ভ্রমরকে দেখে অমল বই বন্ধ করল। বলল, “রত্নদীপ পড়ছি।” বলে হাসল।
ভ্রমর কিছু বলল না। সে সারা গা রোদে রেখে দাঁড়িয়ে থাকল।
“তুমি রত্নদীপ পড়েছ?” অমল শুধলো।
“না।” ভ্রমর মাথা নাড়ল।
“জমাট বই, খুব ভাল লাগছে। আমার হয়ে যাক, তোমায় দেব।”
ভ্রমর বইয়ের কথা ভাবছিল না। আজ সকাল থেকেই সে অমলের কাছাকাছি থাকছে না। ইচ্ছে করছিল সারাক্ষণই তবু কাছে আসতে পারছিল না। লজ্জা, নাকি ভয়, ভ্রমর নিজেও বুঝতে পারে নি।
“মেসোমশাইয়ের আলমারিতে অনেক বই আছে, ভাল ভাল বই। তুমি পড় না কেন?” অমল শুধলো।
“পড়েছি—” ভ্রমর অন্যমনস্ক ছিল বলে জবাবটা বোকার মতন হল।
“স-ব?”
“সব! না, সব নয়; পড়েছি ক’টা।” ভ্রমর অমলকে দেখল। দেখে বারান্দার দিকে তাকাল। কৃষ্ণা বসে বসে কখনও বই মুখে পড়ছে, কখনও রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সামান্য চুপচাপ। অমল হাই তুলল শব্দ করে। পা টান করল, হাত সামনে ছড়িয়ে আলস্য ভাঙল। বলল, “আজ বিকেলে কি করব তাই ভাবছি। রোববার দিন বিকেলটা একেবারে কাটতে চায় না।”
ভ্রমর অমলের দিকে তাকাল। কষ্ট হবারই কথা, একা একা সারা বিকেল সন্ধে কাটানো! গত রবিবার অমল লীলাদের বাড়ি গিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেছিল, তার আগের রবিবার একলা একলা ঘুরে বেড়িয়েছে। তারও আগের এই দিনটায় অবশ্য ভ্রমর বাড়িতে জ্বর গায়ে শুয়ে থাকায় অমল একা ছিল না।
“লীলাদের বাড়িতে চলে যেও—।” ভ্রমর বলল। রোদে মাথা রেখে ভ্রমর আঙুল দিয়ে তার শুকনো এলো চুলের জট ছাড়িয়ে নিচ্ছিল। রোদের তাত লাগছিল ঘাড়ে, বেশ আরাম পাচ্ছিল ভ্রমর।
অমল মাথা উঁচু করে ভ্রমরকে দেখল। বলল, “হ্যাত্, লীলাদের বাড়িতে সব ক’টা মেয়ে, ওদের সঙ্গে আমি কি খেলব!”
খুব সহজেই অমলের আপত্তিটা বুঝতে পারল ভ্রমর। অমলই বলেছিল তাকে। হেসে ফেলে ভ্রমর বলল, “হেরে গিয়ে রাগ!”
“রাগ!…রাগ নয়; মুখ থাকে না, বুঝলে না। লীলা দুর্দান্ত খেলে, আমি পারি না। আমার প্র্যাকটিস নেই।” বলে অমল তার নিজের অক্ষমতার জন্যে নিজেই কৌতুক অনুভব করে হাসল। কি ভেবে একটু পরে বলল, “এখানে আসার পর পরই একদিন ওই বাগানে খেলেছিলাম, তোমার মনে আছে? সেবার কিন্তু ড্র করেছিলাম।”
ভ্রমরের বসতে ইচ্ছে করছিল। বারান্দার দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণাকে দেখল কয়েক পলক। কৃষ্ণা হাঁ করে বাড়ির ফটকের দিকে তাকিয়ে আছে। সে কি দেখছে কে জানে! মাথার চুল ঘাড়ের পাশ দিয়ে বুকের ওপর আনল ভ্রমর।
“আমি ভাবছি আজ বিকেলেও বাজারের দিকে চলে যাব।” অমল বলল।
চুলের আগা থেকে জট ছাড়িয়ে, কিছু উঠে-আসা চুল হাতের আঙুলে নিয়ে জড় করছিল ভ্রমর। আজকাল তার ভীষণ চুল ওঠে। ময়লাটা ফেলে দিল।
“বাজারে গিয়ে কি করবে?” ভ্রমর শুধলো।
“এমনি। ঘুরে বেড়াব খানিক।” বলতে-বলতে কি যেন মনে পড়ল অমলের, “কাল যেন আমরা কি সিনেমা হচ্ছে দেখলাম, ভ্রমর? রাজাটাজা দেখলাম যে!”
