এ-সব সত্ত্বেও অমল আশা করছিল, এতটা দুর্বল ভ্রমর থাকবে না। ডাক্তারে ওষুধে পথ্যে তার চিকিৎসা চলছে, সে ভাল হয়ে উঠবে, তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে।
ভ্রমরের শরীর তখন একটু ভালর দিকেই ফিরছিল।
সেদিন খুব শীত পড়েছিল। দুপুর থেকেই মনে হচ্ছিল, বাতাস যেন বরফ-কুচির মতন ঠাণ্ডা, রোদ একেবারে ফিকে লাগছিল, গায়ের হাড়মাংসে কনকনে ভাবটা এমন করে জড়িয়ে ধরেছিল যে সব সময় কুঁকড়ে থাকতে হচ্ছিল। উত্তরের কোনো হিমেল হাওয়া এসে পড়েছিল বোধ হয়।
এই রকম ঠাণ্ডার দিনে হিমানীমাসি এবং মেসোমশাই বাড়ি ছিলেন না। বিকেলের পর একটা মোটর গাড়ি এসেছিল। শীতের সব রকম সাজগোজ করে তাঁরা বেরিয়ে গেছেন। ফিরতে রাত হবে।
মেসোমশাইরা কোথায় গেছেন অমল শুনেছে। এখান থেকে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে। আজ এদিককার মিশনারীদের মস্ত এক দীনজনের মেলা আছে। সামনে বড়দিন। বড়দিনের আগে আগে প্রতি বছর একটা মেলা বসায় মিশনারী সোসাইটির লোক। অনেকটা এক্সিবিশানের মতনই। কিছু দোকানপত্র থাকে অবশ্য, কিন্তু এই মেলায় সব কিছুই “চ্যারিটি ফর পুয়োর”-এর জন্যে। আতুর সেবার উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ, পোশাক-আশাক সংগ্রহ, খাদ্য সংগ্রহ। লটারি খেলা হয়, কনসার্ট বাজানো হয়, বেবী-শো হয়।
হিমানীমাসি যাবার সময় দুটো উলের জামা, পুরনো চাদর একটা, কয়েকটা শাড়ি, আরও যেন সব কি-কি পুঁটুলি বেঁধে নিয়ে গেছেন। মেসোমশাই যাবার সময় হঠাৎ বলেছিলেন, ‘অমল, তোমার নামে এবার লটারি খেলব। যদি জিতে যাই, টাকাটা তবে তোমার নামেই ডোনেট করে দেব।’ বলে মেসোমশাই হেসেছিলেন।
অমল তখন বুঝতে পারে নি, পরে ভ্রমর তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। ‘লটারির টাকা কেউ নেয় না। চ্যারিটিতেই দিয়ে দেয়।’
হিমানীমাসিরা চলে যাবার পর অমল কৃষ্ণাকে বাগানে ডেকে নিয়ে গিয়ে খানিক ব্যাডমিন্টন খেলল। শীতের জড়তা দূর করবার জন্যেই বোধ হয়। কিন্তু বাতাসের দাপটে খেলতে পারল না, বাইরেও থাকতে পারল না। চোখে মুখে গায়ে যেন কনকনে বাতাসটা কামড় দিচ্ছিল। হিহি করে কাঁপুনি উঠছিল সর্বাঙ্গে। বিকেলের মরা আলোটুকু দেখতে দেখতে ফুরিয়ে গেল। কুয়াশা ঘন হয়ে চারপাশ ঢেকে ফেলল, ভার ধোঁয়ার মতন থিকথিক করছিল সর্বত্র।
কৃষ্ণার পরীক্ষা চলছে। কাল তার হিন্দী ভার্নাকুলার। মুখ হাত ধুয়ে পড়তে বসতে গেল।
অমল যখন ঘরে এল তখন আয়া বাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছে ঘরে-ঘরে। জানলা বন্ধ করে দিচ্ছে। ভ্রমরের সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। অমল ভাবল, ভ্রমর তার ঘরে বসে আছে।
