বাদলা কেটে যখন খুব কনকনে শীত পড়ল তখন একদিন এমরের চোখ- মুখের ভাব দেখে হিমানীমাসি বললেন, “তোমার এত কথায় কথায় ঠাণ্ডা লাগছে যখন, তখন ওই ঘরটা বদলে নাও। পূবের ঘরটায় থাকো।”
এ-বাড়িতে আর একটা ঘর ছিল। ভ্রমরের ঘরে রোদ না-ছিল এমন নয়, একটু বেলায় রোদ আসত এবং তাড়াতাড়ি চলে যেত। ঘরটা উত্তরের বাতাস পেত। হিমানীমাসি যে-ঘরটার কথা বললেন সেই ঘরটা ছিল খুব ছোট, বাড়ির পিছন অংশে। মালপত্র রাখা হত কিছু কিছু। আড়াল-না-পড়া আলাদা ঘর বলে সারা- বেলা রোদ পেত, ঘর থেকে আলো মুছত বিকেল পড়ে গেলে। উত্তরের বাতাস পেত না। ঘরটার একমাত্র অসুবিধে এই, মাথার ওপরকার সিলিংটা ছিল ময়লা, এক জায়গায় ছেঁড়া, টালি চুঁইয়ে জল পড়ত বর্ষাকালে। দরজা জানলার কাঠগুলো তেমন শক্ত ছিল না।
আয়া ঘরদোর পরিষ্কার করে দিল। পাশেই তার নিজের শোবার ঘর। টিসরি যে কত কাজের লোক, তার শক্তি-সামর্থ্য দিয়ে সে কতখানি করতে পারে, ভ্রমরের নতুন ঘর সাজিয়ে দেওয়া দেখে সেটা বোঝা গেল। ছেঁড়া সিলিঙের গর্তটা সে কি করে যেন মেরামত করে দিল, দরজা জানলাগুলো ঠুকেঠাকে কাজে-চলা-গোছের করে দাঁড় করিয়ে ফেলল। তারপর সেই ঘরে ভ্রমরের খাট এল, বিছানা এল; একটা আলনা এনে রাখল আয়া; গোল মতন হালকা টেবিল এনে দিল ওষুধ- পত্র বাতি টুকিটাকি রাখার জন্যে।
অমলের প্রথমে মনে হয়েছিল, অসুখ হলে লোকে যেমন ঘরের মানুষকে সরিয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসে, ভ্রমরকেও যেন সেই রকম হিমানীমাসি আলাদা ঘরে রোগশয্যা পেতে দিল। মনে হয়েছিল, ভ্রমরকে আলাদা করে দেওয়া হল। হয়ত ভ্রমরের অসুখ হিমানীমাসিকে শঙ্কিত ও সতর্ক করেছে।
পরে কিন্তু অমলের ঘরটা খারাপ লাগল না। নতুন ঘরে ভ্রমরকে যেন খুব সুন্দর মানিয়ে গেল। এ-বাড়ির সকলের থেকে সে যেমন আলাদা, সে যেমন আড়ালে-আড়ালেই থাকতে চাইত, তার যেমন নিজের একটি শান্ত নিভৃত স্বভাব ছিল—এই নতুন একফালি আলাদা ঘর সেই রকম ভ্রমরের নিভত ও স্বতন্ত্র স্বভাবের সঙ্গে মিশে গেল। তা ছাড়া অমল দেখল, তার ঘরের পিছন দিকের জানলা খুলে দিলে, একফালি বাঁধানো উঠোনের ওপাশে, ভ্রমরের ঘর দেখা যায়। অমলের খুব মজা লাগছিল। খোলা জানলা দিয়ে সে দেখত, ভ্রমর রোদভরা বিছানায় বসে কিছু সেলাই করছে হয়ত, হয়ত একটা বই মুখে করে শুয়ে আছে, কখনও বা গালে হাত রেখে বসে আছে বাইরের দিকে তাকিয়ে। অমল পাথরের কুচি কিংবা কাগজের ডেলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিত। দিয়েই লুকোত।
ভ্রমর অবশ্য টের পেত। জানলা দিয়ে এ-পাশে তাকাত, হাসিচোখে তাকিয়ে থাকত।
“এই, কি করছ ?” অমল জানলায় দেখা দিয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করত।
মাথা নাড়ত ভ্রমর; কিছুই করছে না।
“ঘুম মারছ?”
“না।”
“আমি আমার ফাদারকে চিঠি লিখলাম। এখন একবার পোস্টঅফিস যাবো।”
“যাও!”
