন কফি করে নিয়ে খেতে খেতে বললেন। একটা কথা বলবি? বলুন প্রান্তিককে খুব ভালবাসিস তাইনা? জানিনা। বল না। আমি তো প্রান্তিকের মা। জানি। তা হলে আমাকে বলতে লজ্জা কেন? না পিসি, আমি জানিনা, কিছু জানিনা, বলে পালিয়ে গিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
আমি ডিনার নিয়ে এসে দেখি মিনতি সেন একাই বসে আছেন। বললেন ওটা রান্না ঘরে রেখে এসে আমার কাছে একবার আয় তো। আমি তার কাছে এসে বসলাম, উনি আমার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বললেন, আমার একটা কথা রাখবি প্রান্তিক? বল। রেহানা ফিরে আসবে কি না কে জানে? তার ভালবাসার স্মৃতি বয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিবি? এর দ্বারা কি সত্যিকারের শ্রদ্ধা করা হবে তাকে? আমি অবাক হয়ে বললাম এ তুমি কি বলছ মা? কি করে আমি রেহানাকে ভুলে যাবো। আমি তাকে ভুলে যেতে বলিনি, কিন্তু কবে সে ফিরবে তার জন্য সারাটা জীবন অপেক্ষা করবি? আদৌ ফিরবে কি না তারও তো ঠিক নেই। আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললাম তোমার কাছ থেকে এসব কথা আশা করিনি মা। একদিন আমি ও রেহানা তোমার মাঝে খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম মাতৃত্বের পূর্ণ আস্বাদ। আজ এমন কি হল যে একজনকে তুমি সরিয়ে দিতে চাইছে। নারে পাগল ছেলে সরিয়ে দিতে চাইবো কেন? কোন মা পারে যে সন্তান হারিয়ে গেছে তাকে ভুলে থাকতে? তুমিতো তাই চাইছে। আমি যে মা। মায়ের শূন্যতা তুই কি করে বুঝবি। আমার বোঝার দরকার নেই। বুঝতে পারছি একদিন তুমি আমাকেও ভুলে যেতে চাইবে।
কখন যেন পাশে এসে দাঁড়ায় অশ্রুকণা। চোখ ফোলা ফোলা, বোঝা যায়, এতক্ষণ কাদছিল। মিনতি সেন উঠে পড়ে বললেন, তোরা আয় আমি ডিনারটা টেবিলে সাজিয়ে দিচ্ছি।
টেবিলে একটা কথাও বলেনি অশ্রুকণা আমার সাথে। আমি কিছু বলতে গেলে তাও উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেছে।
রাত হয়, আমাকে এখন যেতে হবে? আবার কবে আসবি। তুমিতো এক মেয়ের অভাবে আর এক মেয়েকে পেয়েছে, আবার আমার অভাবেও নিশ্চয়ই কাউকে খুঁজে পাবে, আমাকে হয়তো আর কোন দিন দরকার হবে না। প্রচণ্ড অভিমানে কথাগুলো বলে হন হন করে বেরিয়ে এলাম। মিনতি সেন পিছন থেকে বারাবার ডেকে বললেন, শোন প্রান্তিক, শুনে যা আমার কথা।
অশ্রুকণা বলল, আমিও যাই তা হলে, ও যখন চায় না যে আমি এখানে থাকি, বলে ও বেরিয়ে আসতে চাইলে মিনতি সেন বললেন তোরা সবাই এভাবে পাগলামি করলে আমি সামলাই কি করে বলতো।
