অমলকে আজ সেই রকম একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল, যে ভ্রমরের জন্যে ভালবাসা নিয়ে এসেছে। এত ভালবাসা অনুভব করাও কত তৃপ্তির, ভ্রমর আজ মনে-মনে তা বোধ করতে পারছে। তার মনে হচ্ছিল, আর কিছু আকাক্ষা নেই ভ্রমরের। সে বাবা মা কৃষ্ণার কাছেও আর ভালবাসা চায় না। অমল তার সকল দুঃখ পূর্ণ করে দিয়েছে।
মাঝে মাঝে ভ্রমর সন্ধের ঘটনাটির কথা বেহুঁশ হয়ে ভাবছিল। সে দেখছিল, যা ঘটেছে তা খুব গোপনে এবং সবজনের অজ্ঞাতে ঘটেছে। এই গোপনতা তার মনে কোনো রকম ভাতি আনিছিল না। ভ্রমর আজীবন গোপনেই সব করেছে, তার ঈশ্বরপ্ৰেম গোপনে, তার সমস্ত দুঃখকষ্ট সহ্য গোপনে, সে বরাবর তার শরীর মন গোপন করেই রেখেছে, গোপনতার এবং নীরবতার মধ্য দিয়েই তার জীবন কেটে যাচ্ছিল। সে কখনও প্রকাশ্যে কিছু চায় নি। গোপনতাই তাকে তৃপ্তি দিত। সে এই নিভূতিটুকুই পছন্দ করত।
স্বভাববশে ভ্রমর গোপনতাকেই উচিত এবং সঙ্গত বলে মনে করছিল। গোপনতা এক ধরনের পবিত্রতা। মানুষের জীবনের অথবা মনের সমস্ত কিছু প্রকাশ্যে হয় না। হওয়া উচিত নয়। সুন্দর সৃষ্টির ও ভালবাসার খুব কম জিনিস প্রকাশ্যে হয়। ফুল কখনও চোখের সামনে পাপড়ি মেলে না, ভ্রমর দেখে নি। চোখের আড়ালেই একদিন ভগবান এই জগৎ সষ্টি করেছিলেন, জেহোভা আলো আকাশ জল মাটি নক্ষত্র সষ্টি করেন যখন, তখন কে তার সৃষ্টি দেখেছিল!
ভ্রমর স্বাভাবিক নারীজনোচিত সতর্কতা এবং মনোভাববশে জীবনের কতকগুলি অনুভূতিকে অত্যন্ত সঙ্গোপনে লালন করতে চাইছিল। অমলের স্পর্শে তাকে কেবলমাত্র পুরুষের ভালবাসা অনুভব করতে দেয় নি, ভ্রমর আরও কিছু-কিছু, আশ্চর্য ইচ্ছা অনুভব করেছিল। সেই ইচ্ছাগলি তাকে মাঝে-মাঝে বিব্রত ও লজ্জিত করছিল। ভ্রমর জোর করে এ-ধরনের ভাবনাকে সরিয়ে দিচ্ছিল। সে কুণ্ঠিত হয়ে ভাবছিল, এ-সব চিন্তা পাপ। নিষিদ্ধ ইচ্ছাগুলিকে ভ্রমর অন্ধকারে ভর্ৎসনা করছিল।
ভ্রমরের আজকের চেতনা অতিরিক্ত রকম বিস্তৃত ছিল। যেন সমুদ্র। সেখানে কোনো ঝড় বা ঢেউ উঠবে না, এমন নয়। ভ্রমর কখনও-কখনও ঝড়ে পড়ছিল, ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছিল—তবু, সে তার চেতনাকে অমলিন রাখার চেষ্টায় শান্ত হতে চাইছিল। সে বার বার মনে-মনে বলছিল: না, না, না। সে যাকে না বলছিল সে ওই খল সাপ, জেহোভার তৈরী করা উদ্যানে যে ঢুকে পড়েছিল।
মনের কয়েকটি রন্ধ্র ভ্রমর বন্ধ করে দিল। সে সবরকম দৃশ্য দেখতে চাইছিল না। যা সুন্দর, যা প্রেম এবং যা পবিত্র বলে ভ্রমর জানে সেগুলি খুলে রাখল, এবং নিজেকে তাদের মধ্যে বিছিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরের দিন সকাল থেকে অমল এবং ভ্রমরের মধ্যে অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলা চলল যেন। ভ্রমর সকালে অমলকে ডাকল, অমল ঘুমোচ্ছিল, উঠল না। ভ্রমর