ওদের কথার মাঝে, সেলিনা এলো কফি এবং কিছু টিফিন নিয়ে–মিনতি সেন বললেন, তুই বোস মা, আমি দেখি, তোর মা কি করছে। ও বলল তুমিই বোসনা। আমি মাকে একটু সাহায্য করছি। ও চলে গেল। প্রতীম চৌধুরী বললেন, ভীষণ ভাল মেয়ে এই সেলিনা। আপনি ওকে আগে চিনতেন নাকি। নামে চিনতাম। আজই প্রথম পরিচয়। তা আপনার বাবা কেমন আছেন? উনি নেই। উনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, সরি, ভেরি সরি। তারপর বলেন দেখুন না যে কটা কথাই জানতে চাইলাম তার উত্তরে সরি না বলে উপায় নেই। খুব খারাপ লাগছে।
প্রতিম চৌধুরী যেন কথা হারিয়ে ফেললেন, আর কি বলবেন। তার এতদিনের স্বপ্ন যা তিনি একান্ত গোপনে লালন করে এসেছেন তা যেন মুহূর্তে ভেঙে খান খান হয়ে গেল। যার জন্য তিনি এই দীর্ঘ দিন প্রতীক্ষায় ছিলেন, তিনি থেকেও নেই, তার স্বপ্নে না তার কল্পনায়। আর প্রান্তিক কখনই বলেনি কে তার মা, কে তার বাবা। হঠাৎ কেন যেন প্রতিমের মনে হয় প্রান্তিক জানে তার মায়ের কথা এবং আমাকেও জানে। কেন যে নীলাঞ্জনা এসে বল্লেন, তুমি যাও মিনতি সেলিনা তোমাকে ডাকছে?
১১. নীলাঞ্জনা বসলেন
নীলাঞ্জনা বসলেন সামনের একটা চেয়ারে। বললেন, আপনার মতো একজন স্বনামখ্যাত ম্যানেজার আমার এখানে এসেছেন, কি যে ভাল লাগছে? আমারও ভাল লাগছে আপনাদের মধ্যে আসতে পেরে। তা হলে তো মাঝে মাঝে আসতে পারেন। দেখি। কফির পেয়ালা শেষ করে, প্রতীম বাবু বললেন, আমাকে যে এবার উঠতে হবে? এত তাড়াতাড়ি তো ওঠার কথা ছিল না। তাছাড়া আপনার জন্য আমার মেয়ে যে এত রান্না করল সে গুলো কি হবে? আমি খাবো সে কথাতো ছিল না। তা হয়তো ছিল না, কিন্তু প্রান্তিক আপনাকে না খাইয়ে ছেড়ে দেবে তা আপনি ভাবলেন কি করে? তারপর জানতে চাইলেন এখানে কি কোন অসুবিধা হচ্ছে আপনার। না না অসুবিধা কিছু নয়। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করব। আপনাকে? বলুন। যতদূর জানি প্রান্তিকের মা এই কলকাতাতেই থাকেন, তা হলে ও আপনার কাছে থাকে কেন? একটু হাসলেন নীলাঞ্জনা, বললেন, মিনতিকে জিজ্ঞাসা করেননি? না জিজ্ঞাসা করা হয়নি। কেন? আর তাছাড়া বললেন যে যতদূর জানি। ওর মা এই কলকাতাতেই থাকে, আগে চিনতেন নাকি ওকে। প্রতীম চৌধুরী বললেন বলা কি ঠিক হবে? অতীততো অতীতই তাইনা নীলাঞ্জনা দেবী। সব অতীত, অতীত নয় মিঃ চৌধুরী বললেন নীলাঞ্জনা আরো বললেন, কোন কোন অতীতকে মনে হয় সব সময় তা বর্তমান। আমি বরং ওকেই পাঠিয়ে দিচ্ছি, আপনি ওকেই জিজ্ঞেসা করুন। ওর ছেলে কেন আমার কাছে থাকে। না থাক। থাকবে কেন? মনে হচ্ছে কী যেন লুকাচ্ছেন? কিছুই লুকাচ্ছিনা। আমি শুধু ভাবছি? কি ভাবছেন? আর একদিন বলব। কেন আজকে বলা যায় না? হয় তো যায় তবুও থাক। সেলিনা এসে বলল, মা, ওনাকে নিয়ে ও ঘরে এস। তুই যা, আমরা আসছি। নীলাঞ্জনা দেবী বললেন চলুন ওরা আপনার জন্য বসে আছেন। সত্যি খেতে হবে? নীলাঞ্জনা স্মিত হেসে বললেন, জোর দবরদস্তি করা হয়তো ঠিক হবে না, কিন্তু আপনি কিছু না খেলে, মনে হবে, আপনার আমাদের পছন্দ হয়নি। এই দেখুন, এই আপনাদের এক দোষ। আমাদের দোষ? আপনি আমাদের মতন কাউকে চেনেন নাকি। আর কথা না বাড়িয়ে প্রতীম বাবু বললেন, না চলুন।
