নীলাঞ্জনা পিসি রবিবারে মিনতি সেনকে নিমন্ত্রণ করেন। আমার ইচ্ছা ছিল অশ্রুকণাকেও বলা হোক। যদি খোলামেলা কিছু আলোচনার ভিতর দিয়ে তার মনের কোন পরিবর্তন হয়। কিন্তু কোন দিক থেকে তার নাম না ওঠায় আমিও বেশী কিছু বলিনি।
প্রতীম চৌধুরী এলেন সন্ধ্যার একটু আগে। মিনতি সেন তখনো আসেন নি। সেলিনা বয়োজ্যেষ্ঠের সম্মানে তাকে প্রণাম করলে নীলাঞ্জনা বলেন, আমার মেয়ে। ও তুমি সেলিনা। তুমিতো বিখ্যাত লোক। খুব ভাল লাগছে তোমার সঙ্গে পরিচিত হয়ে। ও একটু লাজুক হেসে বলল, কেন লজ্জা দিচ্ছেন, আমিতো সামান্য একটা মেয়ে আমার যা কিছু কৃতিত্ব তা আমার মা আর প্রান্তিক ভাইয়ের। নীলাঞ্জনা হাসি হাসি মুখে তাকালেন ওর দিকে। প্রতীমবাবু বললেন, আন্তর্দেশীয় প্রতিযোগিতায় নামবে না? ভাবছি, বলল সেলিনা। ভাবছি কেন? অবশ্যই আন্তর্দেশীয় প্রতিযোগিতায় নামবে। আমি বললাম, ও চাইছেনা আর আমাদের ওপর নির্ভর করে কোন কিছু করতে? কেন? তোমরা তো ওর আপনার লোক, তোমাদের উপর নির্ভর করতে ওর লজ্জা কোথায়? কলিং বেল বেজে উঠলো।
তার মানে মিনতি সেন এসেছেন? সেলিনা এগিয়ে যেতে চাইলে, আমি বললাম, তুমি কথা বল আমি দেখছি। আমি দরজা খুলেই বললাম, এত দেরি হল যে। আমার জন্য খুব চিন্তা করছিলি? তা তোর পিসি বারবার করে বললেন, আজ যেন অবশ্য একবার আসি, তা তোদের এখানে কি কোন উৎসব অনুষ্ঠান আছে নাকি? কই নাতো। তারপর বললাম, এস ভিতরে এস।
ভিতরে এক পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালেন মিনতি সেন। ভদ্রলোককে ভীষণ চেনা চেনা মনে হচ্ছে কে ইনি? আমি বললাম, তুমি ভিতরে এস বলছি। মিনতি সেন অন্য ঘরের দরজা দিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। নীলাঞ্জনা সে ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন। কি ব্যাপার? আপনি ওঘরে না গিয়ে এ ঘরে এলেন যে। না এমনি, বললেন মিনতি সেন, তারপর বললেন উনি কে? ভীষণ চেনা চেনা মনে হচ্ছে। নীলাঞ্জনা বললেন আসুননা ও ঘরে। কি জানি কেন, মনে হল মিনতি সেন যেন হাফাচ্ছেন, তিনি যে প্রতীমবাবুকে চিনতে পারেননি তা নয়, কিন্তু উনি এখানে কি ভাবে? আর কেনই বা এ ব্যাপারে তাকে অন্ধকারে রাখা হল।
কতবছর হয়ে গেছে। মনের অবচেতনায় কখনো তাকে ভুলে যেতে পারেননি মিনতি সেন। জুলপির কাছে পাক ধরেছে। সুন্দর ভাবে গোফ দাড়ি কামানো। সুঠাম সুন্দর শরীর। ব্যক্তিত্ব যেন ঠিকরে পড়ছে সমস্ত অবয়ব থেকে। আর আমি? ওর আকুলতাকে দু হাতে ঠেলে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আর কোন দিন আসবেন না আপনি। বলেছিলেন, আসবো না মিস সেন। শুধু যদি জানতাম কি আমার অপরাধ? বলেছিলাম, অপরাধ ভাগ্যের তবু আপনি আসবেন না। বিনা কারণে আমাকে এই ভাবে দূরে সরিয়ে দিয়ে শান্তি পাবেন কি মিস সেন? পারবেন এক নিরাপরাধ যুবককে এই ভাবে দূরে সরিয়ে রাখতে? কখনো কি মনে হবে না কি অপরাধ আমার? কেন ওকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছি? আমার