“ভাঙ্?”
“হ্যাঁ, ভাঙ্। খাও নি?…আমি খেয়েছি। বিজয়ার দিন একবার বিজনদাদের বাড়িতে সিদ্ধি খেয়ে, ওরেব্বাস…কী হাসি…হাসতে হাসতে মরে যাই; তুমি যদি কখনও খাও, মনে হবে চলছি ত চলছি, সব ভোঁ-ভোঁ; আর একবার হাসতে শুরু করলে ননস্টপ হেসে যাবে…।” অমল খোলামেলা গলায় হই-হই করে বলে যাচ্ছিল, হাসছিল মহা ফুর্তিতে।
“সিগারেট, ভাঙ, গাঁজা—সব রকম নেশা করেছেন! কী ছেলে—!” ভ্রমর চোখ বেঁকিয়ে ছোট করে ধমক দিল।
আত্মকথায় অমল এত মত্ত হয়ে পড়েছিল যে, সিগারেটটা তার হাতেই ছিল, ধরানো হয় নি। এবার সচেতন হল। সিগারেট ঠোঁটের মধ্যে গুঁজে দিল। দিয়ে জিবের জল দিয়ে ডগাটা ভিজিয়ে নিল। একবার ঠোঁটে সিগারেট এঁটে গিয়ে তার ঠোঁট পড়ে গিয়েছিল। সিগারেট ধরাবার আগে আবার মুখ থেকে সেটা নামিয়ে নিল। বলল, “এই, বাড়িতে কিন্তু কাউকে বলবে না। মেয়েরা বাই নেচার বড্ড চুগলি কাটে।”
ভ্রমরের খুব হাসি পাচ্ছিল। হাসল না। গম্ভীর মুখ করে বলল, “সরস্বতী পুজোর পর আর সিগারেট খাও নি?”
খেয়েছে বইকি অমল, টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট আউটের পর খেয়েছে, ম্যাট্রিক পরীক্ষা যেদিন শেষ হল সেদিন খেয়েছে, তারপর ওই রকম সব ফূর্তির দিনে মজা করে খেয়েছে। কলেজেও দু-একটা খেয়েছে কখনও, আনন্দ করে, দলে পড়ে। অমল সেই সব বৃত্তান্ত বলতে লাগল।
টাঙা ততক্ষণে জল-টাকি ছাড়িয়ে চলে এসেছে। রাস্তা একেবারে ফাঁকা, সাদা সাদা কুয়াশা ঝুলছে রেশমের মতন, আকাশে ফুটফুট করছে চাঁদ। জ্যোৎস্না এবং কুয়াশায় পথ যেন কাশফুলের মতন সাদা ও নরম হয়ে আছে। গাছ-গাছালির গায়ে চাঁদের কিরণ অবিরত সুধা ঢালছে। ঘোড়ার এবং গাড়ির ছায়া পড়েছে রাস্তায়, দীর্ঘ ছায়া, রাস্তা পেরিয়ে মাঠ দিয়ে ছায়াটা ছুটছে। ঘোড়ার গলায় ঘণ্টা বেজে চলেছে ঝুমঝুম করে, মাঝে মাঝে জীবটা ডেকে উঠছে।
অমল ভ্রমরকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, ভ্রমর অমলকে সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছে। ওদের পায়ে ধবধবে জ্যোৎস্না পড়ে আছে, গাড়ির ছাদ থাকায় মুখ অথবা গা সরাসরি চাঁদের আলো পাচ্ছে না।
অনেকগুলো দেশলাইকাঠি নষ্ট করে অমল শেষ পর্যন্ত সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলল। হাতের আঙুলে এবং জিবের জলে সিগারেট চেপটে ভিজে কদাকার হয়ে গেছে। কিন্তু তেমন ধোঁয়াই আসছে না। ভ্রমরের কাছে কৃতিত্ব দেখাবার জন্যে অমল সেই বিস্বাদ সিগারেটই জোরে-জোরে টানছিল এবং প্রায়ই কেশে উঠছিল।
অনেকগুলো দেশলাইকাঠি নষ্ট করে অমল শেষ পর্যন্ত সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলল। হাতের আঙুলে এবং জিবের জলে সিগারেট চেপটে ভিজে কদাকার হয়ে গেছে। কিন্তু তেমন ধোঁয়াই আসছে না। ভ্রমরের কাছে কৃতিত্ব দেখাবার জন্যে অমল সেই বিস্বাদ সিগারেটই জোরে-জোরে টানছিল এবং প্রায়ই কেশে উঠছিল।
ঠাণ্ডা লাগায় ভ্রমর এবার মাথার ওপর স্কার্ফটা বেঁধে নিল। তার কান মাথা এবং গালের অনেকটা ঢাকা পড়ে গেলে অমল তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বারে! তোমায় বিউটিফুল দেখাচ্ছে!”
