তারপর আমার পকেট থেকে আমাকে লেখা দাদুর চিঠিটা তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, আমার দাদুর মৃত্যুশয্যার চিঠি। চিঠি যদিও আমাকে লিখেছেন, কিন্তু এর প্রতিটি লাইন জুড়ে আছেন আমার মা। পড়ুন। উনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন, বুঝি জানতে চাইছেন পড়ব? বললাম, ওচিঠির সত্ত্বাধিকারী তো আমি। আমি তো বলছি পড়ুন। জানতে পারবেন, আমার মায়ের আসল পরিচয়। কিন্তু। কোন কিন্তু নয়, আপনি পড়ুননা। আমাকে বুঝতে হলে আমার মাকে বুঝতেহলে আমার দাদুর এ চিঠিটা পড়া আপনার একান্ত দরকার। তারপর চিঠিটা আমি টেবিলে পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে উঠে পড়লাম। বললাম, আমি আধ ঘন্টা পরে আসছি। আশা করি আমার মায়ের আসল যন্ত্রণা ও পরিচয় ততক্ষণে পেয়ে যাবেন। কিন্তু তোমার লাঞ্চ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম, এখনো সময় হয়নি। এসে লাঞ্চ করব।
রাস্তা দিয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে ভাবছি, আমি কি ঠিক করলাম? মিনতি সেনের সত্যিকারের যন্ত্রণা কি আমি জানি? এমনও তো হতে পারে শুধু মাত্র মায়ের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে চরম অভিমানে বাবার সব কিছুকে অস্বীকার করেছেন। এখনও তো বাবার বলতে যা কিছু তার কিছুতেই হাত দেননা। যদি ক্ষমা করতে পারতেন তাহলে কি এমন হতো? প্রতীম বাবুর জন্য সামান্য দরদ নাও থাকতে পারে। শুধু ভরসা, প্রশ্নের মুখোমুখি হলে অন্তত বলতে পারব, তা হলে কিসের আশায় তুমি আজো প্রতীম বাবুর ঐ ছোট্ট চিঠিটা বয়ে নিয়ে চলেছে?
আধঘন্টা পরে ফিরে এলাম। ততক্ষণে লাঞ্চ এসেছে। আমাকে চিঠিটা ফেরৎ দিয়ে বললেন, আমাদের অহংকার কত ভঙ্গুর তাইনা প্রান্তিক। আমার মাকে চিনতে পারলেন? পেরেছি। পেরেছেন? আনন্দে আমার চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললাম, তা হলে মাকে কি বলব। কিছুই বলতে হবে না প্রান্তিক। যদি প্রেক্ষাপট কিছু বলার অবস্থা তৈরি করে, বলল, তার মাতৃত্বের অহংকারকে আমি শ্রদ্ধা করি। কোন ভাবেই তাকে ছোট করতে পারব না। জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত দুর্বলতাই সব নয় প্রান্তিক। দুর্বলতা তৈরি হয় সকলকে নিয়ে পূর্ণতার জন্য। আমি শুভার্থী হিসাবে থাকবো তোমাদের পাশে, তোমাদের প্রয়োজনে আমাকে পাবে সবসময়। তোমার মাকে বলল, আমার শ্রদ্ধা রইল তার জন্য। একান্ত সমব্যথী হিসাবে সব অতীতকে মুছে দিয়ে যদি তোমাদের পাশে প্রয়োজন হয় আমাকে পারে সব সময়। তবু। না কোন তবু নয়। হয়তো আমি ক্ষুদ্র অতি তুচ্ছ। তবু আর যাতে ছোট না হতে হয়। সে দায়িত্ব তোমার? লাঞ্চ হয়ে গেলে, বললাম এবার আমাকে যেতে হবে। আচ্ছা এস। আর একটা কথা, যে কোন প্রয়োজনে, যতবড় কঠিন প্রয়োজন হোক, তোমার দাবী নিয়ে আমার কাছে এস। দাবী? হ্যাঁ দাবী, ভালবাসার দাবী, স্নেহের দাবী, অধিকারের দাবী। আমি বললাম, তাই হবে। আমি তবু দাঁড়িয়ে আছি, দেখে বললেন কিছু বলবে? না। আমি চলে এলাম, পিছন ফিরে দেখলাম, পাহাড়ের সহিষ্ণুতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রতীমবাবু। তখনো স্থির অপলক। কি যে খারাপ লাগছিল ভাবার নয়।