রাগ করল। অমল যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন বেলা হয়েছে; তার মনে হল, ভ্রমর তাকে ডাকে নি: অমল অভিমান করল। চা দেবার সময় ভ্রমরই চা করে দিল। হিমানীমাসির কাল ঠাণ্ডা লেগেছে, ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল খুব, রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে ভীষণ ভুগিয়েছে। ঠাণ্ডা লেগে আজ হিমানীমাসি শয্যাশায়ী, গা হাত মাথা ব্যথা করছে, চোখ ফুলে গেছে।
চায়ের সময় ভ্রমর দু-চারটি কথা বলল। অমলের দিকে ভাল করে তাকাচ্ছিল না। অমলও কেমন আড়ষ্ট হয়ে থাকল।
একটু বেলায় দুজনে ভাব হল আবার। বাগানে রোদে দুজনে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ভ্রমর জমাদারকে দিয়ে মাঠ পরিষ্কার করাচ্ছিল। সামনে ক্রীশমাস। অমল পায়চারি করছিল, ফুল দেখছিল সকালের; রোদ দেখছিল, আকাশ দেখছিল; সব যেন আজ দেখার মতন।
কৃষ্ণা যখন স্কুলে যাচ্ছে তখন আবার দুজনে আলাদা হয়ে গেছে। ভ্রমর কি বলেছিল যেন, অমল কান করে শোনে নি। না শুনে অমল অকারণে বাড়ি ছেড়ে বাইরে বেড়াতে বেরিয়ে গেল। ভ্রমর খুব রাগ করেছিল।
দুপুর বেলায় আবার অন্য রকম হল। ভ্রমরের ঘরে মধ্যবেলার রোদ ছিল, বিছানার পায়ের দিকে রোদের কণা গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে ঝরছিল, একটি চড়ুই ঢুকে ফরফর করে উড়ছিল, পালিয়ে যাচ্ছিল, ভ্রমর বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে ছিল। তার গায়ে চাদর। মাথার চুলগুলি বালিশের পাশে ছড়ানো ছিল। অমল কখন চোরের মতন ঘরে ঢুকে ভ্রমরের চোখের পাতায় ফুঁ, দিল। ভ্রমর জেগে উঠল। চোখের সামনে অমলের মুখ দেখে চমকে যেন বালিশ থেকে মাথা তুলে উঠে বসল। গায়ের চাদরটা টেনে নিল সামান্য।
অমল দুষ্টুমির চোখে হাসছিল, তার মুখ চকচক করছিল রোদে। “খুব ঘুমোচ্ছে!” অমল বলল, “বেশ মজায় আছি!”
ভ্রমরের রাগ হয়েছিল সামান্য। সে এই মুহূর্তে একটা স্বপ্নই যেন দেখতে যাচ্ছিল, অমল এসে ভাঙিয়ে দিল। ভ্রমর বলল, “ঘুম পেলে ঘুমোব না!”
অমল বিছানার ওপর লাফিয়ে উঠে বসল, লোহার স্প্রিং দুলে উঠল। দু-দিকে দু-হাত রেখে অমল ছেলেমানুষের মতন স্প্রিং নাচাতে লাগল, বলল, “তুমি কি করে ঘুম মারছ কে জানে! আমি ঘুমোতে পারছি না।
ভ্রমর পা গুটিয়ে নিল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। হাত আড়াল করল মুখের কাছে। একটু হাই উঠল। “আমি অনেক সকালে উঠেছি।”
“তাতে কি! আমি কাল সারা রাত ঘুমোই নি।”
ভ্রমর অমলকে দেখল এক পলক। সে যা ভাবছিল তা বলল না, বরং ঠাট্টা করে বলল, “জাগন্ত মানুষকে আজ সকালে দেখেছি।”
অমল বুঝতে পারল। বুঝতে পেরে বলল, “শেষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে ওরকম হয়।…তোমার মন ‘আয় ঘুম’ করলে আমার ঘুম আসে না।”