বেশ কিছুদিন যাইনি মিনতি সেনের বাড়ী। হয়তো অশ্রুকণা এখনো ও বাড়ীতেই আছে। এর মাঝে একদিন এসেছিলেন প্রমথবাবু। অশ্রুকণার খোঁজে। আমি যেটুকু শুনেছি তার ভিত্তিতে বললাম, আপনার মেয়ে কোথায় গেছেন সেকি আমার জানার কথা? এইটুকু বলতে পারি আমাদের এখানে আসেনি। নীলাঞ্জনা পিসি বললেন, এভাবে কথা বলছ কেন প্রান্তিক। ও বাড়ী থেকে না বলে বেরিয়ে গেছে। ও তো তোমার বন্ধু, জানতে ইচ্ছে করে, ও কোথায় গেছে? না করে না। তারপরে বললাম আমি কারোর কেউ নই পিসি। আমি শুধু আমারই। আমি নাকি ওনার মেয়েকে বদ মতলব দিয়েছি, ভুল পথে চালিত করেছি, কি ভাবেন ওনারা? ঐশ্বর্যের দাম্ভিকতায় যা মনে হয় বলা যায়? অবাক হয়ে শোনেন আমার কথা, নীলাঞ্জনা পিসি ও সেলিনা। প্রমথবাবুর বোধ হয় কিছু বলার ছিল না। এরপরে আর কিছু জানতে চাওয়াও সম্ভব নয়। মাথা নীচু করে যখন চলে যাচ্ছেন, নীলাঞ্জনা পিসি বললেন, শুনুন। উনি দাঁড়িয়ে গেলে পিসি বলতে থাকেন, অশ্রুকণা আমার মেয়ের মত, অনেকবার এসেছে আমাদের এখানে। খুব খারাপ লাগছে শুনে যে ও বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসে আর ফিরে যায়নি। প্রান্তিক ছেলেমানুষ, ওরতো বাবা-মায়ের যন্ত্রনার কথা বোঝা সম্ভব নয়। তাই হয়তো মুখে যা এসেছে বলে ফেলেছে। ওর ব্যবহারের জন্য ওর হয়ে আমি ক্ষমা চাইছি। উনি বললেন না না, সে কি কথা। ও হয়তো আমাদের ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হয়েছে তার জন্য আমিই দুঃখ প্রকাশ করছি। পিসি বললেন, সে যাই হোক, অশ্রুকণা আমাদের এখানে আসেনি। আমরাও দেখছি ও কোথায় গেছে, কেন গেছে? আর সংবাদ পেলেই জানাব আপনাদের। ধন্যবাদ জানিয়ে উনি বেরিয়ে গেলেন।
পিসি দীর্ঘ সময় কিছু না বলে রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে জানতে চাইলেন তুমি কি জানো প্রান্তিক ও কোথায় গেছে? ওর সঙ্গে কি তোমার ঝগড়া হয়েছে? বললাম কেন ওর সঙ্গে আমার ঝগড়া হবে? তা হলে ওর বাবাকে তুমি ও ভাষায় কথা বললে কেন? তুমি তো এরকম ব্যবহার করতে না কখনো। কাল গিয়ে ওর বাবা মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে আসবে। একটা কথা মনে রেখো ধীরে ধীরে যে উচ্চতায় পৌঁছেছে এক ঝটকায় তা থেকে মাথা মুড়ে পড়ে যেওনা। আমি চুপ করে রইলাম, কিছুই ভাল লাগছেনা। নাইট বাল্ব জ্বালিয়ে শুয়ে আছি, ঘুম আসছেনা। শুধু এ পাশ ও পাশ করছি। হঠাৎ উজ্জ্বল আলোতে ঘর ভরে গেল। ভেজানো দরজা ঠেলে ভিতরে এল সেলিনা। আমি অবাক হয়ে বললাম তুমি? হ্যাঁ আমি, মা পাঠালে। তোমাকে পাঠিয়েছেন পিসি? কৈন? বলছি। বল। তুমি কি শুয়ে শুয়ে শুনবে প্রান্তিক ভাই। এতে যদি অসুবিধা হয় বসতে পারি। না দরকার নেই তুমি শুয়ে শুয়ে শোন। বল? অদি