একসময় খাওয়া শেষ হয়। মিনতি সেন আর ও ঘরের দিকে পা মাড়াননি। নীলাঞ্জনাই এলেন এ ঘরে। প্রতীম চৌধুরী বললেন, আপনাদের আতিতেয়তা আমার মনে থাকবে। আজ তবে উঠি। আচ্ছা, আবার কবে আসবেন? দেখি সময় সুযোগ হলে আসব একদিন। নীলাঞ্জনা বললেন প্রান্তিক, প্রতীমবাবুকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসো। আমি কাছে এসে দাঁড়ালে প্রতীমবাবু বললেন, আশা করি তোমার গবেষণা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, একদিন এস তোমরা সবাই, ভীষণ ভালো লাগবে। বললাম যাব একদিন, হঠাৎ প্রণাম করলাম ওকে। এই প্রথম। উনি আশীর্বাদ করে বললেন, তোমার মত ছেলে যেন বাংলার ঘরে ঘরে জন্মায়। এরপর উনি আস্তে আস্তে গাড়ীতে গিয়ে উঠলেন। আমি সেলিনাকে নিয়ে আমার ঘরে এলাম।শুনতে পাচ্ছি নীলাঞ্জনা বলছেন, তুমি এমন ব্যবহার করলে কেন মিনতি। আমার কান সজাগ হয়ে আছে ওদের কথা শোনবার জন্য। মিনতি সেন বললেন কি করলাম। ভদ্রলোকের সঙ্গে এত যে দূরত্ব রচনা করলে, বুকে হাত দিয়ে বলত এ দূরত্ব কি তুমি চাইছিলে? মিনতি সেন বললেন আমি কি চাইছিলাম তার থেকেও বড় কথা, আমার কি করা উচিত? কেন? ভুলে যাচ্ছ কেন নীলাঞ্জনা, আমি শুধু মিনতি সেন নই, আমি প্রান্তিক ও রেহানার। মেয়েটা কি যে অভিমানে কোথায় চলে গেল জানিনা, ছেলেটাকেও তবে কি হারাতে বল? বুকের মধ্যে যতই কষ্ট হোক তা আমার পক্ষে সম্ভব নয় নীলাঞ্জনা। তারপর বললেন, আমি তো মেয়ে, মেয়ে মানুষের সব দূর্বলতা দিয়েই তো আমি তৈরি। এ দূরত্ব তাই আমার নিজের সৃষ্টি, এটা না করে আমার উপায়ও ছিল না। তুমি এতে অন্য কিছু মনে করো না। কিন্তু মিনতি, মেয়েদের কাছে কেবল মাত্র মাইতো তার একমাত্র পরিচয় নয়। সে তো কারো স্ত্রী, কারো বোন, কারো প্রেমিকা, তাকে অস্বীকার করবে কি করে? মিনতি সেন বললেন, হয়তো দুঃখ পাবে কিন্তু তবু বলব, সেলিনার মা হয়ে আজ তোমার যে মর্যাদা, তুমি কি তা অন্য কোন ভাবে পেতে পারতে, না পেয়েছে কোনদিন?
