“আমি শুধু, বিছানায় শুয়ে থাকি নাকি?” ভ্রমর জবাব দিল।
“না সব সময় শুয়ে থাকো না; তবে দেদার ফাঁকি মারছিলে।”
“ফাঁকি! ইস্—!” ভ্রমর চোখের ভুরু বাঁকা করে বলল, “কী মিথ্যুক!”
অমল হাসল। ভ্রমর সত্যিই সব সময় শুয়ে থাকত না; আগের মতন সংসারের নানা রকম ছোট-ছোট কাজ সে করতে পারত না আজকাল, তবু টুকটাক কিছু করত। এখনও ভোর বেলায় অমলকে সে ডেকে দেয় রোজ; মেসোমশাইয়ের ভোরের চায়ের সঙ্গে অমলকে চা করে দেয়।
“তোমাকে আজ খানিকটা ফ্রেশ দেখাচ্ছে—” ভ্রমরের দিকে তাকিয়ে ভ্রমরকে দেখতে-দেখতে অমল বলল।
“আজ আমার ভাল লাগছে।” ভ্রমর সামনের দিকে তাকিয়ে আপন মনে কথা বলার মতন করে বলল। সে আনমনা অর্গান বাজিয়ে যাচ্ছিল, ধীরে-ধীরে।
“শরীর ভাল থাকলেই মন ভাল থাকবে।” অমল বিজ্ঞের মতন গলা করে জবাব দিল। এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল, “তোমার শরীরও আজ ভাল দেখাচ্ছে। রক্তটক্ত হচ্ছে মুখে।”
ভ্রমর কিছু বলল না। আঙুল অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল বোধ হয়, অর্গানের দিকে তাকিয়ে সুরটা ঠিক করে নিল।
সামান্য সময় নীরব থেকে অমল কি ভেবে হঠাৎ গলা গম্ভীর ও ভারী করে বলল, “ভ্রমর, অনেকদিন তুমি কোনো উপাসনা গাও নি। তোমার কোনো কাজে মন নেই।” বলে অমল মুখ গম্ভীর করে থাকল।
ভ্রমর হেসে ফেলল। অমল মা’র মতন, মা’র বলার ধরন নকল করে কথাগুলো বলল। কী রকম দুষ্টু!
“তোমার খুব সাহস বেড়েছে।” ভ্রমর নকল গলায় ভর্ৎসনা করল। “দাঁড়াও, আমি মাকে বলে দেব।”
“দিও। আমি বলব, আমি ওকে উপাসনা গাইতে বলেছিলাম।”
“মা বিশ্বাস করবে না।”
“কেন?” হিমানীরানী বিশ্বাস, ভ্রমরলতা বিশ্বাস না হলে আর বিশ্বাস করা যায় না!” অমল মজার মুখ করে বলল।
“আমার নাম ভ্রমরলতা নয় মোটেই।” ভ্রমর হাসল।
অমল যেন কানই করল না, বলল, “ভ্রমররা লতাটতা ফুলটুলের কাছেই খালি ওড়ে। কি রকম একটা রাগের শব্দ করে, শুনেছ?”
ভ্রমর অর্গান বাজানো থামিয়ে দিয়েছিল। থামিয়ে অমলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল অপলকে। বলল, “তুমি ভ্রমর দেখো নি। কেমন দেখতে হয় বল ত?”
“দেখি নি! কি বলছ!…” অমল কেমন রঙ্গর চোখমুখ করে বলতে লাগল, “দেখেছি। সামনেই দেখতে পাচ্ছি।” বলতে-বলতে অমল হোহো করে হেসে উঠল।
ভ্রমর কেমন বোকা হয়ে গেল। হেসে ফেলল। এবং অকস্মাৎ সে কেমন লজ্জা অনুভব করল।
খানিক পরে অমলই বলল, “একটা গান গাও না!”
“না।”
“কেন?”…আস্তে আস্তে গাও। ভ্রমরের মতন করেই গাও।”
ভ্রমরের চোখের দুই পাতা জুড়ে লজ্জা মাখানো ছিল তখনও। বলল, “তুমি দিন দিন খুব ইয়ার্কি শিখছ!”