ভ্রমর কান করল না কথায়। বলল, “সিগারেট ফেলে দাও।”
“ফেলে দেব! বা! পয়সা দিয়ে কিনলাম।”
“খেতে পারছ না, কাশছ, তবু খাচ্ছ।”
“বেশ খেতে পারছি। এখানের সিগারেটগুলো কড়া।…শীতে বেশ জমছে।” বলে অমল বাঁ পকেট থেকে হাত বের করে কোটের কলার তুলে দিল। “ঠাণ্ডা বাতাস লাগছে কিনা তাই কাশি-কাশি লাগছে।”
টাঙাঅলা এই সময় গুনগুন করে কি সুর ধরল। জলে একসঙ্গে দাঁড় ফেলার মতন শব্দ করে ঘোড়াটা সমস্ত শরীর নাচিয়ে-নাচিয়ে চলেছে। না, জলে দাঁড় ফেললে ঠিক এ-রকম শব্দ হয় না, কিন্তু অনেকটা এই রকমই। অমল ভাবল, কান পেতে শুনল, শুনতে-শুনতে বেশ যেন তন্ময় হল একটু।
ভ্রমর হঠাৎ নজর করে দেখল, তাদের পায়ের তলায় রাস্তা দিয়ে গাড়ির যে ছায়াটা ছুটছে, সেখানে তাদের কোনো চেহারাই নেই। কি ভেবে ভ্রমর একটা হাত লম্বা করে বাড়িয়ে দিল, তবু ছায়া পড়ল না।
মজার গলা করে ভ্রমর বলল, “এই, দেখেছ—”
অমল তাকাল। সিগারেটটা এবার সে নিজের থেকেই ফেলে দিল। জিব তেতো লাগছে, তামাক চলে গেছে মুখে। “কি?” অমল শুধলো।
“দেখছ, আমাদের ছায়াই পড়ছে না।” ভ্রমর হাত বাড়িয়ে পায়ের তলার পথ দেখাল। তার গলার স্বর লঘু চঞ্চল।
অমল দেখল এক পলক রাস্তাটা। বলল, “ডিরেক্ট লাইট ছাড়া কোনো অবজেক্টের শ্যাডো হয় না। আমরা লাইট পাচ্ছি না।” বলে অমল রগড় করে আবার বলল, “ফিজিক্স-টিজিক্স পড়লে না—রদ্দি হোমসাইন্স পড়ে বিদ্যের জাহাজ।”
“ইস্, তুমি কত বিদ্বান!”
“আমি ফিজিক্স পড়েছি। আমাদের কলেজের মধ্যে আমার হায়েস্ট মার্কস ছিল ফিজিক্সে।”
“গর্ব করো না।” ভ্রমর ঠোঁট চেপে হাসছিল।
“গর্ব!…তুমি বিশ্বাস করছ না! আমি প্রমিস করে বলতে পারি।…” অমল সামনের দিকে ঝুঁকে ভ্রমরের গায়ে হাত দিল, যেন এখুনি সে শপথ করে ফেলতে পারে।
ভ্রমর এবার শব্দ করে হেসে ফেলল। বলল, “থাক্। তুমি খুব ভাল ছেলে।”
অমল অন্য কথা ভাবছিল। “বুঝলে ভ্রমর, আমার লেখাপড়ার খুব ইচ্ছে ছিল। বি. এস-সি. পাশ করে আমি এম. এস-সি. পড়তাম। আজকাল নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পড়তে পারলে তোমার কী খাতির!” অমল আবেগবশে বলল।
“পড়লে না কেন?”
“বাবা! বাবা বললে মেকানিক্যাল অ্যাপ্রেন্টিসসিপ নিত…। আমারও এমন ব্যাড লাক্, হুট করে অসুখ হয়ে গেল কলেজে ঢুকেই, নয়ত বি. এস-সিটা পড়ে ফেলতাম।” অমলের গলায় প্রচ্ছন্ন আক্ষেপ ছিল।
