কথাটা অমল আবেগবশে বলেছিল। সে আরও বলতে যাচ্ছিল কিছু। কথা খুঁজে না পেয়ে বলতে পারল না। মুগ্ধ আবেশ-চোখে তাকিয়ে থাকল।
ভ্রমর প্রথমটায় যেন বুঝতে পারে নি, বা খেয়াল করে নি। পরমুহূর্তে সে খেয়াল করতে পারল, অনুভব করতে পারল। দু-পলক অচেতনের মতন তাকিয়ে থাকল অমলের চোখের দিকে, তারপর পলক ফেলে মুখ নত করল।
দুজনেই চুপ করে থাকল। এবং দুজনেই বেশ অন্যমনস্ক ও বিমনা হয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু লক্ষ করছিল। কিছু সময় কেটে গেল। শেষে ভ্রমর বলল, “ও-ঘরে চলো; এখানে খুব ঠাণ্ডা লাগছে।”
ভ্রমরের ঘরে পা দিয়ে অমল বেশ আরাম পেল। আয়া বড় মাটির মালশায় কাঠকয়লার আগুন রেখে দিয়ে গেছে এক পাশে। ঘরের বাতাস কনকন করছিল না। খুব শীত পড়ার পর থেকে আয়া এইভাবে আগুন দিয়ে যায় রাত্তির-বেলায়, বসার ঘরে দেয়, হিমানীমাসিদের ঘরে দেয়, ভ্রমরের ঘরে দেয়। আজ বসার ঘর ফাঁকা বলে দেয় নি।
অমল এগিয়ে গিয়ে ভ্রমরের বিছানায় বসল। ভ্রমর আসছে। সে অমলকে আসতে বলে কোথায় গেল যেন। বিছানায় বসে অমল মাথার ওপরকার সিলিং দেখল। ছায়া মাখানো, অন্ধকার। ঘরের দুটি জানলাই একেবারে বন্ধ। বিছানাটা নরম। কেমন এক গন্ধ উঠছে—গন্ধটা ভ্রমরের গায়ের—অমল এই গন্ধ ঘ্রাণে চেনে। ক্যান্থারাইডিন তেল, ওটিন পাউডার আর যেন কি-কি মেশানো গন্ধ। কিন্তু ভ্রমরের শরীরের গন্ধে এর বেশীও কি যেন থাকে। দুর্বলতার গন্ধ কি? হয়ত। ভ্রমরের কোমল ও ভীরু, অসুস্থ ও শীর্ণতার কোনো গন্ধ আছে, নাকি ভ্রমরের নম্রতা ও মায়া-মমতার কোনো গন্ধ, অমল ঠিক বুঝতে পারল না।
অমল উন্মনা এবং উদাস হয়ে বিছানায় পিঠ দিয়ে লেপের ওপর শুয়ে পড়ল; তার পা মাটিতে, কোমর থেকে মাথাটা বিছানায়। শুয়ে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গাইল: ‘ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে।’
প্রথমে মৃদু, গলায়, তারপর একটু গলা তুলে গানের প্রথম দু-কলি গাইতেই ভ্রমর ঘরে এল। ভ্রমর এসেছে অমল বুঝতে পারল। বুঝতে পেরেও উঠল না। আরও একবার দু-কলি গেয়ে শেষে পিঠ তুলে সোজা হয়ে বসল।
ভ্রমর দাঁড়িয়েছিল সামনে, দরজা থেকে মাত্র দু-পা এগিয়ে এসে। অবাক, নিঃশব্দ।
অমল খুব যেন একটা বিস্ময়কর কিছু করে ফেলেছে, এমন মুখ করে বলল, “কি রকম বিউটিফুল গান দেখলে ত! গাইতে না গাইতেই তুমি এসে গেলে!” বলে অমল গলার মাফলারটা খুলে বিছানায় রাখল। “গানটা খুব সুন্দর। আমি জানি না। মাত্র দুটো লাইন জানি। বউদি গায়।”
ভ্রমর একটু সরে এল। বিস্ময় ভাব সামান্য যেন কেটেছে। আড়ষ্টতা ছিল, তবু, ভ্রমর বলল, “সবটা শিখলেই পারতে!”
