ভ্রমর বিশ্বাস করতে পারল না। বলল, “গির্জা প্রার্থনার জায়গা। তোমাদের মন্দির যেমন।”
“তুমি কি কি প্রার্থনা কর?”
ভ্রমর যেন অমলের ছেলেমানুষিতে বিব্রত হল। অমলকে দেখল, অথচ ভালো করে কিছু লক্ষ করল না। কি বলবে তার মনে আসছিল না। মাটির দিকে চোখ নামাল। ঘাসের শিষ বাতাসে মৃদু-মৃদু কাঁপছিল। হঠাৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেল ভ্রমর।
“এ প্রেয়ার ইজ এ প্লেজার।” অমল হুট করে বলল। এমনভাবে বলল যেন সে একটা দামী কথা শোনবার লোভ সামলাতে পারল না।
ভ্রমর কিছু বলল না। আগের মতনই বসে থাকল। কথাটা তার কানে গিয়েছিল।
“কথাটা কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস। বড়-বড় লোকেরা এক-একটা যা কথা বলে— দামী কথা। আমি আর একটা দামী কথা তোমায় শোনাতে পারি। আজ সকালে পড়েছি। বলবো? ‘চক্ষুই শরীরের প্রদীপ: অতএব তোমার চক্ষু যদি সরল হয়, তবে তোমার সমস্ত শরীর দীপ্তিময় হইবে।’ বলো কোথা থেকে বললাম? একেবারে মুখস্থ বলেছি।”
ভ্রমর মুখ তুলল। কিছু বলল না।
“বারে, বা! এটা তোমার বাইবেল থেকে স্যার। টেনে বার তিনেক পড়ে মুখস্থ করে ফেলেছি।” অমল খুশী গলায় বলল, “পড়তে আমার খুব ভাল লাগল। একেবারে তোমার ডেসক্রিপসান! বুঝলে ভ্রমর, এক্কেবারে তুমি!”
চোখের সামনে অমলের মুখ যেন খুব বড় হয়ে হয়ে কেমন দূরে চলে গেল, পরিবর্তে গির্জার মতন একটি অতি পবিত্র গৃহ দেখতে পেল ভ্রমর। কলাপাতার ছায়া, রোদের কয়েকটি ফিতে অপরাহ্রে বেলায় কয়েক মুহূর্তের জন্যে বুঝি এই বিভ্রম সৃষ্টি করল। তারপর ভ্রমর খুবই আচমকা শীত অনুভব করল। শীত তার সমস্ত শরীরের রোমকূপে কম্পন জাগাল। ভ্রমর কাঁপল।
অমল বলল, “রোদে বসে-বসেও তোমার এত শীত ধরে গেল?”
ভ্রমর নিজের অজ্ঞাতেই জবাব দিল, “শরীরটা ভাল নেই।”
“কি হয়েছে?”
“জ্বরের মতন।”
“দেখি—” অমল হাত বাড়াল, ঝুঁকে পড়ে ভ্রমরের কোল থেকে তার হাত তুলে নিল। এবং সঙ্গে-সঙ্গেই সবিস্ময়ে বলল, “জ্বরের মতন কি—, একেবারে সোজা জ্বর।”
ভ্রমর ভয় পেল। ভয় পেয়ে করুণ গলায় বলল, “বলো না কাউকে। লক্ষ্মীটি।… আজ আমি গির্জায় যাব।”
“তোমার মাথা খারাপ! বেশ জ্বর এসেছে।”
“সেরে যাবে।”
“কি আছে আজকে গির্জায়?”
