ভ্রমর কিছু বলল না। বাইরে কয়েকটা পাতা উড়ে-উড়ে পড়ল গাছি থেকে। সনসন করে বাতাস বয়ে গেল এক দমক। আজ সকাল থেকে বাতাসটা শান্ত হয়েছে অনেক। কুয়া থেকে জল তুলছে আয়া। চাকার শব্দ ভেসে আসছে, আয়াকে দেখা যাচ্ছে না।
“তাস খেলবে?” অমল জিজ্ঞেস করল।
“তাস!” ভ্রমর মুখ ফেরাল।
অমল জামার পকেট থেকে তাসের প্যাকেট বের করল, নতুন প্যাকেট। বলল, “কিনে এনেছি। এস দু-হাত হয়ে যাক।”
“আমি তাস জানি না।” ভ্রমর বলল। বুঝতে পারল, আজ যখন অমল সকাল-বেলায় বাইরে গিয়েছিল তখন এইসব করেছে, তাস কিনেছে, সিগারেট খেয়েছে, আরও কি কি করেছে কে জানে!
“তুমি কিছুই জানো না।” অমল ঘাড় উলটে কেমন একটা ভঙ্গি করে বলল, “যা বলব, অমনি বলবে আমি জানি না।…ধ্যাৎ, পয়সাটা গচ্চা গেল!”
“কে বলেছিল কিনতে?”
“কিনলাম।…দুপুরে খেলব বলে কিনলাম।” অমল বলল। ভাবল একটু, তারপর ভ্রমরকে চোখে-চোখে দেখল, বলল, “আমি দু-হাতে টুয়েন্টিনাইন, খেলার একটা কায়দা জানি। তোমায় শিখিয়ে দিচ্ছি।”
ভ্রমর মাথা নাড়ল। “না। তাস আমি খেলব না।”
“কেন?” অমল অবাক হল।
“বাড়িতে তাস খেললে মা তোমায় কান ধরে গেটের বাইরে বের করে দেবে।” ভ্রমর গম্ভীর হয়ে বলতে চাইল, কিন্তু পারল না, হেসে ফেলল।
অমল বোকা হয়ে গেল। সে কিছু বলতে পারল না। আসলে তাস-টাস কিছুই নয়; অমল নিজেও তাস খেলতে জানে না টুয়েন্টিনাইন ছাড়া; কিন্তু তাসটা সে কিনেছিল ভ্রমরের কাছে বসে সময় কাটাবার জন্যে। শুধু-শুধু একজনের মুখের সামনে বসে থাকতে কেমন লাগে, বসে থাকার কৈফিয়তও যেন থাকে না। তাস থাকলে খেলার নাম করে বসে থাকা যায়, গল্প করা যায়। কিন্তু সে জানত না এ-বাড়িতে তাস নিষিদ্ধ।
কেমন ক্ষুণ্ণ হয়ে অমল বলল, “তোমাদের বাড়িতে সবই বারণ। তাস তো ইনোসেন্ট খেলা!”
“মাকে বলো। ভ্রমর আড়চোখে অমলকে দেখল, ঠোঁট টিপে হাসল।”
অমল তাসের প্যাকেট হাতে তুলে নিল। কি করবে ভাবছিল যেন। শেষে হঠাৎ কি খেয়াল হল, জানলা দিয়ে তাসের প্যাকেটটা ছুঁড়ে মাঠে ফেলে দিল। দিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলল, “ঠিক আছে। আমি আর কিছু আনব না। প্রমিস করছি…।” বলে অমল উঠে পড়ল। এবং ভ্রমরকে অবাক করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। আর এল না।
ভ্রমর অনেকক্ষণ একই ভাবে বসে থাকল। সে অপেক্ষা করল। তার মনে হল, অমল ফিরে আসবে। অমল এল না দেখে ভ্রমরের খুব খারাপ লাগল। তার সমস্ত মন দুপুর বেলায় খাঁ-খাঁ করতে লাগল। জানলার বাইরে উদাস দুঃখিত চোখে তাকিয়ে সে বাকি দুপুরটুকু মরে যেতে দেখল।
বিকেলবেলায় অমলকে বাড়িতে দেখা গেল না। সে সাজগোজ করে কোথায় বেড়াতে বেরিয়ে গেল, কে জানে! ভ্রমরকে কিছু বলে নি। খুব রাগ করেছে অমল।