শীতের জন্যে অমল আরও একটু বেশী রকম জামা চাপল। সে যখন কোট গায়ে দিয়ে গলায় মাফলার বেঁধে শিস দিচ্ছিল, তখন তার কানে গেল ভ্রমর কি যেন বলছে আয়াকে করিডোর দিয়ে যেতে-যেতে। মনে হল, ভ্রমর ও-পাশে কোথাও যাচ্ছে। পা দুটো ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছিল বলে অমল বিছানায় বসে মোজা পরে নিল।
আজ এখন খুব গরম চা খেতে হবে। হিমানীমাসি যখন নেই তখন অমল মনে-মনে খুব খুশী হয়ে ভাবল, আয়াকে বললেই এখন চা করে দেবে।
মোজা পরে জুতোয় পা গলিয়ে অমল যখন বাইরে আসছে তখন তার কানে অর্গানের শব্দ এল। করিডোর প্রায় অন্ধকার, কৃষ্ণার ঘরে বাতি জ্বলছে, খাবার ঘর থেকে পাতলা একটু, আলো এসে পড়েছে। অর্গানের শব্দ শুনেই অমল বুঝতে পারল ভ্রমর অর্গানে গিয়ে বসেছে। অনেক দিন পরে আজ আবার ভ্রমর অর্গানে হাত দিল।
অমল খুশী হল। করিডোর দিয়ে যাবার সময় সে একবার কৃষ্ণার ঘরে উঁকি দিল। কৃষ্ণা খুব আয়াস করে পড়তে বসেছে। বিছানায় আসন করে বসে গায়ে র্যাপার জড়িয়েছে, পা চাপা দিয়েছে লেপে।
“আরে বাব্বা, এত চাপাচুপি দিয়ে পড়তে বসেছ! ঘুমিয়ে পড়বে যে!” অমল হেসে বলল।
“না, ঘুমোবো না! কী রকম জাড়া!”
“চা খাবে?”
“আপনি বানাবেন?”
“অ্যারেঞ্জমেন্ট করছি।” অমল আশ্বাস দিয়ে হাসল। “আয়াকে বলি—”
কৃষ্ণা স্প্রিঙের ওপর দুবার যেন বসে বসেই লাফিয়ে নিল। বলল, “আয়া আমায় দেবে না।”
“দেবে। জরুর দেবে।” অমল হেসে বলল, “তুমি পড়ো। চা পাবে। ওআর্ড ইজ ওআর্ড।”
অমল হাসিমুখে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে যেতে-যেতে শুনল আস্তে করে অর্গান বাজছে। খাবার ঘরের দরজার কাছে আয়ার সঙ্গে দেখা হল। অমল চা তৈরী করে দেবার কথা বলল। সে কৃষ্ণা এবং ভ্রমরের জন্যেও চা করতে বলল।
বসার ঘরে দরজা জানলা বন্ধ। পরদা টানা। বাতি জ্বলছে। ভ্রমর অর্গানের সামনে বসে অন্যমনস্কভাবে একটা সুর বাজাচ্ছিল। অমল দেখল, অমর পোশাক-আশাকের কোনো তাচ্ছিল্য করে নি। গরম পুরো-হাতা জামা গায়ে দিয়েছে। গলার কাছে ফ্লানেলের সাদা মাফলার জড়ানো। অর্গানের রিডের ওপর তার দু-হাতের আঙুল নরম করে বুলোচ্ছিলো: মুখ তুলে অমলকে দেখল।
কাছে এসে বসল অমল। ভ্রমর গাইছিল না, অন্যমনস্কভাবে সুরটা বাজিয়ে যাচ্ছিল। আজ ভ্রমরকে সামান্য ভাল দেখাচ্ছিল। তার মাথার চুলগুলি পরিষ্কার, একটু, চকচক করছে, কপালের সিঁথিটি স্পষ্ট, পিঠের ওপর বিনুনি ছড়ানো রয়েছে। চোখমুখে একটু, সতেজ ভাব ফুটেছে যেন!
“আরে ব্বাস, আজ একেবারে অর্গান বাজাতে বসে গেছ!” অমল খুব খুশী হয়েছিল বলে ঠাট্টা করে বলল। তার মুখে তৃপ্ত হাসি।
ভ্রমর ঠোঁট খুলে আরও একটু, হাসি ছড়াল।
অমল বলল, “গায়ে তাহলে তোমার বেশ শক্তিটক্তি হচ্ছে।”