ভ্রমর কিছু বলল না। সব প্রার্থনায় আনন্দ থাকে না। আজকের আনন্দময় প্রার্থনা থেকে সে বঞ্চিত হতে চাইছিল না।
৬
শীতের মধ্যে ক’দিন মেঘ মেঘ করছিল। শুকনো মেঘলা নয়, আকাশ চুঁয়ে জল পড়ার মতন ফোঁটা-ফোটা জল পড়ছিল। আবহাওয়া খুব কনকনে এবং বিশ্রী হয়ে থাকত। একদিন বিকেলে বর্ষার মতন মেঘ করে বৃষ্টি হয়ে গেল এক পশলা। পরের দিন সকাল থেকে মেঘ বৃষ্টি বাদলা সরে গেল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে গগন জুড়ে রোদ উঠল। এখানকার ভীষণ শীতটাও সেই সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সকাল থেকে যত ঝকঝকে সুন্দর আলো, গরম তুলোর মতন তপ্ত রোদ, তত বাতাস। দুপুরের গোড়া থেকে মনে হয়, রোদ যেন আর তাত ধরে রাখতে পারছে না, ক্রমশ নিবে আসছে। বাতাস আরও প্রখর দুঃসহ ও শীতল হয়ে ওঠে। বিকেল না ফুরোতেই দূরে পাতলা ধোঁয়ার মতন কুয়াশা দেখা যায়। অগ্রহায়ণের অপরাহ্ন যেন অতি দ্রুত সন্ধ্যা এবং অধকার এনে দিয়ে চলে যায় কোথাও।
এখানকার শীতের চেহারা দেখে অমল হয়ত মনে-মনে কিছুটা ভয় পেয়েছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতেই এই, শেষের দিকে কেমন হবে কে জানে! মুখে তার ভয় ছিল না; বলত: ‘ফার্স্টক্লাস। একেই ঠিক শীত বলে। বুঝলে ভ্রমর, শীতেই শরীর ভাল হয়। তুমি ঠিক ঠিক ভাবে থাক, তোমার চেহারাই বদলে যাবে।”
ভ্রমরের চেহারা বদলানোর দরকার হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বারের জ্বর সহজে যায় নি। বাড়িতে ডাক্তার এসেছিল। ভাল করে দেখেশুনে এক গাদা ওষুধপত্র ইনজেকশান দিয়ে গেছে। ভ্রমর খুব অ্যানিমিক হয়ে গেছে; অ্যানিমিক হয়ে পড়ায় ও এত দুর্বল, ওর সামান্যতেই ঠাণ্ডা লেগে যাচ্ছে: লিমফ্প্ল্যাণ্ড ফুলেছে। সাবধানে থাকা, ওষুধপত্র খাওয়া, বিশ্রাম এবং দুধ ফল শাক-সব্জির পথ্য পরামর্শ দিয়ে ডাক্তার চলে গেছে। তার কম্পাউন্ডার বাড়ি বয়ে এসে ইনজেকশান দিয়ে যাচ্ছে ভ্রমরকে। একদিন অন্তর আসে।
মেসোমশাই বলেছেন, ভ্রমর খানিকটা দুর্বলতা কাটিয়ে উঠলে তিনি ওকে জব্বলপুরেই নিয়ে যাবেন, বড় ডাক্তার দেখিয়ে আনবেন, সে-ব্যবস্থা হচ্ছে।
যেতে-যেতে সেই বড়দিন হবে, কিংবা জানুয়ারির গোড়া। মেসোমশাই এখন কলেজের নানা কাজে ব্যস্ত। পরীক্ষা চলছে, খাতা দেখা চলছে: তার ওপর বি. এস-সি. ক্লাসের ফোর্থ ইয়ারের ছেলেগুলোর জন্যে স্পেশ্যাল ক্লাস নিতে হচ্ছে। বাড়িতে আগের মতন সন্ধেবেলায় বসে অমলদের সঙ্গে দুটো গল্প করার সময়ও তাঁর নেই।
কৃষ্ণাও চোখের জলে নাকের জলে হচ্ছে। আজ বাদে কাল তার পরীক্ষা। সারা বছর সে যত সাইকেল চড়ে ঘুরেছে, দোলনা দুলেছে, খেলেছে, লীলার সঙ্গে হইহুল্লোড় করেছে তার একশো ভাগের এক ভাগও বইয়ের পাতা দেখে নি। এখন মেয়ে দিন-রাত ভুলে বই মুখে করে বসে আছে। হিমানীমাসি বলেছেন, ক্লাস প্রমোশন না পেলে তুমি বাড়ি ঢুকো না। লীলাদের বাড়িতে আয়ার কাজ নিয়ো। বেচারী কৃষ্ণা কোনো রকমে ক্লাসে ওঠার জন্যে বই ছেড়ে আর নড়ছে না।
হিমানীমাসি বড় অদ্ভুত মানুষ। এই যে ভ্রমরের অসুখ, তাতে তাঁর কোনো উদ্বেগ নেই। তিনি কোনো রকম অযত্ন করবেন না ভ্রমরের, আবার গায়ে পড়ে যত্নও দেখাবেন না। তাঁকে ভ্রমরের জন্যে ব্যস্ত, উৎকণ্ঠিত হতে কেউ দেখল না। তাঁর মনের ভারটা যেন এই রকম: অসুখ করেছে শুয়ে থাকো, ওষুধ খাও, দুধ ফল খাও, সাবধানে থাকো, সকাল বিকেল দু-পা বেড়াও।