কিছু বলার নেই মিঃ চৌধুরী। তবু আপনি আসবেন না। তা আসব না, কিন্তু অপেক্ষা করব, যতদিন না আমাকে আপনার গ্রহণ করার মানসিকতা জন্মায়। তারপর ঐ ছোট্ট চিঠি। আজো তা বয়ে নিয়ে চলেছি। কিন্তু কেন? এখনো কি মনের অবচেতনায় বেঁচে আছে প্রতীম নামে ঐ সৌম্য চেহারার মানুষটি। কিন্তু আজ কিছুই তো জানিনা ওর সম্পর্কে। মনে মনে তাকে খুঁজেছি কিনা তাও জানিনা। কিন্তু এ কথাতো অস্বীকার করতে পারবোনা যে মানুষটিকে আমি আজো ভুলতে পারিনি।
আমি বললাম, যাবে না মা ও ঘরে, উনি একা বসে আছেন। হ্যাঁ যাই, কিন্তু একে তুই খুঁজে পেলি কোথায়? আর পেলিই যদি আমাকে কেন আগে বললিনা। সেটা হয়তো আমার অন্যায় হয়েছে, কিন্তু এখন যা তুমি করছ তাতে তো আমার নিজেকে অপমানিত মনে হচ্ছে? চলনা ও ঘরে।
মিনতি সেন এলেন আমার সঙ্গে। বললাম, আমার মা, মিনতি সেন। উনি যে ভীষণ অবাক হয়েছেন, তা ওর চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে? নমস্কার করে বললেন, তোমার মা? হ্যাঁ, আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস না হওয়ার কথা নয় প্রান্তিক, তুমি বলনি কেন তাই ভাবছি। আমি বললাম তোমরা কথা বল মা; আমি আসছি। প্রতীম চৌধুরী বললেন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন। মিনতি সেন বসলেন। প্রতীমবাবু বললেন, বহু দিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা। কেমন আছেন? ভালো, আপনি? ভালো, তা আপনি একা কেন? প্রান্তিকের বাবা কোথায়? তাকে নিয়ে এলেন না। ভীষন লজ্জিত হলেন, মিনতি সেন। বললেন উনি নেই। সরি অকারণে আঘাত দেওয়ার জন্য। আপনার সঙ্গে যে এ ভাবে আবার দেখ হবে ভাবিনি। প্রান্তিককে আপনি আগে চিনতেন? আগে চিনতাম কি না, হ্যাঁ তা চিনতাম বৈকি? ও কি একটা গবেষণা করবে বলে আমার অফিসে একদিন গিয়েছিল। দ্বিতীয় বার দেখা হয় ওর বোধ হয় বন্ধু হবে, অশ্রুকণা নামে একটি মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলাম আমার অফিসের এক সহকর্মীর জন্য। ছেলেটি খুব ব্রিলিয়ান্ট নাম সজল রায়। খুব ভাল। অশ্রুকণাও খুব ভাল মেয়ে, প্রথম শ্রেণীর স্নাতক। তাতে কি হবে, ওতো এ বিয়েতে রাজী নয়। কেন? এত ভাল ছেলে, রাজী নয় কেন? তাতো বলতে পারবোনা। এই সংবাদ দেওয়ার জন্য প্রান্তিক গত পরশু দিন। আমার অফিসে গিয়েছিল। ও নিমন্ত্রণ করল তাই চলে এলাম। কিন্তু আমার একটা জিনিষ খুব অবাক লাগছে। আপনি ওর মা, অথচ ও আছে ওর পিসির কাছে। হিসাব মেলাতে পারছি না। মিনতি সেন বললেন সব হিসাব মেলেনা মিঃ চৌধুরী। এতো সেই সিঁড়ি ভাঙা অংক। মনে হয় যেন মিলে যাবে, কিন্তু সামান্য ভুলে আরো কয়েকটি সিঁড়ি তৈরি করে দেয় মাত্র। যাকগে সে সব কথা আপনি একা এলেন কেন? এটাই ভাগ্য। কিন্তু ওসব কথা থাক খুব ভাল লাগছে আপনাকে দেখে। প্রান্তিকের মত এক উজ্জ্বল রত্নের আপনি মা এটা যে কত বড় গর্বের তা আপনাকে বোঝাতে পারবো না।
