বাবা তার পরও বার দুই দেশের দিকে গিয়েছে। একবার একলা, ভ্রমর ছিল মামার বাড়িতে। সেবারও বাবা রমামাসিদের বাড়ি হয়ে ফিরেছিল। হিমানী-মাকে এবং কৃষ্ণাকে নিয়ে বাবা আবার যখন দেশে যায় তখন ভ্রমরও সঙ্গে ছিল। কিন্তু সেবার তারা রমামাসিদের বাড়ি হয়ে ফেরে নি।
প্রথম দিন অমলকে যেমন দেখিয়েছিল, অমল কিন্তু মোটেই সে-রকম নয়। একেবারে নতুন বলে মাত্র একটা বেলা মুখ বুজে বোবা-বোবা হয়ে থাকল। বিকেল থেকেই তার মুখ ফুটল অল্প। ভ্রমরকে এটা-সেটা জিজ্ঞেস করতে লাগল।—এখানে এত সাইকেল কেন? টমটম আর টাঙায় তফাতটা কি? এখানে ক’টা স্কুল? ক’টা কলেজ? এখানে কি-রকম করে হিন্দী বলে অমল বুঝতে পারে না, তাদের দিকে হিন্দী একেবারে সোজা।
একেবারে নতুন জামা যেমন প্রথম-প্রথম গায়ের সঙ্গে মিশ খায় না, একটু আড়ষ্ট লাগে, অমলকে মাত্র দুটো দিন সেই রকম লেগেছিল, নতুন-নতুন এবং বাইরের মনে হচ্ছিল, তারপর আর লাগল না। লাগতে দিল না। খুব সহজে, একেবারে এ-বাড়ির একজনের মতন করে মিশে গেল। বরং ভ্রমরের মনে হল, এ-বাড়ির আর তিনজনের চেয়ে অমল অনেক বেশী, অনেক নিকট আত্মীয় হয়ে তার সঙ্গে মিশে গেছে। অমলকে ভ্রমরের প্রথম-প্রথম ভাল লাগত এই জন্যে যে, যেন অমল তার মা, তাদের নিজেদের দেশ, ফেলে-আসা ভুলে-যাওয়া আত্মীয়- স্বজনের জগৎ থেকে এখানে এসে গেছে হঠাৎ। সেখানকার কত কথা, যা ভ্রমর জানে না, সেখানকার অনেক গল্প, যা ভ্রমর কোনোদিন শোনে নি, বহু আচার-আচরণ হাবভাব যা এ-প্রবাসে তারা দেখে নি—অমলের কাছ থেকে সেই সব জানতে শুনতে ও দেখতে পেয়ে ভ্রমর যেন একটি উত্তরাধিকার খুঁজে পাচ্ছিল। আত্মীয়সম সেই জগতটি অনুভব করার জন্যে ভ্রমর অমলকে নিবিড় করে লক্ষ করত, তার কথাবার্তা শুনত, গল্প করত।
অমলকে মনে মনে খুব পছন্দ করছিল যখন, তখনই ভ্রমর অনুভব করল, ওই ছটফটে হাসিখুশী চমৎকার স্বভাবের ছেলেটি তার সঙ্গীর মতন হয়ে গেছে। ওকে বন্ধুর মতন লাগল। ভ্রমরের কখনও কোনো সত্যিকারের বন্ধু ছিল না, নেইও। অমলকে বন্ধুর মতন সুন্দর ও নিবিড় লাগল। তারপরই ভ্রমর অনুভব করল, তার জন্যে খুব মায়া অমলের, কত মমতা! ভ্রমরের দুঃখ-কষ্টে অমল কষ্ট পায়, ভ্রমরের জন্যে উদ্বেগ বোধ করে। একদিন ভ্রমর রাস্তায় বেরিয়ে হোঁচট খেয়েছিল, মুখ থুবড়ে পড়ে যেত, অমল ধরে ফেলেছিল; তারপর থেকে অমল এত সাবধানী হয়েছে যে, রাস্তায় সব সময়ে ভ্রমরের পাশে পাশে থাকে, একটু উঁচু-নীচু জায়গা হলেই হাত ধরে।…জ্বর হবার কথা এবং অন্য আরও অনেক কথা ভ্রমর মনে করতে লাগল। অমল সব সময় ভ্রমরের জন্যে উতলা ও অধীর কেন?
