“আজ আমায় চকে যেতে হবে।” ভ্রমর বলল।
“চক?”
“বাজারে যাব, বাড়ির জিনিসপত্র কিনতে হবে।”
“কি জিনিস?”
“অনেক কিছু। মা লিখে দেবে।”
“মাসিমা যাবেন না?”
“মা বড় যায় না; আমি যাই। বরাবর। কৃষ্ণাও যায়। কৃষ্ণাও আজ যাবে না।”
“টাওয়ার আর দেখতে যাওয়া হচ্ছে না—তুমি রোজ দিন বদলাচ্ছ! কাল—”
“কাল হবে না; কাল রোববার। আমরা থাকব না।”
“পরশু, আমি যাবই।”
ভ্রমর হাসল। হাসিটা খুব স্নিগ্ধ এবং সকৌতুক।
অমল বুঝতে পারল না ভ্রমর হাসল কেন? বলল, “হাসলে যে!”
“কই—!”
“ইয়ার্কি হচ্ছে।”
“না, মোটেও না।”
“তবে?”
“টাওয়ার দেখা হয়ে গেলেই তোমার এখানকার সব দেখা হয়ে গেল। তারপর…?”
“কত বেড়াবার জায়গা রয়েছে, এমনি বেড়াব।” অমল বলল, বলেই তার মনে পড়ে গেল একদিন ভ্রমরকে সঙ্গে করে জল-চাঁদমারি যাবার কথা আছে। “একদিন তোমার সঙ্গে জল-চাঁদমারি যাবার কথা আছে, স্যার। সেবার আমি একলা গিয়েছিলাম।”
ভ্রমর বালিশের পাশ থেকে বইপত্র কলম গুছিয়ে তুলে নিতে লাগল। বলল, “তুমি যা ছটফটে ছেলে, টাওয়ার দেখা হয়ে গেলেই তখন আর এখানে দেখার কিছু থাকবে না, তোমার থাকতে ভাল লাগবে না, চলে যাবে।”
“চলে যাব!…কোথায় যাব?”
“জব্বলপুর। তোমার মণ্টুমামার কাছে।”
“হ্যাত্! মন্টুমামার কাছে অতদিন কে থাকে! আমি এখানেই থাকব—।”
বিছানা থেকে উঠতে-উঠতে ভ্রমর হেসে বলল, “সুটকেস-টুটকেস নিয়ে চলে যাবে না তবে!…আমার তখন এত খারাপ লাগছিল…” বলতে-বলতে ভ্রমর যেন খুব লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেল।
রাত্রে চক থেকে ওরা ফিরছিল। বেশী রাত করবে না করবে না করেও যখন চকবাজার থেকে টাঙায় উঠল তখন আটটা বাজে প্রায়। টুকটাক জিনিস কিনতে হয়েছে অনেক, সারা মাসের সাংসারিক খুচরো জিনিস। সাবান দু-দফা, টুথপেস্ট, মাথায় মাখার তেল, বিস্কুট, মাখন, আনন্দবাবুর জন্যে মনাক্কা আর সিগারেটের টিন, কৃষ্ণার রিবন, সাদা মোজা, কেডস জুতোর কালি, হিমানীর ক্রুশন সল্ট, আরও কত কি। মুখে মাখার ক্রীম আর গ্লিসারিন কিনতেই ভ্রমরের আধ ঘণ্টা গেল। স্টেশনারী দোকানের মালিক ভ্রমরকে বসিয়ে নানারকম গল্প জড়ল। বুড়ো লোক, ভ্রমরকে ‘বেটি বেটি’ করে আদর আপ্যায়ন করতে লাগল এত যে, অমলের মনে হল সারা রাতই বুঝি বসিয়ে রাখবে। সেখান থেকে কাপড়ের দোকান; কৃষ্ণার কামিজ হবে একটা—মাপ দোকানেই পড়ে আছে, কাপড় পছন্দ করে দিতে হল; ভ্রমর কৃষ্ণার জিনিস পছন্দ করতে সবসময় ভয় পায়, কি জানি, কৃষ্ণা যদি ঠোঁট ওলটায়। লংক্লথ নিতে হল খানিকটা, শেমিজ হবে মেয়েদের। তারপর অল্প কিছু, সবজি-টবজিও কিনতে হল।
বাজার থেকে বেরোতে-বেরোতে আটটা বাজল প্রায়। টাঙার সামনে গোল- মতন ঝুড়িতে মালপত্র। কয়েকটা খুচরো জিনিস বেতের টুকরিতে। চকবাজার বেশ গমগম করছিল, আলোয় ভরা, কাছেই একটা সিনেমা হাউস আছে, সেখানে হিন্দী বই হচ্ছিল। এদের গা-সওয়া শীত, কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, গরম জামা পরে, র্যাপার চাপিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ অমলের মনে হল ডিসেম্বরের শুরুতেই জোর ঠাণ্ডা পড়ে গেছে।