বিকেল পড়ে আসার পর ভ্রমর আজ একটু আলাদা করে চুল বাঁধলো, বাটির মতন খোঁপা করল, কাঁটা গুঁজল। নতুন একটা শাড়ি ভাঙল এবং যে-শাড়িটা তার নিজের খুব পছন্দ, নীল রঙ, চিকনের কাজ—সেই শাড়িটাই পরল, গায়ে পুরো-হাতা সোয়েটার দিল, ছোট শাল রাখল পিঠে। মুখে অল্প করে পাউডার মাখার সময় তার কি খেয়াল হল, সে কৃষ্ণার ঘর থেকে সুর্মা এনে চোখের কোণে অল্প করে ছোঁয়াল।
সন্ধের গোড়াতেই বোঝা গেল, আজকের শীত কালকের মতনই। বাতাস ছিল না বলে গায়ের চামড়া সকাল থেকে কেটে যাচ্ছিল না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে শীতটা যেন জমার অপেক্ষা করছিল। সন্ধের গোড়ায় শীত জমে গেল। ঘরের মাটি থেকে কনকন করে ঠাণ্ডা উঠছিল, বাইরের শূন্যতা থেকে হিম যেন সর্বক্ষণ ভেসে আসছিল, কুয়াশা থিকথিক করছিল সর্বত্র, আকাশের তারা দেখাচ্ছিল না।
অমল ফিরছিল না। বাড়িতে বাতি জ্বলে উঠল, জানলা-দরজা বন্ধ হয়ে গেল, আয়া ঘরে-ঘরে আগুনের পাত্র দিল—তবু, অমল ফিরল না। মা তার ঘরে, বিছানায় শুয়ে। দুপুর থেকে জ্বর এসে গেছে। ভীষণ সর্দি হয়েছে। কপালে উইন্ট্রোজেন মেখে, লেপের মধ্যে শুয়ে মা বাবার সঙ্গে কথা বলছে। বাবা কলেজের কাজ করছে। কৃষ্ণার কাল শেষ পরীক্ষা। জিওগ্রাফি। সে পড়তে বসে গেছে।
ভ্রমর উদ্বেগ বোধ করল। এই ঠাণ্ডায়, এতটা অন্ধকারে অমল যে কোথায় একলা-একলা ঘুরে বেড়াচ্ছে সে বুঝতে পারছিল না। অমল বড় রাগী, তার রাগের কোনো জ্ঞান নেই যেন। এই ভীষণ ঠাণ্ডায় ঘুরে বেড়ানোর কোনো দরকার ছিল না। ঠাণ্ডা লেগে ঠিক অসুখ বাঁধাবে। ভ্রমর কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিল না।
ভ্রমর যখন বেশ উদ্বিগ্ন এবং প্রতি মুহূর্তে অমলের পায়ের শব্দ গুনছে তখন অমল ফিরল। শীতে হিহি করে কাঁপছে, গলার মাফলার পাগড়ির মতন করে মাথায় বেঁধেছে কান চাপা দিয়ে, হাত দুটো কোটের পকেটে। নাকে জল, চোখ ছলছল করছে।
মনে-মনে ভ্রমরের অভিমান হয়েছিল। সারা বিকেল, সন্ধে উনি পথে-পথে ঘুরে এলেন, যেন বাড়িতে কেউ নেই। ভ্রমরের এতটা সময় কি কবে কাটল অমল দেখল না।
ভ্রমর নিজের ঘরেই ছিল, অমল কাঁপতে-কাঁপতে ঘরে ঢুকে বলল, “আজ বাইরে বরফ পড়েছে।” বলে ভ্রমরের দিকে এগিয়ে এল, “আমার হাত দুটো কি-রকম হয়েছে দেখবে—?” ভ্রমরের সামনে দাঁড়িয়ে অমল তার হাত ভ্রমরের গালে ছুঁইয়ে দিল।
ভীষণ ঠাণ্ডা। ভ্রমরের মনে হল, এক টুকরো বরফ কিংবা কনকনে জল কেউ ওর মুখে ছুঁইয়ে দিয়েছে। কেঁপে উঠল ভ্রমর। অমল হাত সরিয়ে নিল। নিয়ে দু-হাত ঘষতে লাগল, হাত ঘষতে ঘষতে মালসার আগুনের কাছে এসে বসল। আগুনে হাত সেঁকতে লাগল উবু, হয়ে বসে।
