পরে অমলের লজ্জা এবং ভয় হয়েছিল। সে ভেবেছিল, কেউ দেখতে পেয়েছে। কিন্তু কেউ দেখে নি। অমল ভেবেছিল, ভ্রমর রাগ করবে, ভ্রমর তাকে খারাপ ভাববে। ভ্রমর রাগ করে নি, তাকে খারাপ ভাবে নি। ভ্রমর রাগ করলে কিংবা খারাপ কিছু ভাবলে ও-রকম মুখ করত না। তার মুখ তখন টলটল করছিল, আভা দিচ্ছিল রোদ-মাখা ফুলের মতন অনেকটা; সেখানে রাগ বিরক্তি ছিল না। ভ্রমর তারপর আর একটিবার মাত্র চোখ তুলেছিল। কোনো কথা বলে নি। অমল চলে এসেছিল। যদি ভ্রমর রাগ করত কিংবা তাকে খারাপ ভাবত তাহলে ফুলের মতন মুখ করে তাকে দেখত না। তার চোখের পাতা জড়ানো থাকত না।
খাবার সময় ভ্রমর কৃষ্ণা ও অমল তিনজনে বসে একসঙ্গে খেয়েছে। হিমানী-মাসিরা তখনও ফেরেন নি। খেতে বসে অমল এবং ভ্রমর দুজনেই কেমন লজ্জায়-লজ্জায় ছিল, চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না পরস্পরের দিকে। অথচ ইচ্ছে করছিল খুব। অমল চোরের মতন যখনই চোখ তুলেছে, দেখেছে ভ্রমর মুখ নীচু করে আছে, খাচ্ছে না বড়। তার মুখ নীচ, হওয়া সত্ত্বেও সে অমলকে দেখে নিচ্ছিল।
খাওয়া শেষ করে অমল তাড়াতাড়ি উঠে পড়ছিল। ভ্রমর বলল, “দুধ খেয়ে ওঠো” বলে উঠে গিয়ে আয়াকে দুধ দিতে বলল। অমল যখন দুধ খাচ্ছিল তখন কৃষ্ণা উঠে পড়ল। অমল এবং ভ্রমর খাবারঘরে হঠাৎ একলা হল। ভ্রমরকে দেখে মনে হচ্ছিল, তার চোখ দুটি ঘুমে জড়িয়ে আছে। অমল বলল, “তোমরা শুয়ে পড় মাসিমারা না ফেরা পর্যন্ত আমি জেগে থাকব।”…ভ্রমর সামান্য চোখ তুলল, “তুমি পারবে না; আয়া জেগে থাকবে।”
ভ্রমর রাগ করে নি, তাকে খারাপ কিছু ভাবে নি বুঝতে পেরে অমল আর ভয় পাচ্ছিল না, তার কোনো অস্বস্তিও তেমন হচ্ছিল না। অন্যায়বোধ তার চেতনায় আপাতত তেমন কিছু ছিল না।
এক ধরনের তীব্র নেশার মতন, অথবা কোনো অসাধারণ সুন্দর স্বপ্ন দেখার মতন, অমল তার ভালবাসার মাদকতায় এবং স্বপ্নে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল। কোনো অনুভূতিই তার কাছে স্বাভাবিক মাত্রায় ধরা দিচ্ছিল না। সে বিহ্বল হয়েছিল, উতলা হয়েছিল। ভালবাসার বিচিত্র এবং বিভিন্ন অনুভূতিগুলি তার কাছে জটিল ও অতিরিক্ত হয়ে দেখা দিচ্ছিল। সে যখন অতিরিক্ত আনন্দ অনুভব করছে, তখন সে কি কারণে যেন বেদনাও অনুভব করছিল, ভ্রমরের চিন্তায় সে কখনো পূর্ণতা বোধ করছিল; পরক্ষণেই তার মনে হচ্ছিল তার কোন ফাঁকা লাগছে সব। একই সময়ে তৃপ্তি ও বেদনা, আনন্দ ও নিরানন্দ অনুভব করার পরও তার চিন্তা ভ্রমরকে কেন্দ্র করেই ঘড়ির কাঁটার মতন ঘুরছিল। ভ্রমরের শরীরের গন্ধ, ভ্রমরের স্পর্শ, সান্নিধ্যলাভের জন্য তার ইন্দ্রিয়গুলি অস্থির হচ্ছিল। কতক-গুলি বাসনা সে অনুভব করছিল। মধুর এবং অনির্বচনীয় একটি স্বাদে তার মন এই রাত্রে আচ্ছন্ন থাকায় অমলের ঘুম আসছিল না, সে জেগে ছিল।