চকবাজার ছাড়িয়ে আসতে শীতের কনকনে বাতাস ঝাপটা দিয়ে। গেল বেশ কুয়াশা চোখে পড়ল, ধোঁয়ার মতন জমে আছে। ধোঁয়ায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখ জ্বালা করে; কুয়াশায় সব কেমন ঠাণ্ডা লাগে, নাক মুখ শীতল হয়ে থাকে। অমল শখ করে পান কিনেছিল, নিজে খেয়েছে, ভ্রমরকেও খাইয়েছে। পানের অবশিষ্টটুকু তার মুখে ছিল। অমল এবার বলল, “একটা জিনিস কিনেছি, এবার খাব।”
চক ছাড়িয়ে এসে খুব বড় একটা তলাও-এর পাশ দিয়ে টাঙাটা চলছে। রাস্তায় তেমন একটা আলো নেই, এই অঞ্চলটা বাজারপট্টির প্রান্ত, ছোটখাট দোকান আছে, কোনোটাতে তুলে বিক্রি হয়, কোনোটাতে বা সাইকেল সারাই করে। মিটমিটে লণ্ঠন জ্বলিয়ে কোথাও কোনো ফলঅলাও বসেছিল চালার তলায়।
ভ্রমর আজ খুব সাবধান হয়ে বেরিয়েছে। গায়ে পুরো-হাতা শর্ট কোট। কালো রঙ কোটটার, গলার কাছে মস্ত কলার। পায়ে মোজা পরেছে। কোটের পকেটে স্কার্ফ রেখেছে মাথায় বাঁধবে বলে, এখনও বাঁধে নি।
অমল পকেট হাতড়ে কি যেন বের করতে লাগল।
ভ্রমর বলল, “অনেক দেরি হয়ে গেল, না—?”
“হবে না! তোমার দেখলাম পুরো বাজারটাই চেনা।” অমল ঠাট্টা করে বলল।
“বা রে, কতদিন ধরে যাচ্ছি আসছি—।”
“তুমি খুব কাজের মেয়ে।” অমল হাসল।
অমলের কোটের হাতা ধরে ভ্রমর আলগা একটু টেনে দিল। “ঠাট্ট!”
“ঠাট্টা কি, নিজের চোখেই দেখলাম।” অমল পকেট থেকে সেই জিনিসটা ততক্ষণে বের করে ফেলেছে।
“অন্য অন্য বারে কৃষ্ণা আসে। মা খুব কম। আমায় এই একটা কাজ বরাবর করতে হয়।…ওটা কি?” ভ্রমর অমলের হাতের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলল।
“সিগারেট। আমি একটা সিগারেট খাব।” অমল গলায় জোর দিয়ে ঘোষণা করল।
ভ্রমর যেন স্তম্ভিত। বিশ্বাস করতে পারছিল না। অমলের হাতের দিকে অল্প সময় তাকিয়ে থেকে শেষে চোখ তুলে অমলের মুখ দেখতে লাগল। “কোথায় পেলে? কিনেছ?”
“তখন পান কিনছিলাম-না, দুটো কিনে ফেললাম। দেশলাইও কিনেছি।”
“তুমি সিগারেট খাও?” ভ্রমর অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে বলল।
“খাই না। আমি স্মোকার নই। তবে দু-চারটে খেয়েছি।” অমল দেশলাইয়ের ওপর খুব কায়দা করে সিগারেট ঠুকতে লাগল। বলল, “আমি প্রথম সিগারেট খাই ফার্স্ট ক্লাসে পড়ার সময়, সরস্বতী পুজোর দিন। আমাদের স্কুলের নিয়ম, যারা টেন ক্লাসে উঠবে, তারা সেবারে সরস্বতী পুজো করবে। আমাদের সময় আমরাই লিডার।…সরস্বতী পুজোর দিন রাত্তির বেলা অমূল্য, ভানু-টানুরা মিলে আমায় সিগারেট খাইয়ে দিল। ওরা খেত মাঝে মাঝে। ওরা সিদ্ধিও খেত। তুমি কখনও সিদ্ধি খেয়েছ?”
