ভ্রমর অমলের জন্যে সমবেদনা অনুভব করে বলল, “এও ত ভাল। তুমি ইঞ্জিনিয়ার হবে।”
“আমি ঠিক একদিন অফিসার হব।…চেষ্টা করলে মানুষ কি না হয় বল, সে সব পারে।”
টাঙাটা একটা ছোট পল্লী ছাড়িয়ে এবার ধু-ধু ফাঁকায় পড়ল। চারপাশে উঁচু-নীচু, মাঠ, দু-চারটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে, আর্দ্র জ্যোৎস্নায় চরাচর যেন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ঘোড়ার গলার ঘণ্টাটি ঝুমঝুম করে বেজে যাচ্ছে, কদমের শব্দ এবং চাকার শব্দ মিলে-মিশে একটি অদ্ভুত ধ্বনি বিস্তার করেছে, কোচোআন তার গানটি গেয়ে যাচ্ছিল আপন মনে। রাস্তার পাশের দেবদারু গাছ শীতের বাতাসে কেমন শব্দ করছিল মাঝে মাঝে।
ওরা দুজনেই নীরব হয়ে বসে থাকল। এবং দুজনেই মাঠ-ঘাট ও জ্যোৎস্না দেখছিল।
“আমাদের গাড়িঅলা কি গান গাইছে ভ্রমর?” অমল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
“দোহা।”
“শুনেছি কথাটা…। এক রকম গান, না—?”
“হ্যাঁ। আমার এক বন্ধু ছিল আগে, আর্তি গুপ্তা। সে গাইত, খুব সুন্দর গাইত। আর্তিরা মিরাট চলে গেছে।”
অমল শীতের বাতাসে কেঁপে উঠল একটু। গরম কোটের কলার আরও ঘন করে গলায় জড়াল। বলল, “তুমি একটা গান গাও।”
“যাঃ!” ভ্রমর ভ্রূকুটি করল।
“যা কেন, গাও। শীত-টীত উড়ে যাবে।”
“রাস্তায় কেউ চেঁচিয়ে গান গায়!”
“কেন গাইবে না! গান হচ্ছে, কি যেন, আনন্দ। আনন্দ হলেই গায়। ও গাইছে কি করে!”
“ও দুঃখের গান গাইছে।” ভ্রমর মৃদু গলায় বলল। “ও কি বলছে জান? বলছে, আমার সারাটা দিন ক্ষেতীতে মাটি কেটে লাঙল দিয়ে কাটে, সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরলে বাড়ির লোক জিজ্ঞেস করে, আজ কতটা লাঙল দেওয়া হল? হায় ভগবান, আমায় কেউ জিজ্ঞেস করে না—তোমার ভজন-পূজন কতটুকু করলাম।”
অমল নীরবে কথাগুলো শুনল। ঘাড় ফিরিয়ে কোচোআনকে দেখল দু-দণ্ড। তারপর বলল, “ভ্রমর, সব সময় দুঃখ আমার ভাল লাগে না।”
ভ্রমর কিছু বলল না। সে সামনের জ্যোৎস্নার দিকে তাকিয়ে থাকল।
চুপচাপ কয়েক দণ্ড বসে থেকে অমল খুব অস্বস্তি বোধ করল। এবং অস্বস্তি কাটাতেই যেন তার অবশিষ্ট সিগারেটটা বের করল। এমনও হতে পারে যে এই দ্বিতীয় সিগারেটটা পকেটে নিয়ে বাড়ি ঢুকতে চায় না সে। এবারে খুব সাবধানে তিনটে কাঠিতেই অমল সিগারেট ধরাতে পারল। তারপর আস্তে- আস্তে টান দিল। সে আর কাশবে না।
অমলকে দেখল ভ্রমর। কিছু বলল না।
অমল বলল, “কই, একটা গান গাও! কী বিউটিফুল দেখাচ্ছে বলো ত! জ্যোৎস্না ধবধব করছে। তোমার ভাল লাগছে না?”
এক পাশে মাথা হেলালো ভ্রমর। তার ভাল লাগছে!