কোথায় গেছে তুমি জান না? আমি কি করে জানব? আমি কি করে জানব নয়, জান কিনা তাই বল। হ্যাঁ বা না? আমি রেগে গিয়ে বললাম, আমি কি আদালতে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে বলতে হবে হ্যাঁ বা না। হ্যাঁ দিচ্ছ। মায়ের আদালতে তুমি সাক্ষ দিচ্ছ আর আমি উকিল হয়ে তোমাকে জেরা করছি। বল অশ্ৰুদি কোথায় গেছে তুমি জান কি না? না জানিনা। মিথ্যে কথা। কি মিথ্যে কথা? তুমি জান যে সে কোথায় গেছে। জানলেও বলতে হবে? এবার হেসে ফেলল সেলিনা, বলল এবার পথে এসেছ প্রান্তিক ভাই। তবে জানলেই যে বলতে হবে এমন কোন দিব্যি নেই, আমার জানার দরকার ছিল তুমি জান কিনা। বললাম জানতাম না, তবে ঘটনা চক্রে জেনে ফেলেছি। মানে? হঠাৎ দেখি উনি মিনতি সেনের ওখানে উপস্থিত। আমার সঙ্গে কথা হয় নি, মিনতি সেনকে ও কি বলেছে আমি জানিনা। কিন্তু মিনতি সেন আমায় জিজ্ঞেসা করে জানতে চেয়েছেন, অশ্রুকণাকে আমি ভালবাসি কীন রেহানার শূন্য জায়গায় তাকে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কীনা ইত্যাদি। রাগে আমার সমস্ত শরীর জ্বলতে থাকে তাই চলে এসেছি। এর বেশী আমার কিছু জানা নেই। আমি বলতেও পিরবোৰা কেন সে গেছে ওখানে? এখনো আছে কি না? কিছুই জানিনা। সেলিনা বলল, এই সহজ সত্যটা তুমি বললে না কেন? জানিনা বলে কেন গোপন করলে? আমি জানিনা। তুমি না জানলেও আমি জানি প্রান্তিক ভাই। আমি জানিনা আর তুমি জান? হ্যাঁ জানি। তাহলে বলতোকেন? অদি তোমায় ভালবাসে, রেহানার থেকেও হয়তো বেশী ভালবাসে। তুমি বাস কিনা সেটা বড় কথা নয় তবে অশ্ৰুদি বাসে। আর তাইতো সে অস্বীকার করতে পারে তার বাবার যে কোন প্রচেষ্টাকে। তুমি যে তা জানো। তা নয়। হয়তো আমার থেকে বেশী জান। কিন্তু প্রান্তিক ভাই, এ ভাবে পালিয়ে গেলে চলবে কেন? শুধু রেহানার ব্যথা বেদনা বুঝবে। অদির কষ্টটা বুঝবেনা? শুধু রেহানাই থাকবে তোমার স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করে, আর অশ্ৰুদির জন্য সাজিয়ে রাখবে দুঃখের পশরা? এ হতে পারে না প্রান্তিক ভাই। তারপর বলল তুমি কেন বোঝ না, কি গভীর ভাবে ভালবাসলে এমনি করে সব কিছুকে উপেক্ষা করে সে পথে নামতে পারে। না প্রান্তিক ভাই, এতটা নিষ্ঠুর তুমি হয়ো না। তোমার মধ্যকার এই নিষ্ঠুর মানুষটাকে আমি দেখতে চাইনা প্রান্তিক ভাই। অদিকে বুঝতে চেষ্টা করো। রেহানার জায়গায় তাকে বসাতে পারবে কিনা সেটা অন্য কথা। তাই বলে তার ব্যাথার জায়গাটা তার অসহায়তাকে কেন গুরুত্ব দেবেনা। এটাই কি তুমি চাও? আর যদি সত্যি সত্যি তাই চাও, তাহলে আমাদের কথাও শুনে রাখ, আমরা কিন্তু তা চাই না।
