অমল বিছানায় এসে বসল। বলল, “ছেলেদের কোনো রকম গন্ধ নেই গায়ে। আমরা সবাই এক রকম।”
“তোমার আছে।” ভ্রমর বিছানার ওপর চোখ স্থির রেখে যেন স্বপ্ন দেখতে-দেখতে অস্ফুট গলায় বলল আচ্ছন্নের মতন।
অমল ভ্রমরের চোখ লক্ষ করে বিছানার দিকে তাকাল, বিছানার ওপর একটু, ভাঁজ, ভাঁজটা আমলের কেমন রহস্যময় লাগল। চোখ তুলে ভ্রমরকে দেখল। ভ্রমরের সমস্ত মুখ কি রকম টকটক করছে, যেন রক্ত ছুটে এসেছে; ভ্রমরের চোখের পাতা প্রায় বোজা, নাকের ডগাটি ফুলে উঠেছে। অমল এ-রকম মুখ ভ্রমরের দেখে নি। তার চোখে ভ্রমর এই মুহূর্তে কেমন জ্ঞান ও বোধের অতীত এক অন্যরকম ভ্রমর হয়ে উঠল।
অমল কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে হঠাৎ হাত বাড়াল। ভ্রমরের কোলের ওপর থেকে হাত তুলে নিল। তার মনে হল, ভ্রমরের হাত কাঁপছে, মনে হল, তার নিজের হাত খুব গরম। সিগারেটটা ফেলে দিল অমল মাটিতে।
“এই—” অমল আস্তে করে ডাকল।
ভ্রমর মুখ তুলছিল না। অমল আবার ডাকল। ভ্রমর আনত মুখেই থাকল। অমল নীচু, মুখ করে ভ্রমরকে দেখতে গিয়ে দেখল ভ্রমরের চোখে জল, ভ্রমর কাঁদছে। ভ্রমর কেন কাঁদছে, অমল খানিকটা যেন বুঝল খানিকটা বুঝল না। তার খারাপ লাগল। মনে বড় কষ্ট পেল। তার বুকের মধ্যেও কি-রকম করছিল।
“এই— একি!” অমল হাত বাড়িয়ে ভ্রমরের থুতনি তুলে মুখ উঁচু করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ভ্রমর কিছুতেই মুখ ওঠাবে না।
অমল ভ্রমরের আরও সামনে ঝুঁকে পড়ে ভ্রমরের মুখ তুলে ধরল। ভ্রমরের গাল ভিজে গেছে, ঠোঁট শক্ত করে ভ্রমর কান্না চাপবার চেষ্টা করছে, তার ঠোঁট থর-করে কাঁপছে।
অমল আদর করে, মায়াবশে, ভালবেসে ভ্রমরকে আরও কাছে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছিল। তখন ভ্রমর অমলের বুকে মুখ লুকোলো। না, লুকোনো নয়, অমলের বুকের কাছে তার মাথা এবং মুখ সমর্পণ করে দিল।
ভ্রমরের চুল, ভ্রমরের মুখ, ভ্রমরের সর্বস্ব থেকে যে-গন্ধ উঠল—অমল সেই গন্ধে আচ্ছন্ন ও নিমগ্ন হয়ে ভ্রমরের মুখের পাশে নিজের গাল রাখল। ওরা পরষ্পর উভয়ের হৃদয় অনুভব করে আজ দুটি গাল জোড়া করে, দুটি মুখ একত্র করে এবং ওষ্ঠ স্পর্শ করে কোনো গম্ভীর অবিচ্ছিন্ন রহস্যময় আনন্দ অনুভব করছিল।
৭
রাত্রে অমলের ঘুম ছিল না। সর্বক্ষণ সে ভ্রমরকে ভাবছিল। এই ভাবনা অন্য দিনের মতন নয়; অন্যান্য দিন সে যখন ভ্রমরের কথা ভাবত তখন সহানুভূতি করুণা মমতা ও প্রীতির মন নিয়ে ভাবত। হয়ত ভালবাসার মন নিয়েও। কিন্তু সে-ভালবাসা আজকের মতন নয়। আজ অমল তার ভালবাসাকে এত স্পষ্ট করে অনুভব করতে পারছিল যে, তার মনে হচ্ছিল সে যেন দেখতে পাচ্ছে সব।
