মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম ডালিমের লেখা সুইসাইড নোট। হায় হতভাগ্য ডালিম মৃত্যুতেই তোমার সত্যিকারের জয় হল। মিনতি সেন কোন কথা বললেন না। ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, আমি জানি ওই হতভাগ্যের জন্য আপনারাও সমব্যথী হয়ে উঠবেন। কি আশ্চর্য তাই না? এরই কিন্তু মৃত্যু কামনা করেছিলাম আমরা সবাই। আর আজ মনে মনে বলছি, দূর্ভাগ্য ওর ভিতরের মানুষটাকে ঠিক সময়ে ঠিক পথে চালিত করতে পারেনি। একথা আপনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করবেন না, তার নিষ্ঠুরতায় যাদের জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, অন্তর দিয়ে তাদেব সে ভালবেসে ছিল, তা না হলে সুইসাইড নোটে ও বলতে পারতো না আমার নিষ্ঠুরতায় যারা জীবনের পথ হারিয়ে ফেলেছে তাদের নতুন পথের সন্ধান দিও। জীবনের এই মানবিক দিক তাকে মৃত্যুতেও মহান করে তুলেছে। তাই তার সমাধি সাধারণ কয়েদির মত না হয়ে সাধারণ মানুষের মত হয়েছে। পুলিশের একাজ আমি সমর্থন করি। আর প্রার্থনা করি ঈশ্বরের কাছে জীবনের ভুল পথে চলতে গিয়ে যারা ডালিম হয়ে গেছে। তুমি তাদের ওরই চেতনায় উদ্বোধিত করো। হয়তো সেটাই হবে ন্যায়নিষ্ট বিচারকের সর্বশ্রেষ্ট বিচার।
একটা থমথমে অবস্থা নেমে এল সমস্ত ঘরটয়। হতবাক মিনতি সেন, বিস্ময়ে অভিভূত আমি। মনে মনে বললাম, ঈশ্বর একি সত্যিই তোমার বিচার? যে মানবিকতার বরমাল্য তুমি তাকে দিলে, কয়েকদিন আগে দিলে না কেন? তা হলে তো এমনি একটা অমূল্য জীবন পৃথিবী থেকে ঝরে পড়তো না। আবার ভাবলাম, কার কাছে আবেদন? নিষ্ঠুর ঈশ্বরের কাছে? ওর নিষ্ঠুরতায় তো হারিয়ে গেছে আমার রেহানা। সে তো কোন অপরাধ করেনি, তবে কোন পাপের শাস্তি দিতে তুমি তাকে পথে নামিয়ে এনেছো? এই যদি তোমার বিচার, তবে কিসের ন্যায় বিচারক তুমি।
কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা, যেন উঁচ পড়লেও টের পাওয়া যায়। সেই গভীর নিঃশব্দতাকে প্রভাত আলোর পদধ্বনির মতো স্পষ্ট করে ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, মিস সেন জবার মাকে অন্তত বলুন এক কাপ কফি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে মিনতি সেন বললেন, সরি ভট্টাচার্য সাহেব, এই আনি। কেন জবার মা? আজকে ওকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
যাকে মা হিসাবে মেনে নিয়েছি, স্থান দিয়েছি মনের নিভৃত অন্দরে, সন্তান হয়ে তাকে প্রেমিকা রূপে দেখার ঔচিত্য অনৌচিত্যের প্রশ্নে মন দোলা খায় যখন, তখন একদিন প্রতীমবাবুর ওখানে এসে উপস্থিত হই। উনি আমাকে বললেন, অনেক দিন পরে এলে কিন্তু। কেমন আছো? তোমার মা ভালো আছেন তো। বললাম হ্যাঁ, কিন্তু একটা কথা আমি আপনার কাছে জানতে এসেছি। বলুন আমার মাকে আপনি চেনেন একথা আগে বলেননি কেন? বুঝতে পারছি গভীর প্রচেষ্টায় একটা দীর্ঘশ্বাস চাপতে চাইছেন প্রতীমবাবু। বললেন, তুমিতো কখনো তোমার আসল পরিচয় দাওনি। তাছাড়া আমি ঠিক বুঝতে পারিনি তুমি মিনতি দেবীর ছেলে? বললাম সে কথা থাক। আমি তো বড় হয়েছি। অবাক হয়ে আমি যখন দেখলাম, আমার মাকে দেখে আপনি চমকে উঠেছেন, আমার মাও ভীষা ভীষণ অবাক হয়ে অন্য ঘরে চলে গেলেন। যতক্ষণ ছিলেন স্বাভাবিক হতে পারেন নি। হয়তো আপনিও স্বাভাবিক হতে পারেন নি। এই দোদুল্যমানতায় একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? বল। সত্যি উত্তর দেবেন? উনি বললেন দেখ তুমি আমার ছেলের মতন। যে সত্য যতটুকু তোমার কাছে প্রকাশ করা যায় তার বেশী জানতে চেওনা। উত্তর দিতে পারবো না। বললাম, এমন তো হতে পারে আপনি যা জানেন, তা সত্য নয়। মানুষের জীবনে প্রেম ভালবাসা স্নেহ মমতা এতো কোন সামাজিক বন্ধনে বাধা যায় না। যায় কি? বুঝতে পারছি না তুমি কি বলতে চাইছে। বললাম, জীবন অভিজ্ঞতা আপনার আমার থেকে অনেক গুন বেশী। যা আপনি বিশ্বাস করেন, মনের মধ্যে যে স্বপ্নকে আপনি এই দীর্ঘ বছব গুলোতে লালন করে এসেছেন, আজ যদি হঠাৎ দেখেন, কোন এক উত্তাল ঝটিকায় তা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। আপনি কি পারবেন, আপনার সেই বিশ্বাসকে সরিয়ে নিতে? উনি বললেন, জানিনা তুমি কি বলতে চাইছে। এইটুকু বুঝতে পারছি, খুব সাধারণ ভাবে তুমি এসব কথা বলছনা। তোমার বক্তব্যের মধ্যে আছে এমন এক অসাধারণত্ব যা শ্রোতাকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করে। এটা আপনার আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার কথা। উত্তর নয়। তোমার উত্তর তো আমার জানা নেই প্রান্তিক। তা হলে কি বিশ্বাস করতে হবে এত দীর্ঘদিন ধরে যে বিশ্বাসকে আপনি, গভীর মমতায় বাঁচিয়ে রেখে এসেছেন, তাকে মেরে ফেলতেও আপনার কোন দ্বিধা নেই। প্রতীম বাবু বললেন, স্বপ্ন বা বিশ্বাসকে এ ভাবে মারা যায় না প্রান্তিক। তারা বেঁচে থাকে। আমি বললাম তাই বলুন, তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়। কি? যে নিঃসঙ্গ একাকীত্ব আমার মা এখনো বয়ে চলেছেন, আপনি কি পারেন না সেই নিঃসঙ্গতাকে গভীর মমতায় মুছিয়ে দিতে? আমি? কি বলছ প্রান্তিক? কে আমি? কি অধিকার আমার? যদি কোন অধিকার নেই তা হলে অমন চমকে উঠলেন কেন?
