কথা বলব-না বলব-না করেও ভ্রমর কথা বলল। গলা গম্ভীর করে বলল, “কোথায় গিয়েছিলে?”
“বেড়াতে।”
“এতক্ষণ বেড়াচ্ছিলে?”
“ঘুরছিলাম। চকবাজার ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।” অমল বলল, যেন সে আর কিছু করার পায় নি, বাজারে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে। সামান্য থেমে অমল আবার বলল, “বাড়িতে থেকে কি লাভ। বোবা হয়ে বসে থাকতে হবে। নয়ত লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে হবে।”
ভ্রমর বুঝতে পারল দুপুরের রাগের জের টানছে অমল। হয়ত রাগ করেই এ-ঠাণ্ডা খেয়ে এল।
ভ্রমর বলল, “তুমি বোবা হয়ে বসে থাক কবে?”
“থাকি। দিনের মধ্যে আঠার ঘণ্টা থাকি।”
“হিসেব করেছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। হিসেব না করে দুমদাম কথা আমি বলি না। আমি মেয়েদের মতন নই।” অমল মুখ ফিরিয়ে ভ্রমরকে দেখতে দেখতে বলল।
হাসি পেয়ে গিয়েছিল ভ্রমরের। কষ্ট করে হাসি চেপে ভ্রমর বলল, “মেয়েরা হিসেব করে কথা বলে না?”
“বাজে কথা বলে। সেন্স্লেস কথা বলে।”
ভ্রমর এবার হেসে ফেলল। তার গলায় ঢোঁক গেলার মতন সুন্দর শব্দ হল। গালে চোখে হাসি কাঁপছিল। ভ্রমর বলল, “তুমি মেয়েদের কি জানো?”
অমল আগুনের ওপর থেকে হাত উঠিয়ে নিজের গালে রাখল। সে ঝুঁকে বসেছিল বলে আগুনের তাত তার মুখেও অল্প-অল্প লাগছিল। ঠাণ্ডা মুখ গরম হয়ে এসেছিল। তপ্ত হাত গালে দিয়ে অমল আরও একটু, উষ্ণ করল তার মুখ। ভ্রমরের কথার জবাব দিল না। সে ভাবছিল, কি বলবে, কি বলা যায়।
ভ্রমর সামান্য অপেক্ষা করল। সে যখন অপেক্ষা করছিল তখন তার মনে কেমন অন্য ভাবনা এল হঠাৎ। ভ্রমর ভাবল, অমল হয়ত বলবে সে মেয়েদের একটা বড় জিনিস জানে। ভ্রমর কেমন কুণ্ঠিত হল।
আগুনের কাছ থেকে অমল উঠল। তার মাথা-কান জুড়ে আর মাফলার বাঁধা নেই, গলায় জড়ানো। ভ্রমরের দিকে তাকাল অমল। তার মুখে রাগ নেই, শীতের অসাড় ভাবটাও নেই। এগিয়ে আসতে আসতে অমল বলল, “আমি একটা মেয়েকে জানি।” বলে অমল একটি আঙ্গুল তুলে ঠোঁট চেপে হাসল।
ভ্রমর গায়ের চাদর বুকের কাছে জড়িয়ে নিল আরও। তার বুক একটু কেঁপে উঠল, গা শিরশির করল। বিছানার মাথার দিকে উঠে গুটিয়ে বসল।
বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে অমল বলল, “আমি যখন ফিরে যাব, বাড়ি থেকে চিঠি লিখে তোমায় সেই মেয়েটার কথা বলব।”
কথাটা অমল যত সহজে বলেছিল ভ্রমর তত সহজে শুনল না। তার হঠাৎ মনে হল, আর ক’দিন পরে তার ঘরে এমনি করে কেউ আসবে না, কেউ তার গালে ঠাণ্ডা হাত ছুঁইয়ে দেবে না, তাস কিনে এনে খেলতে বলবে না, রাগ করবে না। ভ্রমর অনুভব করতে পারল, তার বিছানায় বসে কেউ চোখের জল মুছিয়ে দেবার জন্যে তাকে কাছে টেনে নেবে না। কেউ ঠাট্টা করে গাইবে না, ‘ঘরেতে ভ্রমর এল…।’ কথাগুলো মনে আসতেই হঠাৎ কেমন সব ফাঁকা হয়ে গেল, যেন ভ্রমরকে কেউ দু-হাতে তুলে নিয়ে গিয়ে বাইরে শীতে এবং অন্ধকারে ফাঁকায় বসিয়ে দিল।