না কোন প্রেক্ষাপট তৈরি হয় নি, ভাবাও হয়নি। ওদিকে ধীরে ধীরে অশ্রুকণাকে নিয়ে বাড়ীতে এক সমস্যা তৈরি হয়েছে। সজলবাবুর মত ছেলেকে প্রত্যাখান করার পরও বাবা-মা ওর জন্য আলাদা পাত্রের সন্ধানে আছেন। কিন্তু অশ্রুকণার একই কথা সে তার সিদ্ধান্তে অনড়।
একদিন ও এসেছে মিনতি সেনের বাড়ীতে। মিনতি সেনকে বলছে আমার একটা উপকার করবেন পিসি? বল। আগে করবেন কি না বলুন, তারপর বলব। আমি সামনে ছিলাম। বললাম, মা না জানলে বলবেন কি করে যে তিনি পারবেন কি না, তার ক্ষমতা আছে কি না? তুমি চুপ কর প্রান্তিক, আমিতো তোমাকে কিছু বলিনি। মিনতি সেন বললেন, তুই এখান থেকে যা প্রান্তিক, দেখি ও কি বলে? ও কি বলে জানতে ইচ্ছে হলেও, আমি চলে এলাম। মিনতি সেন বললেন বল কি বলতে চাইছো? আপনারতো বহুলোকের সঙ্গে জানা শোনা আছে, আমাকে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন? যত ছোটই হোক, শুধু বেঁচে থাকার মতো হলেই হবে। কি ব্যাপার অশ্রু, বাবা-মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছো বুঝি। ও চুপ করে থাকে। আবার বললেন, কি হল, উত্তর দাও। পিসি বাবা-মা এখন আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছেন। আঁতকে উঠে মিনতি সেন বললেন, ছিঃ অশ্রু ওকথা বলতে নেই। তুমি কেন বাবা-মায়ের কষ্ট বোঝনা? ওনারা কি আমার কষ্ট বোঝেন? সন্তানের কষ্ট বাবা-মা বোঝেন না একি হয়? আসলে তোমার কি কষ্ট তাকি বলেছে বাবা মাকে? ওনাদের সে সময় নেই। আসলে ওনারা চান তার মেয়েকে রাজরানী করতে। মিনতি সেন বললেন সব বাবা-মাই তাই চান। কিন্তু আমি তো তা চাই না। তাহলে কি চাও তুমি? একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে বাঁচতে। তুমি সে কথা বলতে পারতে। বললে শুনছে কে? তাদের এক কথা আমরা যা বলব তাই তোমাকে মেনে নিতে হবে। অনেক সহ্য করেছি আর সহ্য করব না। সে না হয় মেনে নেওয়া গেল কিন্তু প্রান্তিকের সম্পর্কে এমন সব কথা বলল, আমার মাথা গরম হয়ে গেল, বললাম, তোমরা তোমাদের স্বপ্ন নিয়ে থাকো, আমাকে তোমাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য পাবেনা কোন দিন। এ কথা বলে বেরিয়ে এসেছি এক বস্ত্রে, বলে এসেছি। এখন থেকে আমাকে ফিরাতে বৃথা চেষ্টা করোনা। তোমাদের অহংকারের কাছে মাথা নত করতে পারবো না। মিনতি সেন শিউরে উঠে বললেন, একি করেছিস অশ্রু, এ পাগলামি কেন করতে গেলি। জানিনা পিসি। কিন্তু আমি আর ফিরে যাবো না। আপনি বললেও না। আচ্ছা ঠিক আছে তাই হবে। আমাকে একটু ভাবতে দে।