নীলাঞ্জনা ভাবলেন কিছুক্ষণ তারপর বললেন, তোমার কথা হয়তো ঠিক। তবু হোক না তা মিথ্যা, একদিন তো স্বপ্ন দেখেছিলাম, ডুবেছিলাম আকণ্ঠ ভালবাসায়। সেদিনের সেই প্রাপ্তিটুকু কি জীবন থেকে একেবারে মুছে যাবার? হয়তো মুছে যাওয়ার নয়, কিন্তু আজ যেমন তুমি আর সেই অতীতে ফিরে যেতে পারবে না, আমার পক্ষেও সম্ভব নয় নীলাঞ্জনা। এই মাতৃত্বের অহঙ্কার থেকে নিজেকে নির্বাসিত করা। এটাই তোমার শেষ কথা? শেষ কথা বলে কারো জীবনে কিছু নেই। হয়তো নতুন যুগে নতুন কথা আসতে পারে পুরনো হয়ে যেতে পারে আজকের সত্যি, নতুন সত্যের আলোকে আবার যদি নতুন পথের ঠিকানা খুঁজে পাই। আজকের ইতি এখানেই টানা যাক, কি বল। বেশ তুমি যখন চাইছে না, আমি আর তোমায় কি বলব।
যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি। ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্জ সাহেব একদিন এলেন মিনতি সেনের বাড়ী। আমাকে দেখে বললেন হ্যালো ইয়ংম্যান, কেমন আছো? ভাল। আপনি? ফাঁইন, তোমাদের মত ছেলেদের দেখলে আরো ভালো লাগে। তারপর বললেন, আজকের কাগজ দেখেছো? না, বিশেষ কোন সংবাদ আছে? মিনতি সেন বললেন ভট্টাচার্য সাহেব আপনি যখন কথা বলেন, তখন সব কিছু কেমন রহস্যে ঢাকা থাকে। কি সংবাদ আছে আজকের কাগজে যাকে আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভট্টাচার্য সাহেব বললেন কি জানি, আপনাদের কাছে কোন সংবাদ বিশেষ আর কোনটা নয়। আমি আইনের লোক। বহু সময় পয়সার বিনিময়ে মিথ্যেকে সত্য বলে চালাতে চাই যুক্তির জাল। বুনে। কিন্তু বিশ্বাস করুন মনে মনে কিন্তু চাই অপরাধী যেন শাস্তি পায়। মিনতি সেন বললেন, তবুও খোলসা হল না। জানতাম তা হবে না। তবু বলছি, আপনাদের ডালিমের কথা মনে আছে? আমি উৎসুক হয়ে তাকালাম ভট্টচার্জ সাহেবের দিকে। মিনতি সেন বললেন, তার কথা মনে থাকবে না? আমাদের জীবনে সে তো অভিশাপ। তার কোন কঠিন শাস্তি হোক আপনারা চান না। কি বলছেন ভট্টাচার্য সাহেব। চাইনে মানে? ওরই জন্য মেয়েটি আমার কোথায় হারিয়ে গেল। কিন্তু কঠিন শাস্তিতে তার হয়েছে। না হয়নি। সেকি কথা, তার ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড, এবং তারপরে আরো ১০ বছর পুলিশের শ্যেনদৃষ্টির ভিতরে থাকাকে কি আপনি কম শাস্তি মনে করেন? তবে কি সে ছাড়া পেয়েছে? হ্যাঁ, মিস সেন ও মুক্তি পেয়েছে? বলেন কি? আঁতকে ওঠেন মিনতি সেন। আমি অবাক হয়ে বলি, তাহলে কি হবে ভট্টাচার্য কাকু। ও তো এখন রেহানাকে পাবে কি না জানিনা, কিন্তু সেলিনার উপর যে প্রতিশোধ নিতে চাইবে। মিনতি সেন বললেন আপনি যা হয় একটা কিছু করুন ভট্টাচার্য সাহেব, কণ্ঠে আকুল আৰ্ত্তি। ভট্টাচার্য সাহেব হাসতে হাসতে বলেন, তাইতো বলছিলাম, আপনাদের কাছে কোনটা বিশেষ কোনটা অবিশেষ তাইতো বুঝতে পারিনা। আপনি ঠাট্টা করছেন, কণ্ঠে তার আসন্ন বিপদের উদ্বেগ।
ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, আমার মত নগন্য ব্যারিষ্টার তার আর কি করবে। মুক্তি পেয়ে সেতো এখন সব বাঁধনের উর্দ্ধে। মিনতি সেন বলেন, এখনো আপনি রহস্যময়। সত্য কথাটা বলুনতো কি হয়েছে? মুক্তি পেয়ে সে কি আরো সাংঘাতিক কিছু করেছে? না মিস সেন আসলে বিচাবক তাকে সঠিক শাস্তি দেননি। মানবিক বুদ্ধিতে তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিচারকেরও বিচারক যিনি, তিনি তা সইবেন কেন? সেই যে কথায় আছে না, তিনি কাউকে ক্ষমা করেন না করেন নি, ডালিমের ক্ষেত্রেও করেন নি। তাই তার বিচার নেমে এসেছে একান্ত গোপনে চরম আত্মশোচায়। আমি ও মিনতি সেন বললাম বুঝতে পারছি না। আমিও বুঝতে পারিনি প্রান্তিক, তারপর ধীরে ধীরে সেই বহু প্রতীক্ষিত সংবাদকে উন্মোচন করে বলেন, ডালিম আত্মহত্যা করেছে। আমরা বললাম আত্মহত্যা। হ্যাঁ আত্মহত্যা, এবং তার জন্য ও সুইসাইড নোটও লিখে রেখে গেছে। এই একটি কাজ সে সত্যিকারের ভাল কাজ করেছে। আর সেই ভালো কাজের জন্য, সেই সর্বশ্রেষ্ট বিচারকের কাছে তার মুক্তির সুপারিশ করা যেতেই পারে। সুইসাইড নোটে ও লিখে রেখে গেছে, জীবনে জিৎতে চেয়েছিলাম। ছলে বলে কলে কৌশলে যেকোন ভাবে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে পরাজিত হয়েছি। সবশেষে বাজিতেও হেরে গেছি আমি। বুঝতে পারছি না এই পৃথিবীর আলোবাতাস কোন শয়তানদের জন্য নয়। আমি আমার দোষ মহামান্য আদালতের কাছে স্বীকার করে আবার পৃথিবীর আলো বাতাসে ফিরে আসার ছাড়পত্র চাই। শাস্তির ১০ বছর মেয়াদ শেষে মনে হয় বিচারক বোধ হয় আমাকে প্রতিশোধের সুযোগ দেওয়ার জন্য এই স্বল্প শাস্তি দিয়েছেন। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভিতরের যে শয়তানটি ক্ষণিকের জন্য মানবিক হয়ে নিজের দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল, সেই আবার সহস্রগুন ভয়ংকর হয়ে প্রতিশোধ নিতে মেতে ওঠে, কিন্তু প্রতিটি বাজিই আমি হেরে যাই। ভয়ংকর হতাশা নেমে আসে জীবনে। বাঁচার ইচ্ছেটুকু যায় নষ্ট হয়ে। নিজেকে বলি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। এবার শাস্তির মেয়াদ যাতে বাড়ে তার জন্য যা যা বেআইনি কাজ তাই করতে আরম্ভ করি। সবশেষে তাই ভাবি, না এভাবে হবে না। আমাকে স্থির সংকল্প হতে হবে। অবশেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কারারক্ষী ও সাক্ষাৎ প্রার্থীদের বশীভূত করে ঘুমের ওষুধ আনিয়ে নিই বাইরে থেকে। আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আগামী দিন আর পৃথিবীর আলো দেখতে চাইনা আমি। তাই যতগুলো ঘুমের ওষুধ আনিয়েছিলাম সব এক সঙ্গে খেয়ে রোজ কেয়ামতের বিচারের অপেক্ষায় রইলাম। হায় আল্লাহ, তুমি আমার ক্ষমা করো। আমার নিষ্ঠুরতায় যারা জীবনের পথ হারিয়ে ফেলেছে, তাদের নতুন পথের সন্ধান দিও। আমার মৃত্যুর জন্য কেবল মাত্র আমিই দায়ী। আমার জন্য যেন কাউকে কোন হয়রানি হতে না হয় সেই অনুরোধ রেখে গেলাম। হায় খোদা! ডালিম।