অমল দু-মুহূর্ত ভাবল। ভেবেই বলল, “আমি কি জানতাম এখানে একটা ভ্রমর আছে!” বলে অমল দুষ্টুমির মুখে হাসল।
ভ্রমর কেমন বিব্রত বোধ করল। মুখ ফিরিয়ে নিল। সত্যি, অমল জানত না এখানে ভ্রমর আছে।
সামান্যক্ষণ চুপচাপ। তারপর ভ্রমর হাতের মুঠো থেকে সিগারেট বের করে বাড়িয়ে দিল। “এই নাও।…তোমার জন্যে চুরি করতে হল।” বলে কত যেন দুষ্কর্ম করেছে এ-রকম একটা ভাব করে ঠোঁট গাল গম্ভীর করল ভ্রমর।
অমল হাততালি দিয়ে উঠল আনন্দে। বলল, “পরের জন্যে চুরি করলে তাকে চোর বলে না!” হাত বাড়িয়ে সিগারেট নিল অমল। ভ্রমর একটা মাত্র সিগারেট এনেছে। ভীষণ কৃপণ। অমল কাঠকয়লার পাত্রর কাছে বসে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, “তুমি খুব কঞ্জুস; মাইজার। মাত্র একটা সিগারেট আনলে।”
“একটাই খাও। নেশাখোর হতে হবে না।” ভ্রমর বড়জনের মতন গলা করে বলল।
“একটা আমি দু-মিনিটে উড়িয়ে দেব।” অমল সিগারেট ধরিয়ে নিল।
কি ভেবে ভ্রমর বলল, “বাড়ির মধ্যে সিগারেট খাচ্ছ। যদি কেউ দেখতে পায়?”
“পাবে না। কৃষ্ণা জানে। আমি একদিন তার সামনে খেয়েছি। সে এখন পড়ছে—আসবেও না।” অমল ধোঁয়া উড়িয়ে বলল। “আয়াও এখন আসছে না।”
“আহা, আমার ঘরে যে গন্ধ থাকবে!”
“উড়ে যাবে। খানিকটা পরেই উড়ে যাবে।”
বলে অমল দরজার কাছে গেল, মুখ বাড়িয়ে বাইরেটা দেখল তারপর খুব মেজাজ করে পা ফেলে ভ্রমরের বিছানার দিকে এল। “তোমার ঘরে তোমার বেশ একটা গন্ধ আছে।”
ভ্রমর বিছানায় বসেছে ততক্ষণে। অমলের কথায় চোখ তুলে তাকে দেখল।
অমল বলল, “তোমার বিছানায় শুয়ে ছিলাম—হঠাৎ আমি গন্ধটা পেলাম। ভেরী বিউটিফুল।”
ভ্রমর সর্বাঙ্গে শিহরন অনুভব করল। তার মন যেন উষ্ণতাবশে কেমন স্বাভাবিক থাকল না। অমলের মুখের গন্ধ সে পুনরায় স্মরণ করতে পারল। তার আবার সেই গন্ধ পেতে বাসনা জাগল।
অমল এগিয়ে এসে বিছানার কাছে দাঁড়াল। বলল, “আমি দেখেছি, মেয়েদের গায়ে কি রকম একটা গন্ধ থাকে। মা’র শাড়ির গন্ধ থেকে আমি বলে দিতে পারি এটা মা পরেছিল।…তুমি বিশ্বাসই করবে না! দিদির চিরুনি এনে দাও, আমি ঠিক বলে দেব ওটা মেজদির মাথার—” বলতে বলতে অমল থামল। হয়ত তার বাড়ির মা এবং দিদির কথা মনে পড়ে গেল। সামান্য অন্যমনস্ক হল। তারপর নিশ্বাস ফেলে আবার বলল, “আমার গন্ধের নাক খুব শার্প। তোমার গন্ধটাও আমার চেনা হয়ে গেছে। একদিন টেস্ট করে দেখো—ঠিক বলে দেবো।”
ভ্রমর কিছু শুনছিল না। সে শুনতে পাচ্ছিল না। তার সমস্ত চেতনা কোনো আশ্চর্য জগতে যেন ভেসে গিয়েছিল। সেখানে কোনো অদ্ভুত শক্তি তাকে চুম্বকের মতন ক্রমাগত আকর্ষণ করছিল। ভ্রমর ঘুমের মধ্যে সময় হারানোর মতন তার অনেকগুলি প্রখর চেতনা হারিয়ে এই স্রোতে ভেসে গেল। তার রোমাঞ্চ হয়েছিল, তার ভীরুতা হৃদয়কে কম্পিত করছিল।