সেলিনা বলল, তোমরা বোস মা, আমি পরিবেশন করছি। তুই বোস মা, আমি পরিবেশন করি। প্রতীম চৌধুরী বললেন, আমার মনে হয়, আমরা সবাই এক সঙ্গে বসতে পারি, তাতে তো কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আমি বললাম সেই ভাল। মা, তুমি বসবে না কেন? পিসি বলনা মাকে বসতে, মিনতি সেন বললেন, তোর সব কিছুতেই জবরদস্তি। প্রতীম চৌধুবী বলেন, মিনতি দেবী, ওতো ঠিকই বলেছে। আপনারা আমাকে আপনার না ভাবলেও ও কিন্তু আমাকে আপন ভেবেই একথা বলেছে। যদি আমার সঙ্গে এক সাথে বসতে আপত্তি থাকে, তাহলে অবশ্য থাক। তারপর সেলিনাকে বললেন, সেলিনা, তুমি যা দেওয়ার দিয়ে দাও। আমাকে তো আবার যেতে হবে অনেকটা পথ।
এরপর মিনতি সেনের আর প্রতিবাদ করা চলে না। বললেন ঠিক আছে, তা হলে সেলিনা একসাথে সবাইকে দিয়ে দে। নীলাঞ্জনা পিসি এবং সেলিনা বাজার করেছে রান্না করেছে, যা কিছু আয়োজন সব তাদের ইচ্ছেয়। আমি শুধু নীলাঞ্জনা পিসিকে বলেছিলাম, মিনতি সেনের একটা অতীত আছে, যাকে নিয়ে সেই অতীত, তিনিই প্রতীম চৌধুরী। দীর্ঘদিন ওদের মধ্যে কোন যোগাযোগ নেই। দেখনা, যোগাযযাগটা তুমি ঘটিয়ে দিতে পার কিনা। মানে ঘটকালিটা আমাকে করতে হবে, বলেছিলেন নীলাঞ্জনা পিসি। না পিসি, সে এক বেদনাময় অতীত। তারপর তাদের সম্পর্কে যা জানি সব বললাম পিসিকে, এমনকি মিনতি সেনের বাবার চিঠিটা পর্যন্ত। নীলাঞ্জনা সব শুনলেন, কিন্তু কোন মন্তব্য না করে বললেন, উনি কবে আসবেন? রবিবার।
প্রতীম চৌধুরী বললেন, সেলিনা এত আয়োজন করেছে কিন্তু এত কিছু খাওয়ার অভ্যেস তো নেই। বোঝতো, নিজের হাতে না হলে হোটেলের খাবারে পেট ভরাতে হয়। এত কি খাওয়া যায়? নীলাঞ্জনা বললেন, এ আপনার ভারি অন্যায়। বাংলাদেশে কি মেয়ের অভাব, কাউকে কি আপনার পছন্দ নয়? আমার পছন্দ নয় কথাটা ঠিক ওরকম নয়। বরং উল্টো আমাকেই কারো পছন্দ নয়। এ আপনার মিথ্যে অভিযোগ, যদি রাজী থাকেন, আমি কিন্তু ঘটকালি করতে পারি। দেখতে পাচ্ছি মিনতি সেন মুখ নীচু করে খেয়ে যাচ্ছেন, কারো কোন কথার বিশেষ কোন উত্তর দিচ্ছেন না। প্রতীম চৌধুরী বললেন ধন্যবাদ নীলাঞ্জনা দেবী। আর এই বয়সের ঘটকালি করার দরকার নেই। এতদিনেও যখন জীবনে কেউ আসেনি। বাকি দিনগুলো নাইবা কেউ এলো। তারপর হঠাই মিনতি সেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি যে কোন কথাই বলছেন না মিনতি দেবী। মিনতি সেন বললেন, আপনারা বলছেন, আমি শুনছি। সবাই যদি বলি তা হলে শুনবে কে? তা অবশ্য ঠিক।
