খুব নরম হাতে ভ্রমর গলার হারে গাঁথা ক্রুশটি স্পর্শ করল, মুঠোয় ধরে থাকল। সে আশ্বাস এবং নির্ভরতা চাইছিল। সে বেঁচে থাকার জন্য প্রভুর দয়া প্রার্থনা করছিল।
তার এ-সময় হঠাৎ মনে হল, ভালবাসাই মানুষকে বাঁচায়। যে-অন্ধজন, যে-কুষ্ঠরোগী এবং অন্য যারা যীশুর কৃপায় আরোগ্যলাভ করেছিল, তারা তাঁর ভালবাসার বলে অসুখ থেকে উদ্ধার পেয়েছিল। ভালবাসাই আরোগ্য; বিশ্বাস এবং ভালবাসাই সব। ভ্রমর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাইল, সে এই অ-সুখ থেকে উদ্ধার পাবে, এবং বিড়বিড় করে ভ্রমর বলল; ভয় পেয়ো না, বিশ্বাস কর।
ভালবাসার চিন্তা ভ্রমরের কাছে নতুন লাগছিল। সে যখন মুঠো খুলে তার হাতটি বুকে রাখল আবার, তখন মনে হল, তার বুকের তলা চোখের পাতার মতন কাঁপছে। কোন অজ্ঞত ইন্দ্রিয় থেকে একটি উষ্ণতা তার সমস্ত চেতনাকে উষ্ণ ও আকুল করছে।
অনেকক্ষণ ভ্রমর অসাড় হয়ে শুয়ে থাকল। তার হৃদয় দুলন্ত দোলনার পিঁড়ির মতন দুলছিল, কখনও হর্ষে কখনও বিষাদে যাচ্ছিল। অবশেষে মুখ হাঁ, করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভ্রমর, পাশ ফিরে শুলো। পাশ ফিরতে গিয়ে বুঝতে পারল তার গাল ভিজে গেছে।
ভ্রমর কেন কাঁদছে, সে-কথা সে ভাবল না। বরং এই অশ্রু তাকে আরও নিবিড় করে নিজের কথা ও অমলের কথা ভাবাচ্ছিল, সে আজ এত কথা ভাবছিল, কেননা ভ্রমর অমলের সেই মুখের গন্ধ ভুলতে পারছিল না। ওই গন্ধের আশ্চর্য চেতনা তাকে হয় পথভ্রান্ত করেছে, সে মরীচিকা দর্শন করেছে, না-হয় ভ্রমর আজ নিজেকে ঐশ্বর্যসম্পন্ন যুবতী মনে করছিল।
সে এক রকম অদ্ভুত স্বাধীনতাও বোধ করতে পারছিল, যেন তার সামনে থেকে কোনো বিশ্রী জেলখানার শক্ত কঠিন এবং ঘৃণ্য লোহার গরাদ এক একটি করে কেউ ভেঙে দিয়েছে, বা খুলে নিয়ে গেছে। সব এখন উন্মুক্ত, তার সামনে সমস্ত কিছুই অবারিত। অনেকক্ষণ এই অবিশ্বাস্য মুক্তি ভ্রমর অনুভব করতে পারে নি, খাঁচায়-পোরা পাখির মতন সে তার ডানাকে গুটিয়ে রেখে বসেছিল, তারপর কখন এক সময় বিমূঢ় ও বিহ্বল ভাব কেটে গেলে অত্যন্ত আচমকা ভ্রমর দেখল, সে মুক্তি পেয়েছে।
প্রথমে আড়ষ্ট পায়ে, ভয়ে-ভয়ে ভ্রমর তার জেলখানা থেকে বেরিয়ে এল যেন। দেখল, অমল তার সামনে। অমলকে কতক্ষণ দেখার পরও সাধ মিটল না। জীবনে এমন একজন আছে তবে যাকে দেখে-দেখে সাধ মেটে না! কী ইচ্ছেই করতে লাগল অমলের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে। মনে হচ্ছিল, অমলের চোখের মধ্যে বুকের মধ্যে মিশে গিয়ে অশরীরী অবস্থায় সে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে সব দেখে।
নিজের অস্তিত্ব হারাবার জন্যে ভ্রমর এই প্রথম আকুল হল, সে কাতর হয়ে অমলের মনের পাশে গিয়ে বসতে চাইল; যে-চোখে অমল দেখছে, যে-মনে অমল ভাবছে, যে-স্বভাব নিয়ে অমল এত সুন্দর—ভ্রমর সেই চোখ মন স্বভাব সবকিছুর অংশীদার হতে চাইছিল। একজন মানুষ কখনও অন্য একজন মানুষের মধ্যে গিয়ে মিশে যেতে পারে না। যদি পারত, ভ্রমর হতাশ হয়ে এবং আক্ষেপ করেই ভাবছিল, যদি সে অমলের মনের মধ্যে ডুবে যেতে পারত, ওর সবকিছুর সঙ্গে মিশে যেতে পারত তবে সে ধন্য ও পূর্ণ হত!