“চিঠিটা পোস্ট করে দিয়ে আমি আসছি।”
ভ্রমর সমস্ত মুখে হাসি ছড়িয়ে মাথা নাড়ত। এস। আমি ত বসেই আছি।
আজকাল ভ্রমরের কাছাকাছি, ভ্রমরের পাশাপাশি থাকতেই অমলের ভাল লাগে। বাইরে ঘুরে বেড়াবার সঙ্গী ছিল ভ্রমর, কৃষ্ণাও থাকত কখনও-কখনও। ওরা ঘর ছেড়ে বেরোতে পারে না বলে অমলও বড় একটা বাইরে যায় না। একদিন টাওয়ার দেখতে গিয়েছিল একাই, কোনো সুখ পায় নি। আর একদিন গিয়েছিল বেশ একটু দূরে ঝরনা দেখতে, মেসোমশাই বলে-বলে পাঠিয়েছিলেন, ভাল লাগে নি অমলের। ঝরনা বলেই মনে হয় নি তার। পাথর চুঁইয়ে জল পড়লেই ঝরনা হয় নাকি!— দূর….।
ভ্রমর জিজ্ঞেস করেছিল, “রামধনু, দেখ নি?”
“কিসের রামধনু! ওই ঝরনার আবার রামধনু!” অমল নাক কুঁচকে বলেছিল।
ভ্রমর একটু অবাক হয়ে গিয়েছিল। ঝরনাটা এত খারাপ কিছু নয়। বলেছিল, “তুমি ভাল করে কিছু দেখ নি।”
“দেখি নি: দেখতে ইচ্ছেও করল না।”
“তবে! মিছিমিছি নিন্দে করছ কেন?”
“নিন্দে আবার কি! ভাল লাগে নি, লাগে নি।—তুমি যদি আমাদের দিকে যাও ঝরনা দেখিয়ে দেব। জল পড়ার শব্দ শুনলে মাথা ঘুরে যাবে তোমার।” বলেই অমল কি ভাবল একটু তারপর ভ্রমরের চোখে-চোখে তাকিয়ে হঠাৎ বলল, “তুমি না থাকলে আমার বেড়াতে-টেড়াতে ভালই লাগে না। একা-একা!…হ্যাত্, অসুখ করে যা-কাণ্ড করলে একটা—সব মাটি হয়ে গেল।”
সত্যিই অমলের সব মাটি হয়ে গিয়েছিল। বাইরে আর তার বেরুতে ইচ্ছে করত না, ভাল লাগত না। ভ্রমরের অসুখ তাকে খুব হতাশ করেছিল, মন ভেঙে দিয়েছিল। সে এই অসুখের কথা চিন্তা করত। ভ্রমরের ওপর তার রাগ হত, দুঃখ হত। ইচ্ছে করে, নিজের অসুখ লুকিয়ে রেখে-রেখে ভ্রমর আজ এই রোগটা বাধিয়েছে। সব জিনিস কি আর চেপে রাখা যায়। মানুষের শরীর অন্য জিনিস। ভ্রমর যে কেন হোমসাইন্স পড়েছিল ভগবানই জানেন। সেই বেয়াড়া কথাটা অমলের মনে পড়ত। ইনকিউবেশন পিরিআড: ভ্রমরকে অমল শুনিয়ে দিয়েছে কথাটা— “বুঝলেন হোমসাইন্স-এর স্টুডেন্ট মশাই, একেই বলে ইনকিউবেশন পিরিআড। ভেতরে ভেতরে আপনি রোগটিতে তা দিচ্ছিলেন।”—এ-রকম বোকা কেন হয় মানুষ? বোকামির ফল এবার ভোগ কর।
ভ্রমরকে আজকাল দেখলেও বড় মায়া হয়। সমস্ত মুখটি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, যেন গালে মুখে কোথাও এক ফোঁটা রক্ত নেই। ভীষণ শুকনো দেখায়, খড়ি ওঠা-ওঠা। লাবণ্য নিবে যাচ্ছে। শীর্ণ প্রাণহীন চেহারা হয়ে এসেছে, হাত দুটি রোগা, আঙুলগুলো নিরক্ত। ভ্রমর যে এত দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে গেছে অমল বেশ বুঝতে পারে। শুধু চোখ দুটি এখনও টলটল করছে। যেন ভ্রমর বাইবেলের সেই সরল দুটি চোখ নিয়েই বেঁচে থাকবে।