ভ্রমর তেমন খেয়াল করে দেখে নি। বলল, “কি জানি! আমি দেখি নি।… বাজারে গিয়ে বায়োস্কোপ দেখবে?”
“দেখলে হয়।”
“যাঃ।” ভুরু কুঁচকে ছোট্ট করে যেন ভর্ৎসনা করল ভ্রমর। “বাজার বেড়িয়ে বায়োস্কোপ দেখে সময় কাটানো আবার কি! তুমি বরং…” ভ্রমর কথাটা শেষ করতে পারল না। সে ভেবে পেল না অমলকে কোন পরামর্শটা দেওয়া যায়।
ভ্রমর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে গল্প করছে দেখে অমল ভাবল তাকে বারান্দা থেকে একটা চেয়ার এনে দেয়। বলল, “তুমি বসো, আমি একটা চেয়ার টেনে আনি।”
ভ্রমর চেয়ার আনতে দিল না। বলল, “আমি মাটিতে বসছি।” বলে মাটিতে বড়-বড় ঘাসের ওপর ভ্রমর বসল, হাঁটু ভেঙে, পা ছড়িয়ে, গোড়ালিতে ভর রেখে।
অমল আবার হাই তুলল। দুপুরটা এবার পড়ার মুখে হেলে গেছে। রোদের তাত নিবে আসছে; শীতের বিকেল যেন সামান্য দূরে পা ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। কলাগাছের ওপরে লম্বা-লম্বা ছায়া পড়েছে। অমল কয়েক মুহূর্তে মরে-আসা দুপুরের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি করতে বলছিলে?”
কি করতে বলবে ভ্রমর বুঝে উঠতে পারে নি বলেই চুপ করে গিয়েছিল। অমলের কথায় আবার একটু ভাবল। বলল, “এদিক ওদিক থেকে বেড়িয়ে এস। কতটুকু আর বিকেল! সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফিরে গল্পের বইটই পড়। তারপরই আমরা এসে যাচ্ছি।”
“থাক।” অমল হাত তুলে মজার একটা ভঙ্গি করে বাধা দিল। “বলতে সব জিনিসই সোজা; তুমি একটু বইটই পড়, আমরা এসে যাচ্ছি…যেন তোমরা এই যাবে আর এই আসবে! বাব্বা, সেই রাত আটটা-টাটটা পর্যন্ত একলা বসে থাকা…। আমি ত দেখছি ক’হপ্তা।”
ভ্রমর মজার চোখ করে অমলকে দেখছিল। অলিস্যের খুব পাতলা ছায়া তার মুখে মাখানো আছে, মাথার ওপর কুটো পড়েছে গাছ থেকে, সিঁথি ভেঙে গেছে, রোদের তাত সামান্য যেন শুকনো করেছে গালের চামড়া।
ভ্রমর বলল, “আজ তাড়াতাড়ি ফিরব।”
“রাখো, তোমাদের তাড়াতাড়ি আমার জানা আছে—”
“বলছি, দেখতে পাবে যখন ফিরব। অন্য দিন কি হয় জানো, গির্জা থেকে বেরিয়ে মা-বাবা এখানে ওখানে বসে একটু, দেখা-সাক্ষাৎ করে, গল্প করে, তাই অত দেরী হয়। চার্চে গেলে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়…।”
“তবে ত কথাই নেই।” অমল চোখ কপালে তুলে নিশ্বাস ফেলল ঠাট্টা করে।
“আজ দেরী হবে না। বাবার একটা মিটিং আছে কিসের যেন!”
অমল দু-মুহূর্ত ভ্রমরের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন লক্ষ করল। বলল, “আমি একদিন গির্জায় গিয়ে দেখব তোমরা কি কর?”