“একটা কিছু, যদি এখান থেকে শিখে না যাই তবে লোকে বলবে কি! দেশ-ভ্রমণ থেকে শিক্ষা পাওয়া দরকার, বুঝলে না। স্কুলে পড়েছি।” অমল আবার হাসল।
ভ্রমর বুঝতে পারছিল অমলকে আজ আর কথায় পারা যাবে না। খুব বাক্য-বাগীশ হয়েছে ছেলে। এত আনন্দের আজ কি পেল অমল, ভ্রমর বুঝতে পারল না।
টিসরি চা নিয়ে এল। ট্রেতে করে চায়ের পেয়ালা সাজিয়ে এনেছে, তৈরী চা। অমল বলল, “আমি চা তৈরী করতে বলেছিলাম। যা শীত, বরফ হয়ে যাচ্ছি। তুমি এক পেয়ালা খাও, ভ্রমর; বেশ গরম লাগবে শরীর।”
আয়া চায়ের পেয়ালা তুলে দিল অমলের হাতে, ভ্রমরকে দিল। কৃষ্ণাকেও দিয়ে এসেছে। চা দিয়ে চলে যাবার সময় ভ্রমরকে বলল, ভ্রমরের ঘরে আগুন রেখে এসেছে।
অমল চা খেতে-খেতে বলল, “আমায় একটা জিনিস খাওয়াবে?”
ভ্রমর বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। অমলের মুখে যেন কিসের ফন্দি।
“মেসোমশাইয়ের ঘর থেকে দুটো সিগ্রেট চুরি করে নিয়ে এস না। এই শীতে একটু, স্মোক করি।”
ভ্রমরের চোখের পাতার পলক পড়ল না। বড়-বড় চোখে সে তাকিয়ে থাকল। অমলের সত্যিই খুব সাহস বেড়ে গেছে। কয়েক পলক অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর ভ্রমর জিবের কেমন একটা শব্দ করল, যার অর্থ, খুব পাকামি হচ্ছে, না?
“চোখ গোল্লা করে দেখছ কি?” অমল বলল, “বিকেল থেকেই খুব সিগ্রেট খেতে ইচ্ছে করছে। বাজারে যেতে পারলে আমি একটা গোটা প্যাকেট কিনে আনতাম।”
“তুমি খুব চালাকি শিখেছ আজকাল।” ভ্রমর বলল।
“চালাকি কিসের। সিগ্রেট খাওয়া কি মদ খাওয়া?”
“তোমার জন্যে আমায় বাবার ঘর থেকে সিগ্রেট চুরি করতে হবে! খুব মজা পেয়েছ—”
“চুরি না ভাবলেই চুরি নয়। সিগ্রেট চুরিতে পাপ হয় না। আমি দেখেছি, বউদি কতবার বাবার পকেট থেকে সিগ্রেট চুরি করে দাদাকে দিয়েছে।”
“আমি এনে দেব না। তুমি নিয়ে এস।” ভ্রমর বলল। বলে একটুও হাসল না। চায়ের পেয়ালায় মুখ নামিয়ে হাসি চেপে থাকল।
অমল লক্ষ করে দেখল ভ্রমরকে, বলল, “তুমি একেবারে—একেবারে—কি বলে যেন—পিউরিটান।”
“পিউরিটান—”
“গোঁড়া। গোঁড়া বোষ্টম একেবারে।”
ভ্রমর পাতলা দুটি ঠোঁট ভেঙে হেসে ফেলল, তার সাদা সুন্দর দাঁতগুলি দেখা গেল স্পষ্ট। ডালিমের দানার মতন দেখাল। বলল, “চুরি করতে না পারলে বুঝি গোঁড়া হয়?”
অমল ঠিক জবাব খুঁজে পেল না। জবাবের জন্যে তার চিন্তাও ছিল না। ভ্রমরের সুন্দর হাসিটি সে চোখ ভরে দেখছিল।
বসার ঘরের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তবু সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ থাকায় সেই আলো ঘরের মধ্যে যেন একটু ভাল করেই ছড়িয়ে পড়েছিল। অমল ভ্রমরকে ভাল করে দেখল; মনে হল, ভ্রমরকে এত অসুখের মধ্যেও আজ বড় মধুর দেখাচ্ছে। তার ছোট্ট কপালে চুলের একটু আঁশও নেই, তার সরু দুর্বল গালে খুব পাতলা একরকম খুশী ফুটে আছে, টলটলে দুটি চোখে চাপা হাসি। দেখতে দেখতে অমল বলল, “ভ্রমর, তুমি যখন আরও বড় হবে, তোর শরীর সেরে যাবে, তখন তুমি খুব বিউটিফুল হবে।”