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে প্রতীম বাবু বললেন, সে তুমি বুঝবেনা। বললাম, আপনি আমাকে যত ছোটই মনে করুন আমি আমার ছোট্ট অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারি, যে নিঃসঙ্গ জীবন আপনি বয়ে চলেছেন, সে আমার মার জন্য, বলুন অস্বীকার করতে পারবেন?প্রতীমবাবুর চল্লিশ উদ্ধা জীবনে এমন তীব্রভাবে ভেতরটাকে বুঝি কেউ আঘাত করেনি। তাই খানিকক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে রইলেন। পরে বললেন, জানিনা, কেন তুমি এভাবে বলছ। যা ছিল স্মৃতি তাকে স্মৃতিতেই থাকতে দাও প্রান্তিক। জীবনের অনেক সাধ, আকাঙ্খা, স্বপ্নই তো পূরণ হয় না, তার জন্য দুঃখ করলে বাকী জাবীনটাই তো নষ্ট হয়ে যাবে। তারপর বললেন হ্যাঁ, তোমার মায়ের একটা স্মৃতি আজো আমার মনের মণিকোঠায় বেঁচে আছে বলেই। দীর্ঘ ২৪ বছর পরেও তোমার মাকে আমার চিনতে ভুল হয়নি। তোমার মারও হয়তো ভুল হয়নি। না হলে অমন পালিয়ে যেতেন না। কিন্তু প্রান্তিক, এসব কথা থাক, তুমি বরং অন্য কথা বল। বললাম, আমি কিন্তু অন্য কথা বলতে আসিনি। আমি আমার নিঃসঙ্গতা দিয়ে আমার মার নিঃসঙ্গতা বুঝি। হয়তো আপনারটাও কিছু বুঝি। প্রতীমবাবু জীবনের এই গোপনতাকে যেন এড়িয়ে যেতে চাইছেন বুঝতে পারছি। বললেন, আমার ভীষণ ভাবে মনে থাকবে তোমার কথা। অনুরোধ প্রান্তিক এ প্রসঙ্গ বন্ধকর। জীবনের দূর্বল দ্বার খুলে কি লাভ। বরং খুলতে গেলে তা ভেঙে যেতে পারে। বললাম বুঝতে পারছি এক তীব্র অভিমানে আপনি অতীতকে ভুলে যেতে চাইছেন। উনি খানিকক্ষণ আবার চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, যে অতীতকে তুমি এত গুরুত্ব দিচ্ছ, সে রকম কোন অতীত কিন্তু আমার জীবনে নেই। তোমার মায়ের সঙ্গে আমার কোন পূর্ব পরিচিতি ছিল না, যে পরিচিতির সোপান বেয়ে অমূল্য স্মৃতি তৈরি হতে পাবে। ছিলনা কোন আবেগও। কারণ ভাল লাগার কোন মুহূর্ত তৈরি হয়নি ভালবাসাতো দূরের কথা। শুধু একটা গভীর ট্রাজেডির ঘটনা ঘটে গিয়েছিল আর তার জন্য আমার নিজেকে দায়ী মনে হয়েছিল। আর সেই জন্যই দায়ীত্বটুকু গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম। সুতরাং তুমি যে অভিমান জাত স্মৃতির কথা বলছ তা কিন্তু ছিল না। হাসলাম আমি, বললাম, তবু আপনি প্রতীক্ষা করেছেন, প্রতীক্ষা হয়তো আমার মাও করেছেন। অস্বস্তি বোধ করছেন প্রতীম বাবু। বারবার বলছেন থাক তোমার মায়ের কথা, তোমার কথা বল। বললাম, আমার মাকে না চিনলে আমাকে চিনবেন কি করে? কি করে চিনবো তোমার মাকে। আজ তো চেনার সমস্ত রাস্তাগুলোই বন্ধ। আমি একটু জোর দিয়ে বললাম, এ আপনার ভুল। ভুল? হ্যাঁ ভুল।