ভ্রমরও জেগে ছিল। সে আজ চঞ্চল বা অস্থির হয় নি। তার মনে এই মুহূর্তে কোনো বিক্ষিপ্ততা ছিল না। সে শান্ত হয়ে শুয়ে ছিল; কিছু-সুখ কিছু-বেদনায় আনত ও নম্র হয়ে সে যেন একটি অন্য জগতের দিকে তাকিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, ভ্রমর অনেকক্ষণ আগে কোনো নতুন জায়গায় বেড়াতে গিয়েছিল, স্থানটি তার কাছে বড় সুন্দর ও মনোরম লেগেছিল, সে মুগ্ধ উন্মনা হয়ে পড়েছিল, তারপর আবার এক সময় জায়গাটি ছেড়ে ফিরে এসেছে। ভ্রমরের মনের এই অবস্থাটির সঙ্গে একটি নৌকোর তুলনা করা চলে। যেন নৌকোটি কোনো কূল না পেয়ে অবিরত ভেসে বেড়াচ্ছিল, ভেসে বেড়াতে বেড়াতে কোনো একটি সুন্দর ঘাট পেয়ে গিয়েছিল, ঘাটে নৌকো বেঁধে ফেলেছিল, কিন্তু কিছু সময় পরে আবার ভ্রমর দেখল, সে ভেসে চলেছে, সুন্দর আশ্রয়টি তার চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে।
অমলকে আজ ভ্রমরের আরও ভাল লাগছিল। কেন লাগছিল ভ্রমর স্পষ্ট বুঝতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, অমল তার বড় আপনার। এত আপনার জন তার আর কেউ নয়। অমলের কাছ থেকে সে যা পেয়েছে তার জীবনে তেমন পাওনা ছিল না। ভালবাসা পাওয়ার ভাগ্য সে কোনোদিন করে নি। মা মারা গিয়েছে এমন বয়সে যখন ভালবাসা বোঝার বয়স তার হয় নি। যখন বয়স হল, তখন থেকে সে হিমানী-মা’র নিষ্পৃহ অভিভাবকত্ব সহ্য করছে, সে বাবার কর্তব্য-পালন দেখেছে: কৃষ্ণা কখনও তার দুঃখ কষ্ট একাকিত্বে গা লাগায় নি। সংসারে যা ভালবাসা, যা বোঝা যায়, যা নিয়ে রাগ অভিমান আবদার করা চলে তেমন ভালবাসা ভ্রমর কারও কাছ থেকে কখনও পায় নি। বাবার ওপর ভ্রমর মনে-মনে অপ্রসন্ন ছিল। বাবা তার মাকে দুখী করেছে, বাবা তাকে মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে হিমানী-মা এবং কৃষ্ণাকে ঘরে এনেছিল। বাবার এই কাজ নিষ্ঠুরের মতন। বাবা তার কথা ভাবে নি। বাবা মা’র দুঃখের কথা ভাবে নি। হিমানী-মাকে ভ্রমর চিরটাকাল মনে মনে অপছন্দ করে এসেছে। তার মনে হত, হিমানী-মা আত্মসুখীঃ হিমানী-মা দয়া-মায়া-মমতাহীন; হিমানী-মা এই সংসারে অন্যায়ভাবে ঢুকে পড়েছে। কৃষ্ণাকেও ভ্রমর ভালবাসতে পারত না।…তার ইচ্ছে করত, সে মনের এই সব কালিমা রাখবে না, সে সকলকে ভালবাসবে । সে তার বাবা এবং মা’র বিচার করবে না, সে বাবা-মাকে ভক্তি করবে, ভালবাসবে—কিন্তু ভ্রমর পারত না। পারত না বলে তার দুঃখ ছিল। যীশুর কাছে কতবার ভ্রমর এই ভালবাসার মন ও সহন-শক্তি চেয়ে ভিক্ষা প্রার্থনা করেছে।