ভ্রমর আজ শুয়ে-শুয়ে অমলের এই মায়া মমতা ও করুণার কথা ভাবছিল। মনে হচ্ছিল, এতদিন সে যেন বাইবেলের সেই ডুমুর গাছ হয়ে ছিল। অফলা ডুমুর গাছ। একটি ফল ফলত না কোনোদিন। তাকে হিমানী-মা’রা হয়ত কেটে ফেলত। কিন্তু অমল এসে তার চারধার খুঁড়ে যেন সার দিয়ে দিয়েছে।
নিজেকে ফলন্ত ডুমুর গাছের মতন কল্পনা করল ভ্রমর। সে ডুমুর গাছ চিনত না। তবু নিজেকে ফলন্ত অনুভব করে তার ভাল লাগছিল।
কৃষ্ণার বিছানার দিকে শব্দ হল। ঘুমের ঘোরে কৃষ্ণা উঠে বসে আবার ধপ করে শুয়ে পড়ল, লোহার খাটের স্পিঙে শব্দ হল, বিড়বিড় করে কি যেন বলল কৃষ্ণা, ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে কথা, তারপর আবার অকাতরে ঘুমোতে লাগল।
ভ্রমর অন্ধকারে কৃষ্ণার বিছানার দিকে তাকাল। এই ঘন স্তধতা ও রাত্রি, সময় ও ঘুমের কথা তার এবার খেয়াল হল। কতটা রাত হয়েছে বোঝা যায় না। বোধ হয় মাঝরাত পেরিয়ে গেছে। গায়ের লেপ আরও ঘন করে জড়িয়ে নিল ভ্রমর। বুকের ওপর হাত রেখে শুয়ে থাকল।
শুয়ে থাকতে-থাকতে ভ্রমর চোখের পাতা বন্ধ করল। হঠাৎ মনে হল, ওর চোখের ওপর জ্যোৎস্নার আলো এসেছে, নির্মল আলো। সেই আলোর মধ্যে অমল বসে আছে। অনেকটা দূরে। একলা। অমলকে অতটা দূরে থাকতে দেখে ভ্রমর হেঁটে হেঁটে তার কাছে যাচ্ছিল ত যাচ্ছিলই। এমন সময় সে নিজের খোঁড়া পায়ে ব্যথা অনুভব করল। এবং ভাবল, অতটা পথ সে কি করে এগিয়ে গিয়ে অমলকে ডাকবে। নিজের পায়ের জন্যে ভ্রমরের বড় দুঃখ হল।
‘ভ্রমর, তোমার সব সময় যদি অসুখ হয় তুমি বাঁচবে কি করে?’—অমলের এই কথা যেন তার কানের কাছে বাজল; ম্লান বিষণ্ণ কাতর স্বরে অমল এই মুহূর্তে কথাটা আবার বলল। ভ্রমর দেখল, তার চোখের সামনে জ্যোৎস্নার আলো আর নেই।
বাঁচার কথা ভাবতে গিয়ে ভ্রমর আবার মা’র কথা ভাবল। মা অসুখের ধাত পেয়েছিল বলে বাঁচে নি। মা’র মুখে কোনোদিন হাসি ফোটে নি। কিন্তু এই অসুখ মা’র কোথায় ছিল ভ্রমর জানে। ভ্রমর বড় হয়ে সব অনুমান করতে পেরেছে। মা সংসারে ভালবাসা পায় নি। কেন পায় নি ভ্রমর জানে না। বোধ হয় এই জন্যে যে, মাকে তাদের সমাজ পতিত ভাবত; বাবা ঝোঁকের বশে মাকে বিয়ে করার পর নানাভাবে হেয় হয়েছিলেন, তাঁকে কেউ সাহায্য করে নি; বাবা ক্যাথলিক কোনো কলেজে চাকরি পান নি তখন; পেটের দায়ে বিদেশে বেরিয়ে পড়ে- ছিলেন। হয়ত বাবাও শেষ পর্যন্ত মার ওপর বিরূপ হয়ে পড়েছিলেন, হয়ত মা নিজেকে বরাবর দীন ও পাপীতাপী মনে করত। ভ্রমর ঠিক জানে না।
আজ ভ্রমর অনুভব করল, সে তার মা’র মতন মরে যেতে চায় না। বাঁচার আগ্রহ তাকে অস্থির করছিল। সে ফলন্ত ডমরগাছ হতে চায়। ঈশ্বরের কাছে ভ্রমর প্রার্থনা করল।
