বাইরে শীতের অস্থির হাওয়া বইছিল আজ, কান পাতলে হুহু শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কদাচিৎ একটি-দুটি শীতার্ত পাখি ডেকে উঠছিল। পুঞ্জীভূত কুয়াশা এবং শীতল আর্দ্র জ্যোৎস্না ভ্রমর দেখতে পাচ্ছিল না। জানলার খড়খড়ি ও শার্সি বন্ধ। ভেন্টিলেটারের গর্ত-দিয়ে-আসা আলোর একটু আভা সিলিঙের কাছে ঝুলে আছে।
গলা পর্যন্ত লেপ টেনে ভ্রমর এই স্তব্দতা ও সুপ্তির মধ্যে জেগে ছিল। তার ঘুম আসছে না, ঘুম না আসায় সে বিরক্ত বা অপ্রসন্নতা বোধ করছে না। কোনো নির্জন স্থানে বসে মানুষ যেমন অতিবিস্তৃত মনোরম ও রহস্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে তন্ময় হয়ে থাকে, ভ্রমরও এই অন্ধকারে যেন সেই রকম কোনো দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল।
চকবাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পরই ভ্রমর খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। ঠিক এই ধরনের চাঞ্চল্য সে আর কখনও অনুভব করে নি। এলোমেলো বাতাসের মতন তার মন নানাদিকে ছুটে যাচ্ছে; কখনও জ্যোৎস্নার মধ্য দিয়ে তাদের টাঙাগাড়ি ছুটে আসা দেখছে, কখনও অমলকে সিগারেট ধরাতে দেখছে, কখনও সেই পথে- গাওয়া গানটি তার কানের কাছে নিঃশব্দে যেন গাওয়া হচ্ছে; কখনো বা ভ্রমর অমলের মুখের গন্ধটি স্মৃতি থেকে বার বার অনুভব করার চেষ্টা করছিল।
আজ এ-রকম কেন হল ভ্রমর বুঝতে পারছিল না। টাঙা থেকে নামার পর সে কেমন বেহুঁশ ছিল, এত বেহুঁশ যে আয়াকে হিমানী-মা মনে করে কি একটা কথা বলে ফেলেছিল। সে ভাল করে কারও দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না। বাজারের হিসাব মেলাতে ক’বারই ভুল হয়ে যাওয়ায় সে কৃষ্ণাকে যোগটা করে দিতে বলে পোশাক বদলাতে লাগল। পোশাক বদলানোর সময় গায়ের জামায় সে গন্ধ শুঁকেছিল। ভ্রমর কিসের গন্ধ পেতে চাইছিল সে নিজেও জানে না। কোনো রকম গন্ধ সে পায় নি; না পেয়ে মন খারাপ লাগছিল। তারপর ভ্রমর তার শারীরিক অনুভূতিগুলি বোধ করতে পারল। তার কপাল এবং কান গরম, চোখের মণিতে জ্বালা জ্বালা ভাব, সর্দিজ্বরের মতন সর্বাঙ্গে কেমন শীত-শীত লাগছিল, নিশ্বাস-প্রশ্বাস উষ্ণ, বুকের মধ্যে কখনও খুব ফাঁকা লাগছিল, কখনও খুব ভরা ভরা লাগছিল।
এলোমেলো মন, কেমন অশ্চর্য এক জড়তা এবং চাপা অস্থিরতার মধ্যে বাকি সময়টুকু কেটে গেল। অমলের সঙ্গে একটি কথাও আর সে বলে নি, খাবার টেবিলে চুপ করে ছিল, নীচু মুখে বসে ছিল। তার ভয় হচ্ছিল, মুখ তুললে সে সকলের কাছে ধরা পড়ে যাবে।
শুতে এসে কৃষ্ণা মুখে হাতে গলায় ক্রীম মাখার সময় পুষ্পার শীঘ্রি বিয়ে হবে এই খবরটা দিল। ভ্রমর কান করে কথাটা শুনল না। ভ্রমর অন্য অন্য দিনের মতন রাত্রের ক্রীমও মাখল না। তার ভাল লাগল না। ক্রীমের গন্ধ যে মানুষের মুখের স্বাভাবিক সুন্দর গন্ধ নয়, ভ্রমর আজ তীব্র ভাবে অনুভব করছিল।