অমল বিছানায় বসেছিল। হাঁটুতে হাত রেখে পা দোলাতে-দোলাতে অমল ভ্রমরের দিকে তাকাল। বলল, “সেই মেয়েটার জন্যে আমার—আমার খুব খারাপ লাগবে।”
ভ্রমর মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার মুখ ক্রমশ মলিন ও করুণ হয়ে আসছিল। নিশ্বাস ভারী হয়ে গিয়েছিল।
“ভ্রমর, কাল আমার ঘুম হচ্ছিল না, কত কি ভাবছিলাম। খুব ভাল লাগছিল। আজ বিকেল থেকে আর কিছু ভাল লাগছিল না—” অমল মৃদু, গলায় মুখ নীচু করে বলল। সে আর পা দোলাচ্ছে না। তার মুখের চেহারা দুঃখীর মতন হয়ে উঠেছে।
ঘর হঠাৎ নীরব এবং স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হল, কোনো অনন্ত সমুদ্রের আলো-ঘরে দুটি পাখি বসে আছে। তারা আজ অতি ঘনিষ্ঠ কিন্তু তাদের কাল সকালে ভিন্ন পথে উড়ে যেতে হবে। চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতন একটি আবহাওয়া ঘনিয়ে উঠল ঘরে। অমল মুখ হাঁ করে শ্বাস ফেলল।
অনেকক্ষণ পরে ভ্রমর অতি মৃদু গলায় বলল, “তুমি আর আসবে না?”
“আসব। আমার আসতে ইচ্ছে করবে খুব।…কিন্তু তুমি বড় দূরে থাক।” কথাটা বলার পর অমলের কেন যেন মনে হল, ভ্রমর তার এত কাছে—তবু, কত দূর-দূর মনে হচ্ছে আজ।
ভ্রমর ডান হাত ওঠাল, চিবুকের কাছে আনল, ঠোঁটের ওপর আঙুল রগড়াল, বলল, “আমাদের খুব কাছে কোনো ভাল জিনিসই থাকে না, না? ভগবানও কত দূরে…”
অমলের বুকে হঠাৎ শূন্য, একেবারে শূন্য হয়ে গেল এখন। বুকের মধ্যে কোনো কিছুই সে অনুভব করতে পারছিল না। তার গলা বুজে আসছিল, কান্না আসছিল। অমল বলল, “ভ্রমর, আমি রোজ তোমার কথা ভাবব, আমি ঘুমোবার সময় তোমায় ভাবব।…স্বপ্নে তোমায় দেখতে পাব।”
ভ্রমরের ঠোঁট ফুলে উঠেছিল, যন্ত্রণায় গলা টনটন করছিল, কণ্ঠস্বর বুজে গিয়েছিল। ভ্রমর কোনোরকমে বলল, “আমি তোমার জন্য রোজ প্রার্থনা করব। রোজ।”
ওরা আর কোনো কথা বলল না। বলতে পারল না।
৮
ক’দিন ধরে বাড়িঘর পরিষ্কারের কাজ চলছিল। সামনে ক্রীশমাস। হিমানী নিজে দেখাশোনা করছিলেন। কথা ছিল বাড়ি চুনকাম হবে। কলেজ থেকে আনন্দমোহন লোক পেলেন না; কলেজে কিছু কাজকর্ম হচ্ছিল, শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোয়ার্টারে আসতে পারবে না। হিমানী ভেবেছিলেন বাড়ির কাজগুলো ক্রিশমাসের আগে শেষ হয়ে যাবে, না-হওয়ায় তিনি অখুশী হয়েছেন। আনন্দ-মোহন অবশ্য বলেছিলেন যে, মিস্ত্রী মজুর একবার বাড়িতে ঢোকালে তারা সহজে বেরুতে চায় না, এ বরং ভালই হয়েছে, পরে আসবে। এ-বাড়িতে কাজও অনেক, চুনকাম শুধু নয়, মেরামতির কাজও রয়েছে, দরজা জানলা সারা আছে, রঙ রয়েছে। তিন বছর অন্তর একবার করে কোয়ার্টারে মিস্ত্রী মজুর ঢোকে, যেখানে যা করার ওই একবারেই করিয়ে নিতে হবে, নয়ত পড়ে থাকবে।