“তা হলে একটা গান গাও। ভাল লাগাই লাইফ।” অমল সানন্দে বলল।
“তুমি গাও।”
“আমি! বেশ, আমি গাইছি। তুমিও গাইবে। একসঙ্গে গাইব আমরা।”
ভ্রমরের চোখের পাতায় আবার হাসি ফুটল। ঠোঁট দুটি আভা পেল।
গান বেছে নিতে একটু সময় লাগল অমলের। সে যেটা জানে ভ্রমর জানে না; ভ্রমর যা জানে অমল জানে না। শেষে অমল একটা পুরনো দুজনেরই জানা গান বেছে নিল। সিগারেটটা ফেলে দিল, আধখানাও খাওয়া হয়নি। গলা পরিষ্কার করে নিয়ে সে-ই প্রথম গানের কলি ধরল: “এই লভিনু সঙ্গ তবু সুন্দর হে সুন্দর…”
প্রায় অর্ধেকটা গান অমল একা গেয়ে ফেলার পর ভ্রমর তার শেষ সঙ্কোচ এবং আড়ষ্টতাটুকু হারিয়ে ফেলে অমলের গলায় গলা মিলিয়ে গাইল : “এই তোমারি পরশরাগে চিত্ত হল রঞ্জিত, এই তোমারি মিলনসুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত…”
কোচোআন গান আর গাইছিল না। ঘোড়ার কদম ফেলার তালে তালে তার গলার ঘন্টা ঝুমঝুম ঝুমঝুম করে বেজে যাচ্ছিল। জ্যোৎস্নার কণাগুলি মাঠ ও বক্ষচয় থেকে তাদের চক্ষু, তুলে যেন ওই দুটি আনন্দিত তৃপ্ত যুবক- যুবতীকে দেখছিল।
গান শেষ হলে দুজনেই নীরবে বসে থাকল।
গাড়িটা বাড়ির কাছে এসে গেছে। অমল রুমাল বের করে যখন নাক মুছছিল, তখন তার হাতে সিগারেটের গন্ধ পেল। তার সন্দেহ হল, মুখে সিগারেটের গন্ধ আছে।
“এই, দেখ ত আমার মুখ দিয়ে গন্ধ বেরুচ্ছে কিনা!” অমল বলল, বলে ভ্রমরের মুখের সামনে ঝুঁকে মুখ হাঁ করল।
ভ্রমর মুখ আনল অমলের মুখের কাছে। লম্বা করে নিশ্বাস নিল। সিগারেটের গন্ধ পেল যেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তামাকের ফিকে গন্ধ কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে ভ্রমর তার ঘ্রাণ-চেতনায় অদ্ভুত একটি গন্ধ অনুভব করতে পারল। অমল মুখ হাঁ করেই ছিল, ভ্রমরের মুখ অমলের মুখের অত্যন্ত নিকটে, তার নাক অমলের ওষ্ঠ প্রায় স্পর্শ করে আছে। ভ্রমর দ্বিতীয়বার নিশ্বাস নিল, অত্যন্ত ধীরে-ধীরে, তার মনে হল, অমলের মুখ গলা বুক থেকে এমন একটি সুগন্ধ আসছে, যা সে আর কখনও কোথাও অনুভব করে নি। ভ্রমরের সমস্ত মুখ উষ্ণ হয়ে উঠেছিল, চোখের কোণ জ্বালা করছিল, ঠোঁট দুটি কম্পিত হবার মতন সঙ্কুচিত হল ঈষৎ, তারপর ভ্রমর আর কিছু অনুভব করতে পারল না, কোনো সুখকর জীবন্ত মাদকতা ভরা ঘ্রাণ তার চেতনা আচ্ছন্ন করে ফেলল।
অমল মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “কী হল, গন্ধ আছে?”
০৫. অনেকটা রাত
৫
অনেকটা রাত হয়ে এসেছিল। এ-বাড়ি নিস্তব্ধ, নিঝুম। নিবিড় নীরবতার মধ্যে ভ্রমর জেগে ছিল।
কৃষ্ণা অকাতরে ঘুমোচ্ছে। অন্ধকারে তার ঘন ভরা নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচিছল। ভ্রমর স্থির ও শান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে। সে কখনও চোখের পাতা বন্ধ করছিল, কখনও চোখ খুলে অন্ধকারের মধ্যে তাকিয়ে ছিল।