ভালবাসাকে দেখতে পাওয়ার জন্যেই এই অনুভূতিটা তার কাছে আবিষ্কার বলে মনে হচ্ছিল। সহসা কি যেন অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটে গিয়ে সে এই নতুন দুর্লভ মূল্যবান জিনিসটা আবিষ্কার করে ফেলেছে। অমল প্রতি মুহূর্তে রোমাঞ্চিত ও শিহরিত হচ্ছিল। খুব বড় নদী, যার এ-পার ও-পার দেখা যায় না, সেই রকম নদী যদি কোনো নতুন সাঁতারু পার হয়ে আসে তবে তার মনে যে হর্ষ ও বিশ্বাস্ জাগে, দুঃসাধ্য সাধনের তৃপ্তিতে সে সর্বক্ষণ রোমাঞ্চিত হতে থাকে, অমলের মনে সেই রকম হর্ষ ও রোমাঞ্চ হচ্ছিল। নিজের এই নতুন চেতনা অমলকে প্রসারিত ও পূর্ণ করছিল। সে ভাবছিল, তার হাতে হঠাৎ এমন একটা কিছু এসে গেছে যা অত্যন্ত সুন্দর, যার অসম্ভব শক্তি, যা মানুষকে সবচেয়ে বেশী সুখ দেয়।
এই সুখ অমলকে আচ্ছন্ন করে রাখছিল। এ-রকম আশ্চর্য সুখ এবং আনন্দ অমল আগে আর কখনও অনুভব করে নি। তার মন কখনো কোনো কারণেই এত অধীর ও উতলা হয় নি। অমল হৃদয়ে অজস্র সুখ উপচে-ওঠা, সুখগুলির নরম ও অদ্ভুত ফেনা মাখামাখি হয়ে যাবার তৃপ্তি ও শিহরন অনুভব করছিল। সে বুঝতে পারছিল, তার বুক মাঝে মাঝেই থরথর করে কেঁপে উঠছে, তার হাত মুখ ঘাড় বেশ গরম, তার কপাল এবং কান জ্বালা করছে, তার চোখ ভ্রমর ছাড়া জগতের আর কিছু দেখতে পাচ্ছে না।
বাইরের প্রচন্ড শীত অন্যদিন অমলকে সঙ্কুচিত ও আড়ষ্ট করত। আজ সে এত উত্তেজিত এবং অস্থির হয়েছিল যে, অমল শীত অনুভব করতে পারছিল না। সে ঘুমের জন্য কাতর হচ্ছিল না। বরং পায়ের পাতা গরম লাগায় পা থেকে লেপ সরিয়ে দিয়েছিল। সে ঘুম চাইছিল না। মানুষ নিজেকে কোনো-কোনো সময় স্বাভাবিক নিয়ম এবং স্বভাব ও প্রকৃতির ঊর্ধ্বে তুলে আনতে চায়। অমল সেই রকম চাইছিলঃ সে তার বয়স এবং অপরিণত মনকে বাস্তব কয়েকটি বাধা থেকে মুক্ত করে প্রসারিত করতে চাইছিল। সে ভাবছিল, তার বয়স অনেক বেড়ে গেছে, সে পূর্ণবয়স্ক হয়েছে, সে নারীর প্রেম ও স্পর্শ পেয়েছে, সে আজ যথার্থ পরিণত। সাবালক এবং পরিণত ব্যক্তির মতন সে কোনো কোনো দুরূহ চিন্তাও করতে চাইছিল।
আজকের ঘটনাটি কি করে ঘটল অমল ভাববার চেষ্টা করেছিল। সে কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল হঠাৎ কেমন করে সব ঘটে গেছে। সে কিছু বুঝতে পারে নি, ভ্রমর কিছু বুঝতে পারে নি—তবু, ও-রকম হয়ে গেল। ভ্রমরকে তখন অন্যরকম দেখাচ্ছিল, ভ্রমরের জন্যে তখন অমলের বুকের মধ্যে কি রকম যে করছিল বোঝানো যায় না। বোধ হয় তখন অমল ভ্রমরকে এত বেশী নিজের করে ভাবতে চাইছিল, তার জন্যে এত কিছু করতে চাইছিল, বলতে চাইছিল, ওকে সবই দিতে ইচ্ছে করছিল যে, ভ্রমরকে তার তীব্র ইচ্ছাটুকু না জানিয়ে পারে নি। এই আকাঙ্ক্ষাই কখন গড়ন পেয়ে ভালবাসা হয়েছিল। ভ্রমরও অমলের কাছে এই ভালবাসা চাইছিল।