খাঁচার দরজা খুলে গিয়েছিল বলে, এবং ভয়ে-ভয়ে বাইরে এসে ভ্রমর তার মুক্তি অনুভব করতে পারল বলেই পাখির মতন তার ডানা ঝাপটে শূন্য ঝাঁপ দিল। অনভ্যাসবশে সে বেশী উড়ল না, বেশী দূর যেতে সাহস করল না। যতটুকু এগিয়ে গেল, ততটুকুতেই সে আজ গভীর আনন্দ ও তৃপ্তি পেল, রোমাঞ্চ ও রহস্য অনুভব করল।
অনেকক্ষণ ভ্রমর তার আবেগগুলিকে কুণ্ডলী করে এইসব কথা ভাবল, বহু সময় সে অমলের সেই মুখের গন্ধ নিজের চেতনায় কখনও ফিকে কখনও উগ্রভাবে অনুভব করল; তারপর একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরের দিন ভ্রমর গায়ে অল্প-অল্প জ্বর নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল। তার চোখ ছলছল করছিল, মাথা ধরে ছিল, মুখ একটু শুকনো। ভ্রমর খুব সাবধানে থাকল। সে চাইছিল না তার জ্বর বাড়ুক। ঘরে স্যারিডন ছিল, লুকিয়ে ভ্রমর একটা বড়ি খেল। স্নান করল না, গরম জলে গা মুছে নিল। আজ সে গির্জায় যাবে, গির্জায় গিয়ে প্রার্থনা করবে। সে নিজের জন্যে এবং অমলের জন্যে আজ কি প্রার্থনা করবে তাও যেন ভেবে রেখেছিল।
জ্বরটা ঠিক গায়ের না গতরাত্রের অস্থিরতার জন্যে, ভ্রমর ঠিক বুঝতে পারল না। সারাটা বেলা তার গায়ে মাঝে মাঝে কাঁটা দিল, কখনও কখনও কপাল বেশ গরম লাগল, এবং ভ্রমরের মনে প্রতিবারই এই চিন্তা এল যে, তার শরীর খারাপ থাকবে না, সেরে যাবে।
দুপুরবেলায় বেশ শীত লাগছিল। ঘরের মধ্যে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল ভ্রমরের। হাত-পা ঠাণ্ডা কনকন করছিল। কৃষ্ণা বারান্দায় রোদে গিয়ে বসে অ্যানুয়েল পরীক্ষার পড়া করছে। দেখতে-দেখতে দুটো বেজে গেল। আর কিছুক্ষণ পরেই চুল বাঁধা, পোশাক বদলানোর তাড়া দেবে হিমানী-মা। চারটে নাগাদ গির্জায় বেরুবে সকলে।
ভ্রমর ঘরে থাকার সাহস পেল না। এই শীত ভাবটা যদি আরও বাড়ে তবে জ্বর আসবে। গায়ে চাদর জড়িয়ে ভ্রমর রোদে গিয়ে দাঁড়াল, রোদ থেকে একসময় পা-পা করে কলাগাছের ঝোপের সামনে, অমলের কাছে।
অমল আজ আর বাইবেল পড়ছিল না। অনন্দমোহন তাঁর বইয়ের আলমারি থেকে আজ সকালে পুরনো বাংলা মাসিকপত্রের বাঁধানো খণ্ড, বঙ্কিমচন্দ্র আর প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থাবলী কিছু দিয়েছেন। তারই একটা হাতে নিয়ে অমল দুপুরে রোদে শুয়ে-শুয়ে পড়ছিল।