তারপর ঘর অন্ধকার করে, বেড়ালটাকে পায়ের দিকে সরিয়ে দিয়ে ভ্রমর শুয়েছে। তখন থেকে সে শুয়েই আছে। ঘুমোবার কথা একবারও ভাবে নি, রাত্রি এবং সময়ের কথাও তার খেয়াল হচ্ছিল না।
ছেলেবেলায় ভ্রমর তার কয়েকটি পুতুল, কিছু রঙীন ছিট কাপড়, ভাঙা চিরুনি, কাচের চুড়ির টুকরো নিয়ে একা একা সরাবেলা কাটাত। বড় হয়েও তার স্বভাব খুব একটা বদলায় নি। এখনও ভ্রমর খুব তুচ্ছ সামান্য কিছু নিয়ে নিজের মনে তন্ময় হয়ে থাকতে পারে। আজ রাত্রে সে কয়েকটি স্পষ্ট ও অস্পষ্ট ছবি, বিবিধ চিন্তার মধ্যে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল।
অমল এ-বাড়িতে এল যেদিন সেদিনের ছবিটি ভ্রমর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। বাবার সঙ্গে টাঙা থেকে নামল অমল, তখন একেবারে সাত-সকাল, আলো ফুটেছে সবে, ঘাসের মাথা হিমের গুঁড়োয় সাদা হয়ে আছে তখনও। গাড়ি থেকে নেমে অমল গোবেচারীর মতন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ধুলোয় ভরা, কয়লার গুঁড়োয় কালো, শুকনো, রুক্ষ চেহারা। ভ্রমর এবং হিমানী-মা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। অমলকে দেখে সেই সকালে বড় মায়া হয়েছিল ভ্রমরের। খুব কষ্ট পেয়েছে আসতে। মনে মনে অবশ্য সকৌতুক একটু হাসিও পাচ্ছিল। এই তবে অমল! ভ্রমর ভেবেছিল, আরও বড় হবে, লম্বা হবে, গোলগাল চেহারা হবে, গোঁফ থাকবে, দাড়ি কামানো মুখ হবে। কিন্তু দেখে মনে হল, সে-সবের কিছু নেই। একেবারে ছেলেছোকরা। ছিপছিপে গড়ন, পাতলা একটু গোঁফ, ভালো করে দাড়ি ওঠে নি। চোখে চশমাও নেই।
হিমানী-মাই চা তৈরী করে খাওয়ালে, ভ্রমর গেল অমলের গোছানো ঘর আরও একবার গুছিয়ে মানের গরম জল করে দিতে, সবান তোয়ালে রাখতে।
সেদিন ভ্রমর মনে-মনে বেশ অবাকও হচ্ছিল। মা যখন বেঁচে ছিল, ভ্রমর একেবারে বাচ্চা, বছর চার বয়েস, তখন একবার বাবার সঙ্গে বাঁকুড়ায় গিয়েছিল। বাঁকুড়া থেকে ফেরার পথে তারা রমামাসির বাড়ি হয়ে ফিরেছিল। ভ্রমরের সে-সব কথা একেবারে মনে নেই, শুধু, মনে আছে, একটা ফরসা গোলগাল ছেলে তাকে হাত ধরে কাঠের ঘোড়ায় চাপাত এবং দোলাত। বলত, মন্ত্র পড়ে দিলে এই ঘোড়াটা উড়ে আকাশে চলে যেতে পারে, কিন্তু সে মন্ত্র পড়বে না, কেননা আকাশে চলে গেলে ঘোড়াটা আর ফিরে আসবে না। ভ্রমর অবশ্য তখন সে-কথা বিশ্বাস করেছিল কি না, আজ আর তার মনে পড়ে না।
অমল কিন্তু কিছুতেই সে-কথা স্বীকার করতে চাইল না। তাদের বাড়িতে একটা ঘোড়া ছিল ঠিকই, তবে সেটা ঠুঁটো জগন্নাথ বলে তারা ঘোড়াটা গুদোম- ঘরে ফেলে দিয়েছিল। অমলের বয়স তখন ভ্রমরের চেয়ে বেশী ছিল, তবু তার পুরনো কথা কিছু মনে নেই। সে শুধু মেসোমশাইয়ের কথাটা মনে করতে পারে সামান্য। কেননা তাকে সকলে বলেছিল, মেসোমশাই খুব বিদ্বান, কলেজে পড়ান। বিদ্বান লোক দেখার আগ্রহে সে মেসোমশাইকে খুব নজর করে দেখত।
